শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

স্মার্ট ফোনের অশুভ প্রভাব

এটা এক প্রমাণিত সত্য যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভালো ও কল্যাণকর বিভিন্ন দিকের সঙ্গে মন্দ ও অশুভ তথা ক্ষতিকর অনেক দিকও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এরকম একটি বিষয় হিসেবেই প্রাধান্যে এসেছে স্মার্ট ফোন। কিছুদিন আগে পর্যন্তও যার পরিচিতি ও ব্যবহার ছিল সেল বা মোবাইল ফোন নামে, উন্নততর প্রযুক্তি যুক্ত করার মাধ্যমে তাকেই স্মার্ট ফোনে পরিণত করা হয়েছে। এসব ফোনের বৈশিষ্ট্য হলো, অন্যের সঙ্গে কথা বলা ও মেসেজ বা বার্তা আদান-প্রদান করা তো যায়ই, একই সঙ্গে ইন্টারনেটসহ অনলাইন ব্যবহারের সকল সুযোগও পাওয়া যায়। কারো হাতে একটি স্মার্ট ফোন থাকলে সে ফেসবুক, টুইটার ও হোয়টসঅ্যাপের মতো অপশনগুলো যেমন ব্যবহার করতে পারে, তেমনি ইউটিউবের মতো অপশন ব্যবহার করে নাটক-সিনেমা থেকে বিভিন্ন দেশের খবর পর্যন্ত সবই দেখার ও উপভোগ করার সুযোগ পায়।
সাধারণভাবে আনন্দের খবর মনে হলেও একই স্মার্ট ফোনের কারণে বাংলাদেশে বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মারাত্মক বিপদ বেড়ে চলেছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনে শুধু নয় বিনোদনের জন্যও শিশু-কিশোররা কম্পিউটার ও ল্যাপটপের পাশাপাশি স্মার্ট ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। পাড়া ও স্কুলের মাঠে খেলাধুলার সুযোগ এবং নিরাপত্তা না থাকায় শিশু-কিশোররা একদিকে যার যার বাসাবাড়ির ভেতরে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে সময় কাটানোর জন্য বেছে নিচ্ছে ল্যাপটপ ও কম্পিউটারসহ স্মার্ট ফোনকে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ইন্টারনেট বা ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে প্রাথমিকভাবে বাসাবাড়িতে নিজেদের ব্যক্তিগত কক্ষকে ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে এই গন্ডির ক্রমাগত সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। তারা বাইরের বিভিন্ন স্থানেও ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত ও পারদর্শী হয়ে ওঠে। একযোগে বাড়তে থাকে তাদের বিচরণ ক্ষেত্রও। খুব কম সংখ্যকই শিক্ষামূলক বা ভালো কিছুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অধিকাংশ বরং অশ্লীল বিভিন্ন ভিডিও দেখায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।
চক্ষু চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেহেতু একা একা এবং গোপনে দেখতে হয় সেহেতু শিশু-কিশোররা মাধ্যম হিসেবে স্মার্ট ফোনকে বেছে নেয়। এড়িয়ে চলে ল্যাপটপ এবং কম্পিউটারকেও। আর স্মার্ট ফোনের স্ক্রিন যেহেতু খুবই ছোট সে কারণে তাদের দৃষ্টিশক্তিও দ্রুতই কমতে থাকে। আট-দশ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যেই শিশু-কিশোররা চশমা নিতে বাধ্য হয়। একজন চক্ষু চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে দৈনিক গড়ে আগত ২৫০ জন রোগীর মধ্যে ৫০ জনই শিশু-কিশোর। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় এত অল্প বয়সে এত বেশি পাওয়ারের চশমা ব্যবহারের কথা মাত্র কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা যেতো না। এমন অবস্থার কারণ আসলে স্মার্ট ফোন। ইউনিসেফের গবেষণা রিপোর্টে অন্য কিছু আশংকাজনক তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। যেমন বাংলাদেশে ফেসবুকসহ ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণা ও হয়রানি বেড়ে চলেছে। এসবের শিকার হচ্ছে বিশেষ করে শিশু-কিশোররা। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১০ থেকে ১৭ পর্যন্ত বয়সের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩২ শতাংশই সহিংসতা, ভয়-ভীতি এবং ডিজিটাল নির্যাতন ও উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে অথবা শিকার হওয়ার মুখে রয়েছে।
 ইন্টারনেটে অশ্লীল ভিডিও দেখাকেও অধঃপতনের একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ। ফেসবুকে অচেনা ব্যক্তিদের বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে বেশি বিপন্ন হচ্ছে মেয়েরা। জরিপে অংশগ্রহণকারী মেয়েদের একটি বড় অংশ স্বীকার করেছে, তারা শুধু বন্ধুত্বের অনুরোধই গ্রহণ করে না, তাদের অনেকে এসব সদ্য পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করতে যায়। জানা গেছে, এভাবেই উসকানি ও যৌন হয়রানি থেকে সহিংসতা শুধু নয়, মাদক এবং যৌন সামগ্রীর লেনদেনও শুরু হয়ে থাকে। অনেকেই মাদকাসক্ত ও যৌনকর্মে অভ্যস্ত হতে থাকে। বন্ধুত্বের আড়ালে যৌনকর্মসহ অসামাজিক কর্মকান্ডে যারা সম্মত হয় না তাদের ভয়ভীতি দেখানো এবং হুমকি দেয়া হয়। বন্ধু নামের অনেকে এমনকি প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি অশ্লীল বিভিন্ন ছবিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়। তখন শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ভয়ংকর কর্মকান্ড। আর এ ব্যাপারেও বেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরা।
এভাবে সব মিলিয়েই ইন্টারনেট বাংলাদেশের সমাজকে ধ্বংস করছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে স্মার্ট ফোন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, শিশু-কিশোর ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র ও কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোনকে নিষিদ্ধ করার অবাস্তব পন্থায় এগোনোর পরিবর্তে শিশু-কিশোরসহ তরুণদের মধ্যে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু-কিশোররা চাইলেই এবং সাধ্য থাকলেও তাদের হাতে স্মার্ট ফোন তুলে দেয়া যাবে না। স্মার্ট ফোনের অশুভ ও ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বুঝিয়ে বলতে হবে। সেই সাথে পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটি পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ এবং খেলাধুলার সুযোগসহ সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে সবচেয়ে বেশি দরকার সমন্বিত পদক্ষেপের- যার শুরু হতে হবে পরিবার থেকে এবং যে বিষয়ে সরকারকে পালন করতে হবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ