বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্রাহমা জাতের গরুর গোশত দেশের চাহিদা পূরণে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে পারে

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর : যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রজাতির গোশতল ব্রাহমা জাতের গরু পালনের মাধ্যমে দেশে গোশতের চাহিদা পূরণে এক যুগান্তকারী  গোশত বিপ্লবের নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত উন্নত প্রজাতির ব্রাহমা মূলত একটি  গোশত উৎপাদনকারি গরুর জাত। মানুষের প্রাণিজ আমিষ তথা গোশতের চাহিদা পূরণে ব্রাহমা জাতের গরু বাংলাদেশে এক গুরুত্বপূর্ণ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। আর রংপুর অঞ্চলের নাতিশীতষ্ণ অনুকূল আবহাওয়া এ জাতের গরু পালনে খুবই উপযোগী। যার মাধ্যমে একজন ক্ষুদ্র খামারী অল্প পূঁজি থেকে যাত্রা শুরু করে সফল খামারী হতে পারে। ব্রাহমা জাতের গরুর সম্প্রসারণ হলে গোটা দেশের মানুষের আভ্যন্তরীণ গোশতের বিপুল চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত উৎপাদিত গোশত বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া অন্য দেশ থেকে গরু আমদানিরও প্রয়োজন হবে না। এতে একদিকে দেশের প্রাণিসম্পদ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর নতুন কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি হবে।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে “বীফ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের” আওতায় রংপুরে এই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের তামপাট এলাকার সুফলভোগী আমেনা বানু জানান, ব্রাহমা জাতের গরু পালন করে তাঁর সংসারে অনেক উন্নতি হয়েছে। এ জাতের গরু পালনে প্রাণী সম্পদ হাসপাতাল থেকে ডাক্তার এসে গরুর খোঁজ নিয়ে এর জন্য প্রয়োজনীয় কৃমির বড়ি এবং ভিটামিন বিনামূল্যে বিতরণ করে। বাংলাদেশের জনগণের প্রাণিজ আমিষ তথা মাংসের পুষ্টি চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর এর আওতায় সারা দেশে ২০১৪ সাল থেকে ‘বীফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত ব্রাহমা জাতের গরুর বীজ দিয়ে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। এদেশের মানুষের গোশতের চাহিদা পূরণের জন্য ব্রাহমা জাতের বীজ দ্বারা স্থানীয় জাতের গাভী প্রজনন করানোর মাধ্যমে উন্নত জাতের  গোশত উৎপাদনকারী গরু উৎপাদন করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। সারা দেশের ন্যায় রংপুর জেলার সদর উপজেলায় ২০১৪ সাল থেকে এর পাইলট প্রকল্প শুরু হয়। এর লক্ষ্যে রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের নগর মীরগঞ্জ এলাকায় ২০০ জন খামারিকে বাছাই করে প্রথম পর্যয়ে ৭০ জনকে নিয়ে এই পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রত্যেক সুফলভোগীকে প্রকল্পের আওতায় ১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিটি গরুকে স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কৃমিনাশক ঔষধ এবং ভিটামিন প্রিমিক্স সরবরাহ করা হয়। যেহেতু এটি গোশত উৎপাদনকারী একটি জাত এবং দ্রুত বৃদ্ধিপায়, সে কারণে উদ্যমী ও আগ্রহী কৃষকদেরই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রকল্প থেকে বাছাইকৃত প্রতিটি গরুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্রাহমা জাতের বীজ দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন করানো হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। দেড় থেকে দুই বছরে প্রতিটি গরু আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ওজনের হয়, যা গরু পালনকারীগন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অনেক বেশি মূল্য পায়। উল্লেখ্য, রংপুর সদর উপজেলা থেকে ১০০টি উৎপাদিত ব্রাহমা জাতের বাড়ন্ত ষাঁড়Í এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রত্যেক খামারী কৃষকের নিকট থেকে উপযুক্ত মূল্যে  সরাসরি ক্রয় করে ঢাকার সাভার ডেইরী খামারে পাঠিয়ে দেন। ক্রয়কৃত ষাঁড়গুলো প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর তাদের সিমেনের গুণগত মান পরীক্ষার মাধ্যমে সেসব যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে একইভাবে আরও ১৩০ জন সুফলভোগী নির্বাচন করে প্রতিটি গরুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিচর্যা করা হয়। সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মতভাবে উন্নত পদ্ধতিতে এসব গরু লালন-পালনের ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের খাওয়ার উপযোগী হয়। রংপুর সদর উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের নিবিড় মনিটরিংএর মাধ্যমে এ প্রকল্পের কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে সফল্যের দিকে এগিয়ে গেছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষ তথা মাংসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এ প্রকল্প জনগণের মাঝে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। খামারীদের মধ্যে এখন ব্রাহমা জাতের বীজ দিয়ে প্রজনন করার ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ভেটেরিনারি সার্জন ডাক্তার সিঞ্চিতা রহমান জানান, খামারীদের অসুস্থ্য গরুর জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা এবং উপযুক্ত পরামর্শ দেয়া হয়। হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে ওষুধ ও ভিটামিন সরবরাহ করা হয়। এ ব্যাপারে রংপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন জানান, বাংলাদেশের মানুষের মাংসের চাহিদা পূরণে ব্রাহমা জাতের গরু এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহযোগিতায় দেশে এক  গোশত বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। এ থেকে দেশে মাংসের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি আমরা বিদেশেও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারি। এছাড়া এই জাতের গরু আমাদের দেশীয় আবহাওয়ায় বেশ টেকসই। সম্পূর্ণ বিজ্ঞান  সম্মত ভাবে নিরাপদ গোশত উৎপাদনে ব্রাহমা জাতের গরু অতুলনীয়। অপেক্ষাকৃত কম সময়ে ও কম খরচে ব্রাহমা জাতের গরু পালন করে আমাদের কৃষক ও খামারী ভাইয়েরা অধিক লাভবান হতে পারেন। এতে করে কৃষকের আর্থিক স্বচ্ছলতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, গ্রামীন জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন তথা দেশের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে । এছাড়া, দেশে সারা বছর এবং কুরবানির  ঈদে যে পরিমাণ গরুর চাহিদা সৃষ্টি হয়, ব্রাহমা জাতের গরুর সম্প্রসারণ হলে গোটা দেশের জনগণের মাংসের চাহিদা অভ্যন্তরীণ ভাবেই মিটানো সম্ভব হবে। এতে করে দেশের প্রানিসম্পদ আরও সমৃদ্ধ হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহ্জালাল খন্দকার জানান, গোশত উৎপাদনকারী ব্রাহমা গরুর বীজ প্রজননের মাধ্যমে দেশী গাভীর মাধ্যে এর প্রয়োগ করলে এর  গোশত উৎপাদনের জাত পাওয়া যাবে। ব্রাহমা জাতের গরুর বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় খামারীরাও এব্যাপারে প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ