বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

জুলাইয়ের দ্বি-গুণ ডেঙ্গু রোগী আগস্টের ১৭ দিনে

ইবরাহীম খলিল : শুধু এই মাসের প্রথম থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ হাজার ১৫ জন, জুলাই মাসে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৫৩ জন। ভর্তির হিসেবে আগস্টের অর্ধেক মাসেই জুলাই মাসের চেয়ে দ্বি-গুণ সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এদিকে আগামী ৭ দিনকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন এই কয়দিন পরে বোঝা যাবে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে। 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত (১৬ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে ১৭ আগস্ট সকাল ৮টা) নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৪৬০ জন। যার মধ্যে ঢাকার ভেতরে ৬২১ জন আর ঢাকার বাইরে ৮৩৯ জন। যা আগের দিনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম, আবার ঢাকায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬২১ জন, যা গতকালের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। একইসঙ্গে ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যাও গতকালের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম।
কন্ট্রোল রুমের হিসাব থেকে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ৫৮ জন, মে মাসে ১৯৩ জন, জুনে এক হাজার ৮৮৪ জন, জুলাইতে ১৬ হাজার ২৫৩ জন এবং চলতি মাস আগস্টের ১৭ দিনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৩ হাজার ১৫ জন। আরও জানা যায়, বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৮৫৬ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৪১টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছেন চার হাজার ৪৩ জন, আর ঢাকা শহর ছাড়া ঢাকা বিভাগসহ মোট আট বিভাগে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৮১৩ জন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত সরকারী হিসেবে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৪৭৬ জন। আর চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৩ হাজার ৫৮০ জন।
এদিকে আগামী ৭ দিনকে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা গতকাল শনিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, ‘আগামী সাতটা দিন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে নয়। আমরা যদি এডিসের দুর্গে আঘাত হানতে না পারি, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল।’
 ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৪৬০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা। এর মধ্যে ঢাকা শহরে ভর্তি হয়েছেন ৬২১ জন। আর ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৮৩৯ জন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদও বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে সপ্তাহ খানিক সময় লাগবে।
অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে আমাদের আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে। আমাদের এখন উচিত নিজেদের এডিস মশা থেকে দূরে রাখার সমস্ত পন্থা অবলম্বন করা।’ ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে মশক নিরোধক আমদানির ওপরও জোর দিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, ‘নিজেদের রক্ষা করার জন্য যেমন ফুল প্যান্ট, ফুল হাতা জামা পরিধান করা দরকার, তেমনি রিপেল্যান্ট দ্রæত আমদানি করা যায় কি না সে বিষয়েও জোর দেওয়া দরকার।’ গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে ২৫৯ জন কম। আগের দিন ১ হাজার ৭১৯ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
একবার আক্রান্ত রোগীর বেশি মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে সরকারের রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদা সাবরিনা ফ্লোরা জানান, ডেঙ্গুতে এবার ৪০ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় দেখা যায়, টাইপ-৩-এ আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৭ জনের আগে একবার ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হন। ছয় জন হেমোরোজিকে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ঐ বছর ডেঙ্গুর টাইপ-১, টাইট-২, টাইপ-৩ ও টাইপ-৪ পাওয়া যায়। ২০০২ সালে টাইপ-১, টাইপ-২ ও টাইপ-৩ বেশি ছিল। ২০১৬ সালে টাইপ-১ ও টাইপ-২-এ আক্রান্ত বেশি ছিল। টাইপ-৩ কম ছিল। ২০১৭ সালেও টাইপ ৩ কম ছিল। ২০১৮ সালে টাইপ-৩ বেশি ছিল এবং ২০১৯ সালে টাইপ-৩ সর্বাধিক। অন্যগুলো একেবারেই কম। অধ্যাপক ডা. মীরজাদা সাবরিনা ফ্লোরা বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে নিজস্ব কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। জ্বর নিয়ে গবেষণা চলছে। এজন্য একটি প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান।
এদিকে ডেঙ্গুতে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার তালিকা দীর্ঘ হচ্ছেই। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসেবেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগির সংখ্যা অর্ধ লাখ ছাড়িয়েছে। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা অন্তত তিনগুন। অন্যদিকে, সরকারি হিসেবে শুক্রবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৪০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে এটিও তিনগুন। এই তালিকা দীর্ঘ হচ্ছেই। সবশেষ গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মনোয়ারা বেগম (৪৫) নামের আরও একজন ডেঙ্গু রোগি মারা  গেছেন। এ নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮ জনে। গতকাল সকাল পৌনে ১১টার দিকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তিনি মারা যান। মনোয়ারার স্বামী সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার চমকপুর গ্রামে।
অন্যদিকে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে ৬ মাস বয়সী আয়য়াজুর রহমান নামে একটি শিশু মারা গেছে। শুক্রবার রাত ১টা ২৫ মিনিটে শিশুটি মারা যায়। ১৪ তারিখে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এ নিয়ে শিশু হাসপাতালে ১১ শিশু ডেঙ্গুতে মারা গেলো।
সরকারি হিসেবে মৃতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগস্টে ১০ জন, জুলাইতে ২৪ জন, জুনে ৪ জন,  এপ্রিলে ২ জন। গতকাল সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কলেজ ছাত্র সুমন মারা যায়। সুমনের বাসা মাগুরা জেলার চাঁদপুর গ্রামে। ঝিনাইদহে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ট্রাকের হেলপার মিজানুর রহমান। প্রচÐ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ