বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

কুরবানির চামড়া বিপর্যয়ে ছিল সরকারের পরিকল্পনার অভাব

* কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করেছে ট্যানারি মালিকরা
* বকেয়া পরিশোধ ছাড়া ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি করবেন না আড়তদাররা
* সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ না করায় চামড়া নষ্ট হয়েছে -শিল্প সচিব
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: কুরবানির চামড়ার বিষয়ে সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুরবানির চামড়া বিক্রি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনার অভাব ছিল। এ কারণেই কুরবানির চামড়ার দামে ধস নেমেছে। সরকারের উচিত ছিল, দেশের উৎপাদন ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে চামড়া রফতানির বিষয়ে আরো আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয়া। এই ব্যাপারে অতীতের বছরগুলো থেকে শিক্ষা নেয়া হয়নি। সাধারণ মানুষের যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। চামড়া রফতানি করা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাবে না।
এবছর কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চলেছে নৈরাজ্য। পানির দামে চামড়া কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। নিয়েছেন ফ্রিতেও। আবার পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন। অনেকে আবার চামড়া মাটিতে পুতে রেখেছে সে দৃশ্যও দেখা গেছে।  অনেক চামড়া বিক্রি না হওয়ায় রাস্তায় পচে নষ্ট হচ্ছে। এবারের কাঁচা চামড়ার দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দরপতন হয়েছে। এতে বিনামূল্যেও অনেক ব্যবসায়ী চামড়া নেয়নি। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট করে ফায়দা লুটার অভিযোগ আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে। আবার এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় একে অপরকে দুষছেন। সবমিলে এবারের কুরবানি চামড়ার দামে ধস নামায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
জানা গেছে, কুরবানির পশুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করেছেন ট্যানারি মালিকরা। গতকাল শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া আজ (শনিবার) থেকে কেনা শুরু করেছি। সরকার নির্ধারিত মূলে আগামী দুই মাস চামড়া সংগ্রহ করবো। যেসব চামড়া ভালোভাবে সঠিক সময়ে লবণ দিয়েছে ওইসব চামড়া ভালো দামে কেনা হবে।
এছাড়া আগামীকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবে। সেখানে বর্তমান চামড়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে এরপর বিস্তারিত জানানো যাবে বলে জানান ট্যানারি মালিকদের এ নেতা।
এদিকে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পরে নড়েচড়ে বসে ট্যানারি মালিকরা। দেশীয় শিল্প রক্ষায় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। গত বুধবার সকালে ধানমন্ডিতে জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি জানান ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। সাংবাদিক সম্মেলনে বিটিএর সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, কুরবানির সময় মাঠ পর্যায় থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেন আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছ থেকে লবণযুক্ত চামড়া আমরা কিনি। আমরা শনিবার থেকে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ শুরু করব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করিনি। তবে আমরা এটাও জানি যে, ঢালাওভাবে কাঁচা চামড়া রফতানি করার অনুমোদন দিলে দেশে চামড়া শিল্প উন্নয়নে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা চাই না একটা সম্ভাবনাময় খাত বাধাগ্রস্ত হোক। তাই বলে আমরা এ-ও হতে দিতে পারি না যে, চামড়া বিক্রি হবে না। দাম না পেয়ে মানুষ চামড়া পুঁতে ফেলবে, নদীতে ফেলে দেবে। তাই আমরা ঢালাওভাবে না দিয়ে কেস টু কেস ভিত্তিতে কাঁচা চামড়া রফতানিতে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সচিব বলেন, শনিবার থেকে নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করার প্রতিশ্রæতি দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর ফলে যদি চামড়ার বাজারে ন্যায্যমূল্য ফিরে আসে তাহলে হয়তো আমরা কাঁচা চামড়া রফতানি অনুমোদন দেব না। তবে বিক্রেতারা যদি চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পায়, তাহলে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমোদন দেব। কারণ এটা এতিম, গরিব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হক। এক্ষেত্রে আমরা পানির দরে চামড়া বিক্রি হতে দিতে পারি না।
এদিকে সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ না করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া নষ্ট করেছে বলে অভিযোগ করেছেন শিল্প সচিব মো. আব্দুল হালিম। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর সিইটিপি সম্পূর্ণ চালু রয়েছে উল্লেখ করে শিল্প সচিব বলেন, কুরবানির সময় ট্যানারিগুলো সারা বছরের সরবরাহের অর্ধেক চামড়া সংগ্রহ করে। আগামী দু-তিন মাস এ শিল্প নগরী ট্যানারিগুলো পূর্ণ গতিতে চলবে। পিক সিজনে উৎপাদিত চামড়ার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার স্বার্থে সব ট্যানারিকে একসঙ্গে কাজ না করে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার ফলে কিছু কিছু স্থানে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া নষ্ট করেছেন। এটি পুরো দেশের চিত্র নয়। অন্য স্থানের চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এদিকে পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে এবার ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন পুরান ঢাকার পোস্তার কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা।
কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করব না। সভায় আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া সংশ্লিষ্টদের বৈঠক আছে। সেখানে আলোচনার পর আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। আজকে চামড়া বিক্রি করার কথা থাকলেও আমরা এখন থেকে আর বিক্রি করব না। ট্যানারি মালিকদের কারণে চামড়ার দাম কমেছে অভিযোগ করে আড়তদারদের এ নেতা বলেন, ‘ট্যানারিগুলো বকেয়া টাকা না দেয়ায় এবার অর্থের অভাবে চামড়া কিনতে পারিনি। অন্যান্য বছর ঈদের আগেরদিন আড়তদারদের সঙ্গে আলোচনা করলেও এবার তারা কোনো কথা বলেনি। তারা যদি আমাদের আশ্বস্ত করত ন্যায্য দামে চামড়া কিনতে তাহলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এটি না করে উল্টো মিডিয়ার কাছে নানা কথা বলেছেন। এ কারণে আরও দর কমেছে। তাই ট্যানারি মালিকরাই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
কেন চামড়া দামে এতো বিপর্যয় ঘটলো জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, চামড়া নষ্ট হওয়ার জন্য মূলত দায়ী ট্যানারির মালিকেরা। তাঁরা অনেক দিন ধরে আমাদের পাওনা টাকা দিচ্ছেন না। ফলে এবার অনেক আড়তদার চামড়া কিনতে পারেননি। সমিতির ৮০ শতাংশ সদস্যই চামড়া কেনেননি। মাত্র ২০ শতাংশ সদস্য চামড়া কিনেছেন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। চামড়াগুলো রাস্তায় নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে যে পুঁজি ছিল, তা পুরোপুরি ট্যানারির মালিকদের কাছে আটকে আছে। এখন মূলধন নেই। লবণ কেনার টাকা নেই। টাকা না থাকলে আড়তদারেরা চামড়া কিনবেন কী করে। আড়তদারেরা যেহেতু এবার খুব একটা চামড়া কেনেননি, তাই বাজারে তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এরজন্য দায়ী ট্যানারির মালিকেরা। আমাদের টাকায় তাঁরা হলেন হিরো। আমরা হলাম জিরো। আমাদের টাকা দিয়ে গাড়ি-বাড়ি করেছেন। আমরা কীভাবে সিন্ডিকেট করব? চামড়া পচনশীল দ্রব্য। দুই মাসের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের সিন্ডিকেট করার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা নেই, ট্যানারিগুলোতে আগের বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় এতো চামড়ার চাহিদা নেই, চামড়া কেনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়নি ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে এতোদিন ট্যানারি মালিকরাই কাঁচা চামড়া কেনার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে এসেছেন। ফলে চলতি বছর কুরবানির ঈদের পর সারাদেশে কাঁচা চামড়া বিক্রিতে ধস নামে। অবস্থা এতোই খারাপ হয়ে যায় যে মাত্র ৫০ টাকাতেও গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন অনেকে। আবার অনেক স্থানে দাম না পেয়ে মাটিতেই পুঁতে ফেলা হয়েছে কুরবানির পশুর চামড়া।
সরকারের কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের পর নড়েচড়ে বসেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) বুধবার (১৪ আগস্ট) আলাদা সাংবাদিক সম্মেলন করে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানায়।
সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কুরবানির চামড়ার বিষয়ে সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এই ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনার অভাব ছিল। তিনি বলেন, সরকারের উচিত ছিল, দেশের উৎপাদন ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে চামড়া রফতানির বিষয়ে আরো আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয়া। এখন চামড়া রফতানি করা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাবে না।
এ বিষয়ে সিপিডি’র সিনিয়র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এবার যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদন হয়েছে ও আগের বছরের অনেক চামড়া মজুদ রয়েছে সব কিছু বিবেচনা করলে এই বিপুল পরিমাণ চামড়া দেশের ভেতর ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। সুতরাং ব্যবসায়ীরা চাইলেও এত চামড়া কিনে দেশের ভেতর ব্যবহার করার মত অবস্থা তাদের নেই।
তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাই চামড়া মাটিতে পুতে দেয়া হচ্ছে, নদীতে ফেলে দেয়া হচ্ছে, অথবা রাস্তায় ফেলে দিলেও কেউ তা সংগ্রহ করছে না। এতে করে ইঙ্গিত পাওয়া যায় আসলে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ চামড়া ব্যবহার করার সামর্থ নেই। ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া রফতানির বিরোধিতা করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের বিরোধিতার প্রশ্নটি তখনই যৌক্তিক হবে যখন পুরো চামড়া তারা কিনবেন।
উল্লেখ্য, এ বছর পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার ও ব্যবসায়ীরা মিলে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা হবে। গত বছর প্রতি বর্গফুটের দাম একই ছিল। ২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ঢাকায় ৪৫-৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০-৪৫ টাকা।এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। গতবার খাসির চামড়ার দামও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ২০-২২ এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ