বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

তারুণ্য নির্ভর নেতৃত্ব নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: দলের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে শুরু হয়েছে দল পুনর্গঠনের কার্যক্রম। এরই মধ্যে অধিকাংশ জেলা ও অঙ্গ দলকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছরের শেষের দিকেই হবে কাউন্সিল। দলীয় চেয়ারপার্সনকে কারাগারে রেখে সম্মেলন করার বিষয়ে নেতাদের একটি বড় অংশের আপত্তি থাকলেও চলতি বছরের শেষ দিকেই হবে এ কাউন্সিল। এটিকে টার্গেট করেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির কারণে ‘অবিশ্বাস্য পরাজয়ের’ পর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের অংশ হিসেবে এই কাউন্সিলকে গুরুত্ব দিচ্ছে রাজপথের এ বিরোধী দল। জানা গেছে, এবারের কাউন্সিলে শীর্ষ তিন পদগুলোতে বড় চমকের সম্ভাবনা কম। পরিবর্তন আসছে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে। অসুস্থ নেতাদের বাদ দেয়া হবে, পূরণ করা হবে শূন্যপদগুলো। এক্ষেত্রে নতুন মুখ স্থান পাবে। দলের তরুণ এক বা একাধিক নেতাকেও স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদকীয় পদগুলোতে বড় রকমের পরিবর্তন আসার আভাস পাওয়া গেছে। এসব পদে পদে আসতে পারে নতুন মুখ। যোগ্য, ত্যাগী, তরুণ ও মেধাবীদের নেতৃত্বে আনা হবে।
সূত্র মতে, এতোদিন নানাভাবে দলের কাউন্সিলের কথা বলছিলেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। তবে গত ২২ জুন দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে এক অনুষ্ঠানে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের কাউন্সিলের কথা জানালেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে বলেছেন, বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্ততিও চলছে। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম, পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে পুনর্গঠন চলছে।
জানা গেছে, মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা দলের জাতীয় কাউন্সিলের কথা বললেও সেটি নির্ভর করছে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির উপর। তিনি মুক্তি পেলেই কেবল কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণা হতে পারে। তবে দলের পক্ষ থেকে চলতি বছরের শেষের দিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তখন আবহাওয়াও অনুকূলে থাকার পাশাপাশি তার আগেই বেগম জিয়ার মুক্তি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ৩৫টি মামলার মধ্যে দুইটি ছাড়া সব মামলায় বর্তমানে জামিনে রয়েছেন কারাবন্দী সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ কাউন্সিলে বিএনপির তিন বছর মেয়াদি কমিটি হয়।
সূত্র মতে, দল গঠনের পর থেকে কখনো সময়মতো কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের প্রেক্ষাপট আরো নেতিবাচক। সরকারি দল থেকে কাউন্সিল করার অনুমতি পাওয়া, বেগম জিয়ার মুুক্তি, নেতাকর্মীদের হয়রাণি বন্ধসহ নানা বাধা এখনো রয়ে গেছে। সব বাধাকে উপেক্ষা করে খুব শিগগিরই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল করতে চান দলের নীতিনির্ধারকরা। একাধিক নেতা জানান, চলতে বছরের শেষের সময়কে টার্গেট করে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি। এবার কাউন্সিলের মাধ্যমে রাজপথের পরীক্ষিত এবং তারুণ্য নির্ভর নেতৃত্ব নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা চলছে। দলের স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের কমিটিতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতারা গুরুত্ব পাবেন বলে জানা গেছে। প্রবীণ নেতাদের ঠাঁই হবে উপদেষ্টা কমিটিতে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে বেগম জিয়ার মুক্তি এবং তার শারীরিক সুস্থতার উপর। নেতাদের আশা দ্রুতই কারাবন্দী চেয়ারপার্সন বেগম জিয়া জামিনে মুক্তি পাবেন। কারাবন্দী বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা নিয়েই কাউন্সিলের প্রাক প্রস্তুতির দিকে এগুচ্ছে দলটি। প্রতিটি স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও কাউন্সিল নিয়ে কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি কাউন্সিলের পূর্ব প্রস্তুতি নিতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করেন। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কাউন্সিলের জন্য উপ-কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা হচেছ। দলের গঠনতন্ত্রে কো-চেয়াম্যান ও অতিরিক্ত মহাসচিবসহ নতুন পদ সৃষ্টি ও সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব পদ বিলুপ্ত করাসহ কিছু সংশোধন আনা হবে বলে জানা গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা আশা করছি, সরকার বাধা না হলে দ্রæতই কারাবন্দী বাকি দুই মামলায় (জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল মামলা) খালেদা জিয়া জামিন পাবেন। দলের কাউন্সিলের চাইতেও আমরা নেত্রীর মুক্তির বিষয়টিকে প্রাধাণ্য দিচ্ছি। চেয়ারপার্সনের উপস্থিতিতেই আমরা দলের কাউন্সিল করতে চাই।
ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, কাউন্সিলের জন্য যাবতীয় সব প্রস্তুতি চলছে। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি হলেই যাতে দ্রæত সময়ের মধ্যে কাউন্সিল করা যায় সে বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, এবারের কাউন্সিল বিগত সময়ের মতো জাকজমকপূর্ণ না নাও হতে পারে। অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশেই কাউন্সিল অনুষ্ঠান করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের কথা ভাবছি। সর্বাগ্রে আমাদের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রত্যাশা করছি। সরকার হস্তক্ষেপ না করলে আশা করছি, শিগগিরই বেগম জিয়া মুক্তি পাবেন। তাকে নিয়েই আমরা কাউন্সিল করতে চাই। নতুন নেতৃত্বে বিএনপিকে চাঙা করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী নেতাদের আগামী দিনের নেতৃত্বে মূল্যায়ন করা হবে। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য, ত্যাগী ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। সংস্কারপস্থিদের মধ্যে যারা দলে সম্পৃক্ত হয়েছেন তাদেরও পদায়ন করা হবে। তবে এবার সব কমিটিই হবে তারুণ্যনির্ভর। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে পিছিয়ে থাকা নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হবে না। এ সরকারের আমলে যাদের গায়ে মামলা হয়নি, হামলার শিকার হননি, সরকারের সঙ্গে আতাত করে নিজের ব্যবসা বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছেন তাদের প্রতিও কড়া দৃষ্টি রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড। এ ছাড়া কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত কমিটিতে এবারও ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে। জানা যায়, গত কাউন্সিলের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এবার কাউন্সিলে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হবে। কাউন্সিলের তিন বছরেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উপ-কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এবার দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সব কমিটিই গঠন করা হবে। নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাও করা হবে। প্রয়োজনে বর্ধিত সভা করা হবে।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এবার কেন্দ্র থেকে আর কোনো কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে একই আদলে কমিটি গঠন করা হবে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আমাদের দলের চেয়ারপার্সন কারাগারে। সাংগঠনিকভাবে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির সঙ্গে কথা বলে তিনি দল পরিচালনা করছেন। কাউন্সিলের উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দলে। সব কমিটিতেই যোগ্য ও ত্যাগীরা যেন মূল্যায়িত হয় সেটাই চাওয়া।
জানা গেছে, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে আসবে পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচজন নতুন মুখ আসতে পারে। বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা ও যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে পদোন্নতি দিয়ে এ পদে আনা হতে পারে। ৮২টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৩ জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিগুলো দ্রæত সময়ের মধ্যে করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করে যাচ্ছেন। যেসব জেলায় কোন্দল রয়েছে, সেগুলো নিরসনেও চেষ্টা চলছে। মূল দলের পাশাপাশি কাউন্সিলের আগে ছাত্রদলসহ অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দলের জাতীয় কাউন্সিলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ লক্ষ্যে আমাদের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচন হবে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে। তারা যাকে নেতৃত্বে চাইবেন এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে যারা যোগ্য এবং বিগত সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে অবদান রয়েছে, তারাই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসবেন বলে আশা করি।
সূত্র জানায়, ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে পাঁচটি পদে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। গতবার কাউন্সিলের পর দলের স্থায়ী কমিটি করা হয় তাতে দুটি পদ খালি রাখা হয়। এর মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ ও এমকে আনোয়ার মারা গেছেন। ফলে পাঁচটি পদ শূন্য হয়। সম্প্রতি স্থায়ী কমিটিতে সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরও তিনটি পদ ফাঁকা রয়েছে। এদিকে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার জন্য স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত। প্রবীণ নেতা ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারও শারীরিকভাবে ততটা ফিট নন। অসুস্থতার কারণে তাদের বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনটি পদ ফাঁকা ও আরও কমপক্ষে দুজনের বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে মোট পাঁচ পদে নতুন মুখ আসবে। এসব পদে তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ জায়গা পেতে পারেন। স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পেতে সিনিয়র নেতারা যার যার মতো করে সক্রিয় হয়েছেন। দলের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, বরকতউল্লা বুলু, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দীন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ পদে আসতে পারেন। এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নতুন মুখ আসবে। স্থায়ী কমিটিতে পদোন্নতি হওয়ায় কয়েকটি পদ ফাঁকা হওয়ার পাশাপাশি বিগত সময়ে কয়েকজন মারাও গেছেন। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে বাদ পড়বেন কয়েকজন।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এ কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ