বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে পাক-ভারত আলোচনার ব্যাপারে মতৈক্য

# জাতিসংঘ প্রস্তাবের ভিত্তিতে  সমস্যার সমাধান -চীন-রাশিয়া
# কারফিউ প্রত্যাহারের আহ্বান ওআইসির

সংগ্রাম ডেস্ক : কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষ হয়েছে। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি। যদিও চীন ওই বৈঠক থেকে একটি বিবৃতি দেয়ার প্রস্তাব তুলেছিল। রয়টার্স।
ওই বৈঠকের পর চীন বলেছে, কাশ্মীর বিষয়ে ভারত বা পাকিস্তান; কোনো দেশেরই একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। বৈঠকের পর চীন ছাড়া আর কোনো দেশ এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। অন্যদিকে রাশিয়া বৈঠকে যোগ দেয়ার আগে বলেছে, কাশ্মীর ইস্যু ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয়।
নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকে ভারত ও পাকিস্তানের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। শুধু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী ও ১০ অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রই এই আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেয়ার প্রস্তাব তোলে চীন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এবং অস্থায়ী সদস্য জার্মানি এ ধরনের বিবৃতি দেয়ার বিরোধিতা করে। তারা বলে, এ ধরনের কোনো বিবৃতি দিতে হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে দেয়া উচিত। পরে কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি।
বৈঠক শেষে জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুন বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত ও পাকিস্তান-উভয়েরই কাশ্মীর ইস্যুতে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি এরই মধ্যে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও বিপজ্জনক। অন্যদিকে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় অংশ নেয়ার আগে রাশিয়ার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি দিমিত্রি পলিয়ানস্কি সাংবাদিকদের বলেন, কাশ্মীর ইস্যু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয়। তিনি জানান, এই বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা কাশ্মীর বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরবে এবং এ ব্যাপারে মতবিনিময় করবে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এদিকে নিরাপত্তা পরিষদে রুদ্ধদ্বার আলোচনার পর জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেছেন, জম্মু-কাশ্মীর সম্পর্কিত বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় অবস্থান হলো, এটি পুরোপুরি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকবরউদ্দিন বলেন, জম্মু-কাশ্মীরের বিষয়ে ভারত সরকার মূলত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হয়। কিন্তু তাতে কোনো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেনি।
এ সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মদদ দেয়া থেকে পাকিস্তানকে সরে আসার আহ্বান জানান সৈয়দ আকবরউদ্দিন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের আলোচনার টেবিলে আসা উচিত। পাকিস্তান যেভাবে কাশ্মীর ইস্যুতে উদ্বেগ প্রদর্শন করছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।
জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি বলেছেন, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম কাশ্মীর ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হলো। এ বৈঠকই পাকিস্তানের শেষ পদক্ষেপ নয়। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠক কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে। জম্মু-কাশ্মীরকে দ্বিখÐিত করে কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারত সরকারের সিদ্ধান্তে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। কাশ্মীর নিয়ে বৈঠক আয়োজনের জন্য তারা নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি দেয়। পরে চীনের পক্ষ থেকেও একই প্রস্তাব দেয়া হয়।
এদিকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকতে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। কাশ্মীরের ভারতীয় অংশে বিধিনিষেধ আরোপের খবরে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন মহাসচিব।
১৯৪৮ সালে ও ১৯৫০-র দশকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধের বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোট নেয়ার কথাও ছিল।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য ১৯৪৯ সাল থেকে জম্মু ও কাশ্মীরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মোতায়েন আছে।

কোনো নেই বিবৃতি
সিএনএন : ১৯৭১ সালের পর কাশ্মীর ইস্যুতে এই প্রথমবারের মতো বৈঠক করলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ভারত জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর চীনের আহŸানে গত শুক্রবার ৯০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে চীন কাশ্মীর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বললেও নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি দিতে সম্মত হয়নি সদস্য রাষ্ট্রগুলো। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমের এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানানো হয়।
গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। লাদাখ ও কাশ্মীরকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে বিল আনা হয়। বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার অভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভাদুই কক্ষেই পাস হয়ে যায় বিলটি। এ ঘটনার পর জাতিসংঘে বৈঠকের আবেদন করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু এতে কাজ না হওয়ায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি চিঠি দেন নিরাপত্তা পরিষদে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জোয়ানা রোনেকাকে এই চিঠি দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি মালেহা লোদি। পরে কুরেশি সমর্থন আদায়ে চীন সফর করেন। বুধবার চীন নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের জন্য আহ্বান জানালে গত শুক্রবার তা অনুষ্ঠিত হয়। নিউ ইয়র্কে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের পর ফলাফল জানতে চাওয়া হলে জাতিসংঘের এক কূটনীতিক বলেন, বেশি কিছু না। এমনকী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাও এক বিবৃতিতে রাজি হতে সম্মত হয়নি। তারা আরও জানিয়েছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে কেউ পাকিস্তানের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে বা এমন কোনও বক্তব্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে; এই আশঙ্কায় বিবৃতি দিতে একমত হয়নি পরিষদের সদস্য দেশগুলো।
ওই কূটনীতিক জানিয়েছেন, ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে এমন ভাষা ব্যবহারে আপত্তি আছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সের। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে চীন দাবি করে, সংবিধান সংশোধন করে ভারত সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। চীনা কূটনীতিক বলেন, এই মুহূর্তে কাশ্মীরের পরিস্থিতি বিপজ্জনক। কাশ্মীরের দীর্ঘদিনের অবস্থা ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এমন একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ বৈধ নয়। চীনের রাষ্ট্রদূত জুন ঝ্যাং বৈঠকের পর জানান, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের একতরফা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।
জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি মালেহা লোদি বলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ কূটনীতিক ফোরামে আজ কাশ্মীরিদের কথা, অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের কথা শোনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই বৈঠকের মাধ্যমের মাধ্যমে নিশ্চিত হলো যে, এই সমস্যা আন্তর্জাতিক ইস্যু। কাশ্মীর সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইসলামাবাদ প্রস্তুত। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের পর জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ আকবারুদ্দিন বলেন, ‘এটা একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমাদের আন্তর্জাতিক করিৎকর্মাদের প্রয়োজন নেই।’ তিনি আরও বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পর্যায়ক্রমে বিধিনিষেধগুলো শিথিল করা হবে। সাধারণ নাগরিকদের ওপর চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ও যোগাযোগ জটিলতা ধীরে ধীরে সমাধান করা হবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি বলেন, ইমরান খান কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। কাশ্মীর পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের অবস্থা নিয়ে দুই নেতা কথা বলেন। ট্রাম্প-ইমরানের আলোচনায় কাশ্মীর ইস্যু ছাড়াও আফগানিস্তান পরিস্থিতি, তালেবানের সঙ্গে আলোচনাও স্থান পায়। পরে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনা কমাতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর গুরুত্বের কথা জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
কাশ্মীরের অচলাবস্থা নিরসনে গত শুক্রবার আবারও ভারতের প্রতি আহŸান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ডনের খবরে এ কথা বলা হয়। সেখানে আন্দোলনের ভয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব রাজনৈতিক নেতাদের গণহারে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলেও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। এক বিবৃতিতে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব কুমি নাইডু বলেন, দশ বছর পর আবারও কাশ্মীর ইস্যুটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উঠল। পরিষদের সব সদস্যের মনে রাখা উচিত, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সব নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ করে তার স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ বন্ধ করা যাবে না। ভারত সরকার কাশ্মীরে তাই করছে। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে কাশ্মীরে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ব্যাপারে এ গিয়ে আসারও অনুরোধ জানান।

কাশ্মীরীদের পূর্ণ সমর্থন দেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী
কাশ্মীরীদের প্রতি সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন নিশ্চিত করলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়া। গত শুক্রবার তিনি আজাদ জম্মু-কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট সরদার মাসুদ খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এ নিশ্চয়তা দেন। মাসুদ খান এদিন পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাত করেন ইসলামাবাদে। এ বিষয়ে ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিফ গফুর টুইট করেছেন। তিনি বলেন, তারা ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারতীয় প্ররোচনার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় সরদার মাসুদ খানকে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, সেনাবাহিনী পূর্ণ সমর্থন দেবে। প্রতিশ্রুতি দেন কাশ্মীর ইস্যু ও এর জনগণের বিষয়ে।

ভারতকে ‘স্তম্ভিত’ করলো রাশিয়া
ডেকান হেরাল্ড : দিল্লীকে অবাক করে শুক্রবার রাশিয়া কাশ্মীর সংকট সমাধানে জাতিসংঘের চার্টার ও রেজুলেশন অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি আশা প্রকাশ করেছে ভারত ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সংকটটির সমাধান করবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গত শুক্রবার কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রাশিয়া জানিয়েছে, তারা আশা করে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ সমাধানে ভারত ও পাকিস্তান জাতিসংঘের চার্টার, সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মেনে চলবে।
রাশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে অংশ নেওয়া রুশ কূটনীতিক দিমিত্রি পলিয়ানস্কি টুইটারে লিখেছেন, রাশিয়া সব সময়েই ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে জোর দিয়ে আসছে। রুশ কূটনীতিক আরও লিখেছেন, আমরা আশা করি কাশ্মীর বিরোধ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান হবে। যার ভিত্তি হবে ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি ও ১৯৯৯ সালের লাহোর ঘোষণা এবং জাতিসংঘের চার্টার, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন এবং ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিলের পর শুক্রবার চীনের আহ্বানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এক অনানুষ্ঠানিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসে। ১৯৭১ সালের পর কাশ্মীর ইস্যুতে এই প্রথমবারের মতো বৈঠক করলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।  জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকটি আনুষ্ঠানিক না হওয়ায় এর ফলাফলের কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে না। বৈঠকে হাজির হয়নি ভারত ও পাকিস্তান। এই বৈঠকে যোগ দিতে পারে শুধু পাঁচ স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী সদস্য। ৯০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চীন কাশ্মীর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বললেও নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি দিতে সম্মত হয়নি সদস্য রাষ্ট্রগুলো।
ভারতের বিস্মিত হওয়ার কারণ হলো কাশ্মীর সংকট সমাধানে জাতিসংঘের চার্টার ও সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনের ওপর রাশিয়ার গুরুত্বারোপ করা এবং বিষয়টি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সমঝোতা। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর বিরোধ উত্থাপনের ক্ষেত্রে সিমলা চুক্তি ও লাহোর ঘোষণাকে হাতিয়ার করে পাকিস্তানকে ঠেকিয়ে আসছে। ভারত সব সময় দাবি করে আসছে, কাশ্মীর ইস্যু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এছাড়া নয়া দিল্লি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করতে মোদির অনুরোধের বিষয় অস্বীকার করেছে। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের এই অবস্থান তাদের ‘পুরনো বন্ধু’ রাশিয়ার জানা। কিন্তু এরপরও শুক্রবার জাতিসংঘে নিযুক্ত রুশ দূত আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ চার্টার ও রেজুলেশন অনুসারে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধানের জন্য।
নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর তা শুরুর আগে ২৪ ঘণ্টায় ভারত জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী দশ সদস্য রাষ্ট্রের কাছেও যায় নয়া দিল্লি। যাতে করে নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচনায় না আনে। কিন্তু পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে রাশিয়াকে নিয়েই ভারতের কোনও সংশয় ছিল না। ভারতের ধারণা ছিল, তাদের অবস্থানের পক্ষে দৃঢ় সমর্থন জানাবে রাশিয়া। পাকিস্তান যাতে কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে না পারে সেজন্য ভারতের পক্ষে থাকবে রাশিয়া।
এর আগে রাশিয়া কাশ্মীর ইস্যুতে মোদি সরকারের সিদ্ধান্তকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে স্বীকৃতিও দিয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের তোলা প্রস্তাবে বেশ কয়েকবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। ফলে এই ইস্যুতে কোনও রেজুলেশন পাস হয়নি।
সম্প্রতি পাকিস্তানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশির সঙ্গে আলোচনায় রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ সমাধানে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ের চেয়ে কোনও বিকল্প নেই।

কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তানী গুলীতে আরও এক ভারতীয় সেনা নিহত
হিন্দুস্তান টাইমস : জম্মু-কাশ্মীরের রাজৌরি সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গুলীতে আরও এক ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে। ভারতের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে জেলার নওশেরা সেক্টরের সীমান্ত রেখায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মর্টার সেল নিক্ষেপ ও গুলি চালালে এই ভারতীয় সেনা নিহত হন। নিহত সেনা সদস্য দেহরাদুনের বাসিন্দা ন্যান্স নায়েক সন্দীপ থাপা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানা গেছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত-পাকিস্তানের তিনটি যুদ্ধের মধ্যে দুটি হয়েছে কাশ্মীর ইস্যুতে। গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এর প্রতিবাদে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করাসহ ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্তান। দুই দেশের সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। কাশ্মীর সীমান্তে চলছে টানটান উত্তেজনা। একইসঙ্গে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত ও ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে কালো দিবস হিসেবে পালন করেছে পাকিস্তান। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ভারতীয় বাহিনীর গুলিতে একজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। তাদের হিসাব মতে, ভারতের স্বাধীনতা দিবসে কাশ্মীর সীমান্তে গোলাগুলিতে এ নিয়ে চার পাকিস্তানি ও  পাঁচ ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হলেন। তবে ভারতের দাবি, কাশ্মীরে তাদের কোনও সেনা নিহত হয়নি।
শনিবার সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নওশেরা সেক্টরে সকাল সাড়ে ৬টায় সীমান্তের ওপার থেকে গুলি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত ভারতীয় সেনাবাহিনী যথাযথ পাল্টা হামলায় চালায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই পক্ষ থেকে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছিল। গত মাসে কাশ্মীরের পুঞ্চ ও রাজৌরিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে দুই সেনা কর্মকর্তা ও এক শিশু নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে অনেকেই।

কাশ্মীরের কারফিউ প্রত্যাহারে ভারতের প্রতি ওআইসির আহ্বান
ডন : ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে ১২ দিন ধরে জারি করা কারফিউ তুলে নিতে দেশটির সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়েছে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি)। গতকাল শনিবার পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওআইসির এই আহŸানের কথা এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি।
গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। লাদাখ ও কাশ্মীরকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে বিল আনা হয়। বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার অভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভা দুই কক্ষেই পাস হয়ে যায় বিলটি।
এ সিদ্ধান্তের পর জাতিসংঘে বৈঠকের আবেদন করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু এতে কাজ না হওয়ায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি চিঠি দেন নিরাপত্তা পরিষদে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জোয়ানা রোনেকাকে এই চিঠি দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি মালেহা লোদি। পরে কুরেশি সমর্থন আদায়ে চীন সফর করেন। গত বুধবার চীন নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের জন্য আহŸান জানালে গত শুক্রবার তা অনুষ্ঠিত হয়। কাশ্মীর ইস্যুতে দীর্ঘ অর্ধযুগ পর বৈঠকে বসলেও সদস্য দেশগুলো কোনও ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতিও দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর ইস্যু তোলার পর এখন ওআইসির বিবৃতি আদায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক অর্জন। সম্প্রতি জেদ্দায় ওআইসি সদস্যরা এ বিষয়ে সহমত জানায় ও একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে ওআইসি বলেছে, কাশ্মীরে যেনও মুসলিমদের মানবাধিকার রক্ষা পায় ও ধর্ম পালনে বাধা না হয়। এছাড়া জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।

ভারতের সাথে কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরানকে বৈঠকে বসার তাগিদ ট্রাম্পের
এএফপি : কাশ্মীর নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান আফগানিস্তান নিয়েও আলোচনা করেছেন, যেখানে তালিবানদের সঙ্গে আলোচনা করছে আমেরিকা। আর এখন জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে কথা বলুক ভারত ও পাকিস্তান , এমনটাই চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের সময় কাশ্মীর ইস্যুতে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদকে আলোচনায় বসার আহŸান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে একথা জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা। জম্মু ও কাশ্মীরকে দেওয়া বিশেষ মর্যাদাকে (৩৭০ ধারা) অবলুপ্ত করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের পদক্ষেপের পরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় আমেরিকা। এমনকি বিযয়টি জাতিসংঘের কাছে পৌঁছলে জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে রুদ্ধদ্বার বৈঠকও করে নিরাপত্তা পরিষদ। এ বৈঠকে রাশিয়া বিষয়টি পাকিস্তান ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক বিষয় বলে অভিহিত করে। এরপর ভারতের তরফ থেকে বলা হয়, কাশ্মীর ইস্যু পুরোপুরিই অভ্যন্তরীণ বিষয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি দাবি করেছেন যে ইমরান থান ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপচারিতা’ হয়েছে, এবং কাশ্মীর সংক্রান্ত বিষয়েও কথা হয়েছে। রেডিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সে দেশের বিদেশমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং সেখানকার আঞ্চলিক শান্তি বিপন্ন হওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’
পরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে শাহ মেহমুদ কুরেশি দাবি করেন যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চার জনই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে সমর্থন জানিয়েছে। তিনি আরও জানান, ফরাসী রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি পাকিস্তানের ঘোষিত মিত্র দেশ চীনের অনুরোধে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আলোচনাটি কেবল তার পাঁচটি স্থায়ী সদস্য এবং ১০ টি অস্থায়ী সদস্যের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের করা একটি আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়।
গত ৫ অগাস্ট, ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে এবংরাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরেই পাকিস্তান নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করে এবং পাকিস্তান থেকে ভারতীয় হাই কমিশনারকে বহিষ্কার করে । যদিও ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাকে অবলুপ্ত করার জন্য এই পদক্ষেপ পুরোপুরিই একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এই বিষয়ে পাকিস্তানকে “বাস্তবতা স্বীকার করার” পরামর্শও দেওয়া হয়।

জাতিসংঘে ভারত বললো কাশ্মীর ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’
নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম সদস্য দেশ রাশিয়া পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, কাশ্মীর দুই-দেশের বিষয়। ফলে, পাক-চীনের দাবি নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিল না নিরাপত্তা পরিষদ। যার জেরে জাতিসংঘে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য কোনো পাত্তা পায়নি। জাতিসংঘের দিক নির্দেশনা অনুসারে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে সমাধান তথা সেখানকার বাসিন্দাদের গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে ইসলামাবাদ। কিন্তু দিল্লি তা বরাবরের মতোই অস্বীকার করে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইস্যুতে এর আগে আগ্রহ দেখালেও এবার কোনো প্রভাব রাখার চেষ্টাই করেননি। নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম সদস্য দেশ রাশিয়া পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, কাশ্মীর দুই-দেশের বিষয়। ফলে, পাক-চীনের দাবি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি নিরাপত্তা পরিষদ যখন জম্মু ও কাশ্মীরে লাখ লাখ মানুষ গৃহবন্দী হয়ে অস্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। রাশিয়ার কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অস্ত্র ক্রয়ের ব্যবসায়িক স্বার্থ ছাড়াও ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনীতির কাছে পাকিস্তান কার্যত কিছু করতে পারছে না। ওআইসিসহ মুসলিম দেশগুলোও এব্যাপারে রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
চীনের সমর্থন নিয়ে কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘে ‘রুদ্ধদার বৈঠক’-এর আর্জি জানিয়েছিল পাকিস্তান। তার প্রেক্ষিতেই গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। যদিও, এই বৈঠকে ভারত ও পাকিস্তানের কেউই সদস্য না হওয়ায় সরাসরি এ দু’টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দিতে পারেনি। সাংবাদিকদের জন্যে প্রবেশাধিকার ছিল বারণ। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী এবং ১০ অস্থায়ী সদস্যকে নিয়েই বৈঠক হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠক শেষে জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুন বলেন, ‘কাশ্মীরের পরিস্থিতি এমনিতেই খুবই উত্তেজনাপূর্ণ এবং বিপজ্জনক। ভারত ও পাকিস্তান, উভয়েরই কাশ্মীর ইস্যুতে একতরফা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা উচিত।’
এদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের এই বৈঠকের পর ভারত আরও একবার ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে। ভারতের প্রতিক্রিয়া, ৩৭০ ধারা নিয়ে জাতীয় অবস্থান যা ছিল, সেটাই থাকবে। এটি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু এ বিষয়টির কোনো সুরাহা গত ৭০ বছরে না হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা উত্থাপন হলে ভারতের তরফ থেকে বলা হয় এটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যু। এই দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর ঘেরাটোপে আটকে আছে আন্তর্জাতিক ও অভিন্ন নদী নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি হিস্যার বিষয়টিও। একই অজুহাতে দক্ষিণ এশিয়ায় এক মুদ্রা বা অভিন্ন বাজার ব্যবস্থা চালু হবার বিষয়টি সুদূর পরাহত।
জাতিসংঘে নিরাপত্তা বিষয়ক দফতরে ভারতের স্থায়ী দূত সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ধীরে ধীরে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বদ্ধপরিকর সরকার। স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পদক্ষেপ করছে সরকার। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো বিষয় নেই। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের বাসিন্দাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নই লক্ষ্য’। যদিও ওই এলাকা ভারতের অনেক রাজ্যের চেয়ে এখনই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। সামাজিক সূচকের দিক থেকেও এগিয়ে।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তোপ দেগে আকবরউদ্দিন বলেন, পাকিস্তান বরং সন্ত্রাস বন্ধ করে, শিমলা চুক্তি মেনে চলুক। পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে যে ছবি তুলে ধরতে চাইছে, তা প্রকৃত সত্য থেকে বহুদূরে বলেই মত ভারতীয় দূতের। পাকিস্তানের নাম না-করে বলেন, ‘উদ্বেগের বিষয় হল, জিহাদ শব্দটি ব্যবহার করছে একটি রাষ্ট্র। আর তাদের নেতারা ভারতে সন্ত্রাসে মদত দিচ্ছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ