শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

টেরাকোটা টাইলস রফতানি না করেই ভুয়া বিলে ১৭৪ কোটি টাকা উত্তোলন

স্টাফ রিপোর্টার : টেরাকোটা টাইলস রফতানি না করে ভুয়া রফতানি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ১৭৪ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন এসবি এক্সিম বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহজাহান বাবলু। অথচ কোনো পণ্যই রফতানি হয়নি। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে তিনি ওই টাকা বিদেশে পাচার করেন। আবার ব্যাংকের মাধ্যমে সেটা ফিরিয়ে এনে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অর্থ পাচারের অভিযোগে শাহজাহান বাবলু ও সহযোগী ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শিগগিরই মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর চিঠি দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসবি এক্সিম বাংলাদেশের সহযোগী ৭টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা-সম্পর্কিত তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি গেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে চিঠি দিয়ে ২২৪টি শিপিং বিলের পণ্য রফতানি তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
গত ১৮ জুলাই ‘টেরাকোটা টাইলসে টাকা পাচার’ শিরোনামে প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশিত হলে এটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। অনুসন্ধানে নেমেই সংস্থাটি এসবি এক্সিম বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। শাহজাহান বাবলু, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ৯ কর্মকর্তার মধ্যে ৮ জন এবং ৩ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে শুনানির জন্য ডেকে নেয়।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র বলছে, যেসব রফতানি বিলের বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়েছে তার বিপরীতে কোনো পণ্য রফতানি করা হয়নি বলে এসবি এক্সিম লিখিতভাবে স্বীকার করেছে। ঋণ নেওয়ার জন্য যেসব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও সঠিক নয়।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের স্বীকারোক্তিমূলক চিঠির তথ্য অনুসারে দেখা গেছে, তারা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ১৭৪ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, যা বর্তমানে সুদে–আসলে ১৯৮ কোটি টাকা হয়েছে। ওই ১৭৪ কোটি টাকা দিয়ে তারা ঋণ পরিশোধ এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। তথ্যমতে, ওই টাকা দিয়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় ৪৮ কোটি ২ লাখ, কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ে ২২ কোটি ৭৭ লাখ, ইসলামী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় কমপ্লেক্স শাখায় ১৬ কোটি ৩৯ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক দিলকুশা করপোরেট শাখায় ২ কোটি ৫৫ লাখ, ইউসিবিএল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকাসহ মোট ৯০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ শোধ করেছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ওই ঋণের টাকা দিয়ে আমদানি বাবদ ১২ কোটি ৪৫ লাখ, বন্দর থেকে মালামাল ছাড় করা বাবদ ২ কোটি ২৮ লাখ, ৩টি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ বাবদ ১০ কোটি টাকা, ব্যক্তিগত ঋণ বাবদ ২৬ কোটি টাকা, জমি কেনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বাবদ ৫ কোটি টাকা, স্থানীয় বাজার থেকে মালামাল কেনা বাবদ ২৭ কোটি টাকাসহ ৮২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এ হিসাবে মোট ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা খরচ করার কথা তথ্য জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শুল্ক গোয়েন্দা নিশ্চিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে রফতানি না করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। অবৈধভাবে ঋণ নিয়ে সে অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করেছে। অবৈধভাবে অর্জিত ওই অর্থ বৈধ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে।
এসবি এক্সিম ১০টি টিটির মাধ্যমে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দিলকুশা শাখার সহায়তায় আড়াই লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় দুই কোটি টাকা) এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটায় বিদেশে পাচার করেছে। ৬৪টি রফতানি বিলের বিপরীতে ১ কোটি ৪ লাখ ২৭ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৮৭ কোটি ৪১ লাখ ৫৭ হাজার ২০২ টাকা দেশে এসেছে। সেই টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। রপ্তানি না হওয়া সত্ত্বেও রপ্তানির বিপরীতে টাকা ফেরত আসায় স্পষ্টতই প্রমাণ হয়, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে সে টাকা রফতানি মূল্য হিসেবে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
অনুসন্ধান আরও বলছে, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাব দেওয়ার পর দিন দিনই ঋণ অনুমোদন হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসবি এক্সিম বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন।
সূত্র জানায়, কমার্স ব্যাংকের তৎকালীন এমডি (কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি) আর কিউ এম ফোরকান শুল্ক গোয়েন্দায় শুনানিতে দাবি করেছেন, শাখা অফিস, ট্রেড ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সুপারিশ ও বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে ওই ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। তিনি ট্রেড বিভাগের প্রধান কাজী রেজাউল করিম ও আফজাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ট্রেড বিভাগের প্রধান কাজী রেজাউল করিম ও আফজাল হোসেন শুনানিতে বলেছেন, ওপর থেকে (বিশেষ করে পরিচালকদের) চাপ থাকার কারণে সব শর্ত পূরণ না করার সত্ত্বেও ঋণ অনুমোদন হয়েছে। ঋণ প্রস্তাবে সব বিবরণ থাকার পরও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। ওই বিভাগের অন্য দুই কর্মকর্তা জামাল হোসেন ও শাহিনুজ্জামান বলেছেন, তাঁরা যথাযথভাবে তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও বিরাগভাজনের ভয়ে কাজ করেছেন।
দিলকুশা শাখার ব্যবস্থাপক ফকির নাজমুল আলম শুনানি বলেছেন, রপ্তানি শুরুর দিকে টাকা ফেরত আনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নির্ভরযোগ্যতা তৈরি করে, যা তাঁরা বুঝতে পারেননি। তিনি বলেছেন, সুইফট-এ ৭ কোডের ম্যাসেজ, ঋণপত্রের ম্যাসেজ ইত্যাদি পাওয়ার পর প্রধান কার্যালয়ে ঋণ অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা শাখার নেই। শুল্ক গোয়েন্দার ওই শুনানিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আলমকে হাজির হতে বলা হলেও তিনি হাজির না হয়ে আইনজীবীকে পাঠান। আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি তাঁর বক্তব্য দেন।
পুরো অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষে শুল্ক গোয়েন্দা বলছে, রফতানির নামে অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় বিদেশে অর্থ পাচার, রফতানি না হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ আনা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অপরাধ সংঘটনসব কটিই মানি লন্ডারিং আইনের বিভিন্ন ধারায় অপরাধ। সে কারণে এসবি এক্সিম বাংলাদেশের মালিক শাহজাহান বাবুল ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর কথা। বোর্ডের চেয়ারম্যানের অনুমোদন পেলেই মামলা হওয়ার কথা। সূত্রমতে, আগামী সপ্তাহেই এ মামলা হতে পারে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মাটির তৈরি টেরাকোটা টাইলস রফতানি করেছে এসবি এক্সিম নামের ঝিনাইদহের ওই প্রতিষ্ঠান। এখন সেই রফানির বিপরীতে ২০০ কোটি টাকা দেশে আসছে না। যদিও ওই রফতানি বিল কিনে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯০ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। ব্যাংকটির মালিকানায় রয়েছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এখন সেই রপ্তানির টাকাও দেশে আসছে না, ফলে ১৯০ কোটি টাকাও শোধ হচ্ছে না। আসবেই বা কীভাবে, বিদেশি যেসব ব্যাংক থেকে রপ্তানি আদেশ এসেছিল, তার চারটিরই নিজ দেশে কার্যক্রম নেই, পরিচালনায় অনুমোদনও নেই। বৈশ্বিক ভাষায় যা ‘শেল ব্যাংক’ নামে পরিচিত। এসব ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনে বৈশ্বিক ও দেশীয় নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
এসবি গ্রুপকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের যে তিনটি প্রতিষ্ঠান টেরাকোটা টাইলস কেনার আদেশ দেয়, এর মধ্যে দুটির মালিকানায় বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে হেন্ডিওয়্যার ইন্টারন্যাশনাল জেনারেল ট্রেডিংয়ের কর্ণধার বাংলাদেশের মোহাম্মদ রাফিউদ্দিন ও সাবিয়া আফরিন। আবার আল মাওয়াদ জেনারেল ট্রেডিংয়ের কর্ণধারও মোহাম্মদ রাফিউদ্দিন। প্রতিষ্ঠান দুটি চামড়াজাত পণ্য ও পশুর লোম নিয়ে ব্যবসার জন্য দেশটিতে নিবন্ধিত হলেও বাংলাদেশ থেকে টাইলস আমদানি করেছে বলে ব্যাংকের নথিপত্রে বলা হচ্ছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মিলস্ট্রিম গ্লোবাল জেনারেল ট্রেডিং। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানই ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৭২টি ঋণপত্রের মাধ্যমে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫২ হাজার ডলারের (৩৫০ কোটি টাকা) টাইলস আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলে। এসবি গ্রুপ যে টাইলস রফতানি করে, তার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১০ ডলার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ