শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

রাজনীতির স্বরূপ ও দায়বদ্ধতা

ইবনে নূরুল হুদা : রাজনীতি সেই নীতি যে নীতি অনুসরণের মাধ্যমে  একটি জাতি বা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। মূলত রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছুসংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দল পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সাধারণভাবে রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনার রীতিনীতিকে রাজনীতি বলা হয়। এছাড়াও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ যেসব স্থানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বসবাস বিদ্যমান সেখানেই রাজনীতির চর্চা হয়ে থাকে। 

রাজনীতিকে একটি যুদ্ধ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে। যেখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকে, বুদ্ধির মারপ্যাচে অন্যকে পরাভূত করার মানসিকতা বিরাজমান থাকে, সর্বদা নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তৎপরতা থাকে। তাই সংক্ষেপে রাজনীতির সংজ্ঞা হচ্ছে, ‘ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িত অর্থাৎ যে সকল কাজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে করা হয় তাই রাজনীতি’।

সমাজে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতির ময়দানে বেশ কিছু নিয়ম-কানুন আছে। যার মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে কেউ সমাজে নিজের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।  একইভাবে খেলা বা অন্যান্য বিষয় নিয়েও রাজনীতি করা যায়। অফিসে সহকর্মীদের মধ্যে উপরে উঠার চেষ্টা-কৌশলকে অফিস রাজনীতি  বা ঙভভরপব ঢ়ড়ষরঃরপং বলে। তেমনিভাবে গ্রামে পরস্পরের মধ্যে বিভিন্ন কৌশলে নিজেকে উপরে তোলা ও নিজের কর্তৃত্ব প্রতষ্ঠার লড়াইকে গ্রাম্য রাজনীতি বা  ারষষধমব ঢ়ড়ষরঃরপং বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতিকে স্বার্থ হাসিলের অভিসন্ধি হিসেবে দেখা হলেও রাজনীতির অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল গণমানুষের কল্যাণকে নিমিত্ত করে। আসলে সভ্যতার এক অন্যন্য সাধারণ অবদান রাজনীতি। মূলত যে নীতির মাধ্যমে গণমানুষের কল্যাণ সাধন করা যায়-তাই রাজনীতি হিসেবে বিবেচিত। একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশ-কাল, জাতি-রাষ্ট্রভেদে রাজনীতির কক্ষচ্যুতি ঘটেছে। রাজনীতি আর রাজনীতির জায়গায় নেই। অন্ধ স্বার্থবাদিতা সে স্থান দখল করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিচ্যুতিটা আরও বড় ধরনেরই বলতে হবে। তাই আমাদের প্রচলিত রাজনীতি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে রাজনীতির আদর্শিক মানদ্ব- অনেকটা ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিতেও রীতিমত ভাটির টান পড়েছে। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার পাশাপাশি সামাজিক কোন দায়বদ্ধতা কি আছে ? এর উত্তরে বলা যায়, শুধু রাজনীতি নয় বরং সমাজের সভ্য হিসেবে আমরা কেউই সামাজিক দায় থেকে মুক্ত নই। তবে একথা সত্য যে, সেবামূলক কাজ হিসেবে রাজনীতির সামাজিক দায়বদ্ধতা অন্যদের চেয়ে বেশিই বলতে হবে। একথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন তাদের দায়টা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, ক্ষমতাসীনদের হাতেই থাকে সমাজ-রাষ্ট্রের সকল কিছুরই নিয়ন্ত্রণ বা চাবিকাঠি। যেহেতু রাজনীতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তাই রাজনীতির পাত্রমিত্ররাও সামাজিক দায় থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রত্যেকের যেমন কিছু দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সে দায়িত্ব পালনের জন্য একটা উপযুক্ত পরিবেশও জরুরি। আর সে পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনকে নির্বিঘœ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের। মূলত কোন সমাজরাষ্ট্রে সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা অবারিত করতে হলে সে সমাজে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইন ও সাংবিধানিক শাসন নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ, গণতন্ত্র ও সুশাসনহীন সমাজে সুকৃতির চর্চা কখনোই সফল ও সার্থক হয়ে ওঠে না। এমন আশা করাটাও বাতুলতা মাত্র।

রাজনীতির সামাজিক দায় আছে কি না, আর থাকলেই বা কতটুকু আর ক্ষমতাহীনদের জন্য সে দায়িত্ব পালন কতখানি সম্ভব-এই আলোচনা সম্প্রতি কিছুটা বাজার পেয়েছে। বিভিন্ন ‘টকশো’তে তা রীতিমত স্থান করে নিয়েছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনাও প্রত্যক্ষ করেছি। মূলত ‘রাজনীতি’ এমন এক প্রক্রিয়ার নাম, যার মাধ্যমে কিছু মানুষের সমন্বয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অধিকার অর্জন করে। আর রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতাচর্চার মাধ্যমে  গণমানুষের কল্যাণ সাধন। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। যার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য হচ্ছে আর্তমানবতার কল্যাণ।

মূলত সামাজিক এককগুলোর সেতুবন্ধনের বৃহত্তর ও পরিশীলিত রূপই হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে একটি গতিশীল ও যুৎসই নির্দেশনা প্রদান করে। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্লেটোর ‘রিপাবলিক’, এরিস্টটলের ‘রাজনীতি’ এবং কনফুসিয়াসের কিছু লেখনীতে। যা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পথ নির্দেশক হিসেবে মনে করা হয়।

রাজনীতির উদ্ভব মানবসভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে রাজার রাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে ঘটেছে এবং পরিপূর্ণতাও লাভ করেছে। রাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা এবং রাজনৈতিক কলা-কৌশল ও পরবর্তীকালের আধুনিক রাজনীতির শ্রেণিবিন্যাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানমূলক চিন্তাধারার উত্থান ঘটিয়েছে। যার পরিশীলিত রূপই হচ্ছে আজকের আধুনিক গণতন্ত্র। মেকিয়াভেলী রচিত ‘ঞযব চৎরহপব’ গ্রন্থটি রাজতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়ীত্ব নিয়ে একটি প্রাণবন্ত বিশ্লেষণ করেছে। এককথায় রাজনীতি হলো বিশেষ রাজত্ব কেন্দ্রিক নীতি বা রাজার নীতি। কেউ কেউ রাজনীতিকে ‘নীতির রাজা’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সব নীতির সেরা নীতিই হচ্ছে ‘রাজনীতি’। তাই রাজনীতি ও সভ্যতা শুধু পরস্পর সম্পর্কযুক্তই নয় বরং একে অপরের পরিপূরকও বটে। তাই রাজনীতি শুধু সামাজিক দায় নয় বরং মানবকল্যাণের কোন অনুষঙ্গকেই উপেক্ষা করতে পারে না।

রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গ হলো রাজনৈতিক দল বা শক্তি। আর রাজনৈতিক দল হচ্ছে নাগরিকদের এমন একটি সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠী যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে বিজয় অর্জন ও সরকার গঠন করার বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ। রাজনৈতিক দল সমষ্টিগত কল্যাণ কিংবা সমর্থকদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু প্রস্তাবিত নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐকমত্য পোষণ করে এবং সেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়।

আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক দলের পরিচয় ও পরিচালনা পদ্ধতিতে কিছু মিল থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নতাও দেখা যায়। এর মধ্যে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্নতাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অনেক রাজনৈতিক দলের একটি মূল আদর্শ থাকে। কিন্তু কোন কোন রাজনৈতিক দলের তা থাকে না। আবার কিছু রাজনৈতিক দলের ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ থেকে অনেকটাই ভিন্নতর রূপ নেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচকম-লী সরকার পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ক্ষমতায় পাঠায়। অনেক দেশেই বহুসংখ্যক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল থাকে। যেমন জার্মানি ও ভারত। আবার কিছু দেশে একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রচলিত আছে, যেমন চীন ও কিউবা। যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো ছোট রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সঙ্গে দ্বিদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রচলিত আছে। সেদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দু’টি দল হচ্ছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি। আর প্রত্যেকটি দেশের সরকার গঠন ও শাসন প্রক্রিয়া শাসনতন্ত্র বা সংবিধানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

রাজনীতি একটি সেবামূলক কাজ। রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে কিছুসংখ্যক লোককে সংগঠিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধন। রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তারা সব সময় একথাই বলে থাকেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলেই শুধু জনগণের কাছে প্রতিশ্রুত কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করবেন। আর তারা জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন সেসবের সিংহভাগই রাষ্ট্র ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই জনগণের কাছে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য ক্ষমতায় যাওয়া অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর জনগণ যাদের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠায় তাদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সাথে সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতাও এসে যায়। যদিও কোন রাজনৈতিক শক্তিই সামাজিক এই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু ক্ষমতাবান আর ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক শক্তিকে  একই তুলাদ-ে বিচার করা যৌক্তিক বলে মনে হয় না। 

সম্প্রতি ‘রাজনীতির সামাজিক দায়’ বিষয়ক আলোচনাটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের উপর্যুপরি ব্যর্থতা, দেশে হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, ধর্ষণ, গণপিটুনীতে, বিভিন্ন বিষয়ে গুজব সৃষ্টি, দেশ ও জাতিসত্ত¦াবিরোধী ষড়যন্ত্রসহ নানাবিধ অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের সার্বিক অবস্থার ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই। সম্প্রতি হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের নেত্রী প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নালিশ করেছেন। যার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই। তাই প্রিয়ার বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলেই মনে করছেন দেশের আত্মসচেতন মানুষ। কিন্তু সরকার তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এমন কিছু করছে যা প্রিয়া সাহাদের পালে হাওয়া দিচ্ছে। যা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও উদাসীনতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মূলত রাষ্ট্র অপরাধের প্রতিবিধান করতে না পারা বা এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদাসীনতায় দেশে অপরাধপ্রবণতা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ। 

আমাদের দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা এবং অন্য রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভবনা খুব ক্ষীণ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটেই ‘রাজনীতির সামাজিক দায়’ বিষয়ক কথাটা ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে। বলা হচ্ছে ক্ষমতার বাইরে থেকেও সামাজিক কাজের মাধ্যমে দেশ ও জাতির জন্য প্রভূত কল্যাণ করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে সংসদের বাইরের দলগুলোর এ ধরনের কোন কর্মসূচি লক্ষ্য করা যায় না বলে অভিযোগ। এতে প্রতীয়মান হয় পক্ষ বিশেষ চাচ্ছে একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা চিরস্থায়ী হোক আর অন্য রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচি বাদ দিয়ে সমাজ সেবামূলক কাজে মনোযোগী হয়ে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা নির্বিঘœ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করুক। মূলত একটি মহল দেশকে একদলীয় শাসনের নিগঢ়েই আবদ্ধ করতে বেশ তৎপর বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু তা বাস্তবসম্মত কি না তা-ই এখন ভেবে দেখার বিষয়। কারণ, অতীতেও এধরনের তৎপরতা সফলতার মুখ দেখেনি। আর ভবিষ্যতেও দেখবে বলে মনে হয় না।

একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে সামাজিক কাজ করতে হলে সবার আগে যা প্রয়োজন তা হলো কাজ করার পরিবেশ। মূলত কোন সমাজ-রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকে তাহলে সে সমাজ সুকৃতির চর্চার জন্য মোটেই সহায়ক হয় না। বস্তুত কোন সমাজের সুকৃতির চারা রোপণ থেকে বেড়ে ওঠা ও পূর্ণতা লাভের জন্য  প্রয়োজন হলো গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্যই। তাই আমাদের প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক কিছু আশা করাটা মোটেই সঙ্গত হবে না।

রাজনীতি আর সমাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হলেও উভয় ক্ষেত্রের দায়বদ্ধতার পরিসর এক ও অভিন্ন নয়। এমনকি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি কোন ক্ষেত্রেই শর্তহীনও বলা যাবে না। তাই রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বরূপ কী সেই বিষয়েই প্রথমে আলোচনা হওয়া দরকার।  একথা বললে অত্ত্যুক্তি হবার কথা নয় যে, সামাজিক দায়বদ্ধতা হল এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা নীতি যা সমাজের প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। যে পরিবেশে বা যে সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন গড়ে ওঠে সেই সমাজের প্রতি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কিছু দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করছে এবং তাদের শেয়ারহোল্ডারদের  লভ্যাংশের কিছু অংশ এই খাতে বরাদ্দ রাখছে। কিন্তু রাজনীতি কোন ব্যবসা নয় বরং একটি সেবামূলক কাজ। সঙ্গত কারণেই এ ক্ষেত্রে রাজনীতির পরিসরটা সম্পূর্ণ আলাদাই বলতে হবে।

মূলত বৃহদাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সামাজিক দায় থেকে যেভাবে সম্পৃক্ত হওয়া সম্ভব, রাজনীতির ক্ষেত্র ততটা মসৃণ নয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা আরও কন্টকাময় ও সমস্যাসঙ্কুল। কারণ, আমাদের দেশে রাজনীতির সুস্থধারার চর্চাটা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। সঙ্গত কারণেই রাজনীতির পাত্রমিত্রদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকলেও তাদের পরিসরটা অন্যদের তুলনায় বেশ সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণই বলতে হবে। বিশেষত আমাদের দেশের নেতিবাচক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করলে সেক্ষেত্রটা পুরোপুরি আলাদা। কারণ, কোন প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের পক্ষেই রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল হওয়ার সুযোগ নেই। এমনটা কেউ মনেও করেন না।   মূলত সামাজিক দায়বদ্ধতা শব্দটি পশ্চিমা বিশ্বে ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের দিক থেকে প্রচলিত হওয়া শুরু করে। বড় বড় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই ধরনের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দেওয়ার জন্য স্টেকহোল্ডার কথাটির প্রচলন করে। এই শব্দটির অর্থ হল সমাজের সেই সকল মানুষ যারা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হন।

এর প্রবক্তাদের মতে বড় কোম্পানিগুলো এই ধরনের দর্শন নিয়ে পরিচালিত হলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রতিষ্ঠানে মুনাফায় পরিচালিত হয়। অপরদিকে সমালোচকদের মতে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তাদের প্রধান কার্যকলাপ থেকে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং এতে করে ব্যবসার যথেষ্ট পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। ২০০০ সালে প্রকাশিত ম্যাকউইলিয়াম এবং সেইগেলের গবেষণাপত্রে তারা প্রায় ১ হাজার শিক্ষাবিদের উদ্ধৃতি তুলে ধরে দেখান যে সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কর্মকা-কে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করেছে। তার মতে প্রতিষ্ঠানসমূহ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে তা যদি গবেষণা ও উন্নয়নে খরচ করা হত তাহলেই বরং সমাজ এর থেকে বেশি উপকৃত হত। তবে রাজনীতির ক্ষেত্রটা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা।

একথাও ঠিক যে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীকরণ হয়ে পড়েছে। ফলে রাজনীতি আর আপন কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে না। তাই আমরা রাজনীতির সুফল থেকেও অনেকটাই বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বের হার বৃদ্ধির সঙ্গে তাঁদের কারও কারও অন্যায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও উপেক্ষা করার মত নয়। ফলে চলমান রাজনীতিতে একটা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগেই। প্রবৃদ্ধির রাজনীতিতে রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য এখন অনেক বেশি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে আমাদের দশম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ৫৯ শতাংশ। সুজনের হিসাবে একাদশ সংসদে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দলে ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরাই অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। 

গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। আর কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া কোথাও এসবের অনুশীলন আশা করা যায় না। মূলত আমাদের গণতন্ত্র কার্যকারিতা হারিয়েছে বেশ আগেই। দেশে সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু থাকলেও তা এখন অনেকটাই অলঙ্কারিক হয়ে পড়েছে। একেবারে ‘সাক্ষী গোপাল’ বললেও অত্যুক্তি হবার কথা নয়। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ধরে রাখা আর বিরোধী দলগুলোর ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতার মধ্যেই রাজনীতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে নিজস্ব শক্তি দিয়ে। আর ক্ষমতাসীনরা দেশে বিরাজনীতিকরণের জন্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার করছে বলে রয়েছে জোরালো অভিযোগ। ফলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর লড়াইটা শুধুই অসম নয় বরং ব্যবধানটাও বিস্তর। যা কোন সভ্য সমাজের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দেশে তো এখন রাজনীতি বলে কিছু নেই বরং সবকিছুই একটা অশুভ বৃত্তের মধ্যে আটকা পড়েছে। সংসদের বাইরের রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিই নির্বিঘেœ পালন করতে পারছে না। বিরোধী রাজনৈতিক দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দেয়ার অভিযোগও আছে। ফলে বিরোধী শক্তিগুলো এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। তাদের হাতপা বেঁধে দিয়ে এখন সাঁতরাতে বলা হচ্ছে। যেহেতু এখন রাজনীতি রাজনীতির কক্ষপথে নেই। তাই বিরোধী রাজনীতির কাছে ‘সামাজিক দায়’ আশা করাটা ‘অরণ্যে-রোদন’ নয় কি ? কারণ, তাদের নির্বিঘেœ রাজনীতি চর্চার সুযোগটাও খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। তারপরও কি থেমে আছে বিরোধী রাজনীতির সামাজিক তৎপরতা ? সীমাহীন বৈরি ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে বিরোধীদের কাছে এর চেয়ে বেশি কী আশা করা যেতে পারে? বিষয়টি নিয়ে তো ভাববার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ