বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ব্রাজিল থেকে যে অভিজ্ঞতা হলো তাদের

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বিশ্ব ফুটবলে অবিসংবাদিত সেরার নাম ব্রাজিল। এ পর্যন্ত পাচঁটি বিশ্বকাপে সেরার মুকুট গলায় পড়েছে। তাদেরকে টেক্কা দেয়ার দল এখনো তৈরি হয়নি। সেই দেশে কেউ যাওয়ার চিন্তা করলে সেটি যে কতটা ফুটবলপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে সেটা বোঝাই যায়। আর একজন খেলোয়াড় যদি সেই দেশে যায় তাহলে সেটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জণ হিসেবেই লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। যেমনটি হয়েছিল বাংলাদেশের চার কিশোর ফুটবলারের। যারা একমাস কাটিয়ে এসেছেন পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদোদের দেশে। ব্রাজিলের আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব ১৭ টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলেছেন ওই চার কিশোর ফুটবলার। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গ্রেভালের যুব দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তাদের দল সোসিয়েদাদ এস্পোর্তিভা দো গামা। ওমর ফারুক মিঠু, যোগেন লাকরা, লতিফুর রহমান নাহিদ ও নাজমুল আকন্দ এবার ব্রাজিলে খেলে দেশে ফিরে আসে। বাংলাদেশের তরুণ ওমর ফারুক মিঠু ৩ ম্যাচে করেছেন ২ গোল। ফাইনালে আবার জয়সূচক গোল করে হয়েছেন ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়। টুর্নামেন্ট শেষ করে দেশে ফিরেছে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর তরুণ মিঠু। ব্রাজিল সরকারের সহায়তায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক মাসের অনুশীলনের জন্য দেশটিতে গিয়েছিলেন চার প্রতিভাবান বাংলাদেশি ফুটবলার। এই চারজন কিশোর ফুটবলার সেদেশের সোসিয়াদে স্পোর্টিভা দা গামা ক্লাবের অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে অনুশীলন করেন। এর মধ্যে দেশটির আঞ্চলিক এক টুর্নামেন্টে সুযোগ পেয়ে ভাল খেলেছেন তারা। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দলকে শিরোপা জিতিয়ে এক মাস অনুশীলনের মিশন শেষ করেন লাল-সবুজের চার প্রতিনিধি। প্রতিযোগিতার সেমি ও ফাইনাল ম্যাচে গোল করে দলকে জিতিয়েছেন বাংলাদেশের ওমর ফারুক মিঠু। চার ম্যাচে নামের পাশে যোগ করেছেন তিন গোল। দুটিতেই হয়েছেন ম্যাচ সেরা। সে কারণে মিঠুই ব্রাজিলের দলের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফাইনালে বোটা ফগো ডি এফের হয়ে মাঠে নেমেই গোল করেছেন এই কিশোর। ম্যাচ শেষে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারও জয় করেছেন দলের ৭ নাম্বার জার্সিধারী এই খেলোয়াড়। শিরোপা নিয়েই মাঠ ছেড়েছেন তারা।
ব্রাজিলে খেলতে যাওয়া কিংবা অনুশীলনের সুবিধা পাওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা কুব বেশি নয় এই পৃথিবীতে। সেই সৌভাগ্য অর্জণ করেছেন বাংলাদেশের চারজন কিশোর। এক মাসের জন্য তারা যাচ্ছেন ফুটবলের দেশে। বলা যায় স্বপ্নপূরণ হয়েছে তাদের। সে কারণে উচ্ছাসটাও একটু বেশি ছির তাদের। ওমর ফারুক মিঠু বলেন, ‘আমার যে লক্ষ্য ছিল সেটি পূরণ হয়েছে বলতে পারেন। তবে এভাবে ব্রাজিল যেতে পারব স্বপ্নেও ভাবিনি। সেখানে অনুশীলন করার পাশাপাশি আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করতে পারব বলেই প্রত্যাশাটা একটু বেশি। ভবিষ্যতে এসব কাজে দেবে বলে বলেই আমি আশা করছি’। চারজনের আরেকজন খেলোয়াড় লতিফুর রহমান নাহিদ বলেন,  যে প্রত্যাশা ছিল তার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। তবে সময়টা যে কিভাবে কেটে গেছে আমি বুঝতেই পারিনি। আর যেভাবেই হোক কিছুটা বিলম্ব হলেও ব্রাজিল যেতে পারছি বলে খুব ভাল লাগছে। এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের খবর। সেখানে গিয়ে যদি বড় কোনও তারকার দেখা পেলে তার কাছ থেকে আরো কিছু শেখার ইচ্ছে রয়েছে’।
এই চারজনের বাছাই প্রক্রিয়া থেকে শুরু সার্বক্ষণিক সঙ্গী কোচ আব্দুর রাজ্জাকও খুশি, ‘খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আমরা যারা কোচ হিসেবে গিয়েছিলাম তারা চেষ্টা করেছি আধুনিক ফুটবলের সাথে পরিচিত হতে। খেলোয়াড়ী জীবনের শুরুতে ব্রাজিল যাওয়াটা বেশ আনন্দের এবং গর্বের। সেখানকার গামা একাডেমিতে গিয়ে তরুণ ফুটলরাররা অনেক কিছু শিখতে পারবে বলেই আশা করছি। দেশের ফুটবলের জন্য এটা নতুন দিক বলতে পারেন তাদের এই সময়টাকে।’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের অধীনে এই চার ফুটবলারের বাছাই প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। ব্রাজিলে চার ফুটবলার এক মাসের অনুশীলন শেষে বাফুফে ফুটবল একাডেমীতে প্রশিক্ষন শুরু করবেন বলে জানা গেছে। আর যে গামা শহরের একাডেমীতে ওমর ফারুক মিটুরা অনুশীলন করবেন সেখানেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত ফুটবলার কাকা। যে একাডেমীতে তারা গিয়েছেন সেখানেই অনুশীলন করেছিলেন সাবেক এই ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার ও রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। যে চারজন ফুটবলার ব্রাজিলে গিয়েছেন তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানিয়েছে বাফুফে। সেখানেই উপস্থিত হয়েছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, ব্রাজিল রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা অলিভেরিয়া জুনিয়র, বাফুফের সভাপতি কাজি সালাহউদ্দিন, ফিফার সদস্য ও বাফুফে মহিলা উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক এম জে এইচ জাবেদ, মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. জাফর উদ্দিন, ক্রীড়া অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোচ আব্দুর রাজ্জাক, কর্মকর্তা খন্দকার রকিবুল ইসলাম রকিব গিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় গোল্ডকাপ (অনূর্ধ্ব-১৭) ফুটবলে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৮৫টি দলে ১ লাখ ১০ হাজার কিশোর ফুটবলার অংশ নেয়। সেখান থেকে ৪২ জনকে বাছাই করে বিকেএসপিতে তিন মাস প্রশিক্ষণ দিয়ে চারজনকে চূড়ান্ত করে ব্রাজিল পাঠানো হচ্ছে। বিমানভাড়া এবং প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৬৫ হাজার টাকা হাত খরচের জন্য দিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ব্রাজিলের সাথে বাংলাদেশের ব্যসায়িক সম্পর্ক থাকলেও খেলাধুলা নিয়ে সম্পর্কটাকে খুব ভাল বলা যাবেনা। এবার নতুন এক সম্পর্কের সাথে নিজেদের জড়িয়েছে হাজার মাইল দূরের দেশ দুটি। এবার নতুন এক সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে ব্রাজিল ও বাংলাদেশ। সেখানে চারজন কিশোর একমাসের অনুশীলনের জন্য গিয়েছেন। এ বিষয়ে বাফুফে সভাপতি কাজি সালাউদ্দিন বলেন, ’ব্রাজিলের ফুটবল এখনো বিশ্বের সেরা। আর এই দেশের সহায়তা পেলে আমরা অনেকদুর এগিয়ে যেতে পারব। আমি তো মনে করি নতুন যাত্রা শুরু হলো। এ বছর চারজন যাওয়ার পর ব্রাজিলের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবল সম্পর্ক উন্নয়ন হলো। আগামীতে সংখ্যাটা বাড়বে বলেই আমি প্রত্যাশা করছি’। দেশের ঘরোয়া লিগ নিয়মিত হওয়ায় ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে ফুটবলের। নতুনদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামীতে এ প্রক্রিয়া আরও বড় হবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যাতে ব্রাজিলও সম্মতি দিয়েছে। এদিকে আগামী বছর নারী ফুটবলার পাঠানো যায় কি না, পরিকল্পনা চলছে তা নিয়েও। গত ৪ মাস ধরে চার ফুটবলার স্বপ্ন দেখছেন ব্রাজিল যাওয়ার। তাদের স্বপ্ন এবার পূরণ হয়েছে। ব্রাজিলে প্রশিক্ষনে যাওয়া ফুটবলাররা ক্রিকেট বিশ্¦কাপের মধ্যেও ছিলেন আলোচনায়। এক মাসের প্রশিক্ষণে ফুটবলের দেশটিতে গিয়েছেন রংপুর পীরগঞ্জের নাজমুল হোসাইন আকন্দ ও গঙ্গাচড়ার লতিফুর রহমান নাহিদ, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর ওমর ফারুক মিঠু রাজশাহীর গোদাগাড়ীর জগেন লারকা।
জগেন ক্লিয়ার মেন স্কুল ফুটবল এ রাজশাহীর সোনাদিঘি স্কুলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন চলতি বছর। ৯ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া এই শিক্ষার্থী। রাজশাহী বিভাগের হয়ে ডেভেলপমেন্ট কাপ ফুটবলেও আলো ছড়িয়েছেন। যদিও তার দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, তবে কোচরা ঠিকই জহুরী চিনতে ভুল করেননি। লতিফুর রহমান নাহিদ রংপুর জেলার বাসিন্দা হয়ে টানা দুইটি ডেভেলপমেন্ট কাপ ফুটবলে নিজেকে চিনিয়েছেন। যদিও বয়সভিত্তিক দলের ক্যাম্পে একবারও ডাক পাননি, তবে ব্রাজিল যেতে পারছেন। কুড়িগ্রাম জেলার ওমর ফারুক মিঠু। নিজ বিভাগ রংপুরকে ডেভেলপমেন্ট কাপ ফুটবলে একবার করে চ্যাম্পিয়ন ও একবার রানার্সআপ করিয়েছেন মিঠু। এর আগে ২০১৬ সালে পাইওনিয়ার লিগে দারুণ খেলেছেন। আরামবাগ একাডেমির জার্সি গায়ে ১৬ গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গোলদাতা পুরস্কারও জিতেছিলেন মিঠু। গত বছর অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পেলেও চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি তার। পাশাপাশি চলতি বছর বাফুফে অনূর্ধ্ব-১৮ ক্লাব ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন আবাহনী দলেও ছিলেন। রংপুরের আরেক খেলোয়াড় নাজমুল আখন্দ। ব্রাজিলে বিমানে চাপা একমাত্র ডিফেন্ডার। অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবলে আবাহনীর চ্যাম্পিয়ন দলের এই সদস্য সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলে থাকেন। বয়সভিত্তিক সেই টুর্নামেন্টে ভাল খেলে আবাহনী মূল দলের সঙ্গে অনুশীলন করার সুযোগ হয়েছে। গত বছর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বে কাতারকে হারানো সেই ঐতিহাসিক দলেরও সদস্য তিনি। সবমিলিয়ে এবারের ব্রাজিল যাত্রাটা সুন্দর হওয়ার প্রত্যশাই করছেন তারা। সেটা যে হয়েছে এটা বলা যায় নির্ধিধায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ