বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নেতৃত্ব ইস্যুতে পাকিস্তান ক্রিকেটের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়া ঘোলাটে হচ্ছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাজে পারফরমেন্সের পরপরই পাকিস্তান ক্রিকেটকে বদলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ইমরান খান। সেই ঘোষণার কার্যকারীতা এখনো তেমন দৃশ্যপটে না আসলেও ভেতরে ভেতরে চলছে দল গোছানোর কাজ। একইসাথে বিশ্বকাপে কেন ব্যর্থতা সেটি নিয়েও চলছে চূলছেরা বিশ্লেষণ। কেউকেউ বলছেন, অধিনায়কের কারণেই কয়েকটি ম্যাচেবাজে খেলেছে পাকিস্তান। দলের এমন অবস্থায় অনেকেই পাকিস্তান ক্রিকেটকে সহায়তা দিতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সব মিলিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেটের আভ্যন্তরীণ আবহাওয়াটা ক্রমশ: ঘোলাটে হচ্ছে বলেই মনে হয়।
বিশ্বকাপে বাজে শুরুর পরও দারুণ কিছু জয়ে শেষ দিকে সেমিফাইনালের রেসে ফিরেছিল পাকিস্তান। একটুর জন্য সেটি হয়ে ওঠেনি। শেষ করে পঞ্চম স্থানে থেকে। ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন প্রধান নির্বাচক ইনজামাম উল হক। তবে কেউকেউ বলছে, প্রধান কোচের দায়িত্ব নিতেই নাকি তিনি পদত্যাগ করেছেন। এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেনি ইনজামাম। এর থেকে অনেকেই বলছেন, হয়ত সামনে থেকে পাকিস্তান ক্রিকেটকে বদলে দেয়ার কাজ করতে চান বলেই তিনি নিরবতা পালন করছেন।
অনেকে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরফরাজ আহমেদকে সরিয়ে দেয়ার দাবি তুললেও এ নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কোন মন্তব্য করেনি। তবে তার নেতৃত্বের ফরমেট ছোট হতে পারে বলে শোনা গিয়েছিল। এবার খোদ কোচ মিকি আর্থারও বললেন, নেতৃত্ব থেকে সরফরাজকে সারিয়ে দেয়া উচিত। পাশাপাশি পিসিবি চাইলে দলটির সঙ্গে আরও দুই বছর কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। তিন বছরের পারফর্মেন্স মূল্যায়ন করেছে বোর্ডের ক্রিকেট কমিটি। সেখানে আর্থারের এমন বক্তব্য পাকিস্তান ক্রিকেটের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়াটা আরও ঘোলাটে হলো। তিনি কিছুতেই চাইছেন না, ভবিষ্যতে আর অধিনায়ক থাকুন সরফরাজ! আর্থার দলের পারফর্মেন্সে চোখে পড়ার মতো উন্নতির জন্য দেশটির ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কমিটির কাছে আরও দুই বছর সময় চেয়েছেন। সেই সঙ্গে ওয়ানডে ও টেস্টে অধিনায়কের পদটিতে পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। আর্থার টেস্টে সরফরাজের জায়গাতে অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাবর আজমকে। আর ওডিআইতে শাদাব খানকে ক্যাপ্টেন বানানোর দাবি জানান। সূত্রের দাবি- ‘সরফরাজের নেতৃত্বগুণ নিয়ে কমিটির সদস্যদের কাছে নেতিবাচক কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন আর্থার।’ আর নিজেকে নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তান দলের সঙ্গে আমি আরও দুই বছর থাকতে চাই, তবেই আমি চোখে পড়ার মতো উন্নতি দেখাতে পারব।’ পিসিবির এই কমিটির প্রধান ম্যানেজিং ডিরেক্টর ওয়াসিম খান। কমিটি আরেকবার বসে আলোচনা করেই নির্ধারণ করবেন ভবিষ্যত নেতৃত্ব। সুপারিশগুলো পাঠাবেন বোর্ড প্রধান এহসান মানির কাছে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি সরফরাজ। তখনই তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সরফরাজের নেতৃত্বে পাকিস্তান ওয়ানডে এবং টি২০তে তুলনামূলক ভাল ফলাফল করলেও তাকে বাদ দিয়ে নতুন অধিনায়কের নাম আসবে এটা মোটামুটি অনুমেয়। আর্থার দিলেন নতুন অধিনায়কের নাম সরফরাজের জায়গাতে তরুণ একজনকে দায়িত্ব দেয়াকে সঠিক মনে করেন আর্থার। ২০ বছর বয়সে শাদাব খানের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অভিষেক হয় ২০১৭ সালে। এরপর এখন পর্যন্ত ৪১ ওয়ানডে ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৩৭ রান। এই অলরাউন্ডার বল হাতেও সফল; শিকার করেছেন ৫৬ উইকেট। তবে ২০১৫ থেকে এখন পর্যন্ত সরফরাজের অধীনে ৪৮ ম্যাচ খেলে পাকিস্তান জিতেছে ২৬টি; ২০টি ম্যাচে হেরেছে এবং ২টি ম্যাচে ফল হয়নি। তার অধীনে জয়ের গড় ৫৬.৫২। মিকি আর্থার ২০১৬ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। ইংল্যান্ডে ২০১৭ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতান তিনি। এরই মধ্যে পাকিস্তান ক্রিকেটে নতুন শুরুর কথা জানা গেছে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে মোহাম্মদ আমির এবং ওয়াহাব রিয়াজ অবসর নিয়েছেন। মোহাম্মদ হাফিজ এবং শোয়েব মালিক কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকছেন না বলে খবর। ওদিকে মিকি আর্থার আবার ইংল্যান্ডের কোচ হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে!
ইনজামাম-উল-হক পদত্যাগের পর পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচকের পদটি খালি হয়ে গেছে। এবার জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির কিংবদন্তি পেসার শোয়েব আকতার। দায়িত্ব পেলে পাক ক্রিকেটের উন্নয়নে কি কি পদক্ষেপ নেবেন তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। ৪৩ বছর বয়সী শোয়েব বলেন, ‘আমাকে যদি প্রধান নির্বাচক হিসেবে নির্বাচিত করা হয় তাহলে প্রতিভা খুঁজে বের করব। তিন বছর মেয়াদে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে প্রচুর বিনিয়োগ করা হবে। কিশোর-তরুণদের একাডেমি ও ক্যাম্পে অনুশীলনের সুযোগ করে দেয়া হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘খেলোয়াড়দের মেন্টর হিসেবে কাজ করে তাদের উন্নয়নে সুপরামর্শ দেয়ার চেষ্টা থাকবে আমার। দল নির্বাচনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা হবে ন।’ সুযোগ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি নিয়মনীতির ব্যাপারে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে চান সর্বকালের অন্যতম দ্রুতগতির এ বোলার। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সব লীগে খেলতে দেয়া হবে না। শুধু দুটি লীগ খেলতে পারবে তারা।’ রাওয়ালপিন্ডিখ্যাত সাবেক তারকা পেসার অবশ্য প্রায়শ পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সমালোচনা করে থাকেন। এ জন্য বোর্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল নয়। দেশটির ক্রিকেটের যে কোন নেতিবাচক বিষয়ের কঠোর সমালোচক তিনি। বিশ্বকাপে অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদের সমালোচনা করা শোয়েব সম্প্রতি মাত্র ২৭ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়া তারকা পেসার মোহাম্মদ আমিরকেও ধুয়ে দিয়েছেন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে মোহাম্মদ আমিরের টেস্ট থেকে অবসর নেয়াকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ক্রিকেটে যখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তারই মাঝে এলো এমন খবর। এবার টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানাচ্ছেন আরেক তারকা বাঁহাতি পেসার ওয়াহাব রিয়াজ। কানাডায় চলমান গ্লোবাল টি২০ লীগ খেলা ওয়াহাব দেশে ফিরেই চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) বিশ্বস্ত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দুনিয়া নিউজ এমন খবর জানিয়েছে। উল্লেখ্য, আমিরের মতো ওয়াহাবও শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ দলে ডাক পেয়ে চমৎকার নৈপুণ্যে দেখিয়েছিলেন। ক’দিন আগে আমির যখন হুট করে টেস্ট ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তখন গ্রেট ওয়াসিম আকরাম, শোয়েব আকতারসহ অনেকেই বলেছিলেন, এটি পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য অশনি সঙ্কেত। যা অন্যদের ওপর বাজে প্রভাব তৈরি করবে। ক্ষুব্ধ শোয়েব সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমিরের অবসরের পর আমরা হয়ত হাসান আলি, ওয়াহাব রিয়াজ, জুনায়েদ খানদেরও একই পথে হাঁটতে দেখব।’ সেই শঙ্কাই যেন সত্য হতে যাচ্ছে। আমিরের পর টেস্ট থেকে অবসরের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন ওয়াহাব। পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দুনিয়া নিউজ’-এ এসেছে এমন খবর। ওয়াহাব নাকি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (পিসিবি) নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েও দিয়েছেন। কানাডায় গ্লোবাল টি২০ লীগ থেকে ফিরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন ৩৪ বছর বয়সী এই পেসার।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়া মোহাম্মদ আমিরের সমালোচনা করেছেন ওয়াসিম আকরামসহ অনেক সাবেক তারকা। তবে ভিন্ন কথা বললেন খোদ পাকিস্তান কোচ মিকি আর্থার। তিনি জানিয়েছেন, আমিরকে আসলে টেস্ট ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। তবে সেটি প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষভাবে। পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা একজন পেস বোলারকে দল যখন প্রতিটি ভার্সনে (টেস্ট-ওয়ানডে-টি২০), প্রতিটি সিরিজে চায় তখন তারপক্ষে সেটা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। কম বয়সের ভুলে ওই পাঁচটা বছর হারিয়ে না গেলে আমির পাকিস্তানের কিংবদন্তি বোলারদের কাতারে জায়গা করে নিতেন বলেও অভিমত তার ‘পাঁচ বছরের সাজার আগে ও পরের আমিরকে এক করা মোটেও ঠিক হবে না। কারণ সে যদি পাঁচ বছর হারিয়ে না ফেলতো তাহলে আমার মতে পাকিস্তানের সেরাদের সেরার কাতারে চলে যেত। আর্থারের মতে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আমিরকে বেশিই চাপ দিয়েছে বিধায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বাঁহাতি এ পেসার। ফিক্সিংয়ের কারণে পাঁচ বছর নষ্ট হয় আমিরের। এরপর জাতীয় দলে ফিরতেই তাকে প্রায় সব সিরিজেই দলের সব চাপ নিয়ে খেলতে বাধ্য করে বোর্ড।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ