সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অব্যাহত দরপতনে নীরবে পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

* বাজার থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শেয়ারবাজারের পতন শুরু হয়েছে। গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দরপতনের মধ্যে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। অবশ্য এ সময়ের মধ্যে দামি কিছু শেয়ারের দাম বেড়েছে। তবে বাজার মূলধনে বড় অবদান রাখা কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচকের গড় পতন খুব একটা বড় মনে হয়নি। কিন্তু কম দামের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। অব্যাহত দরপতনে অনেকটা নীরবে পুঁজি হারিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। জুলাইয়ের শেষ দিকে দেশের শেয়ারবাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিলেও তা স্থায়ী হয়নি। বরং ঘুরে ফিরে দরপতনের বৃত্তেই আটকে রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে কিছুটা আশার আলো দেখলেও বিনিয়োগকারীরা আবার হতাশ। প্রতিনিয়ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি লুটে নেয়ার নতুন নতুন ফন্দি করা হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ চলছেই। তারা আক্ষেপ করে বলছেন, আমাদের চোখের পানিই সরকারের ঈদ উপহার।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বাজারে কারসাজি চক্র সক্রিয়। কারসাজির মাধ্যমে একটি চক্র বাজার থেকে মুনাফা লুটে নিচ্ছে। অন্যদিকে লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী প্রতিনিয়ত পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। কিন্তু দায়িত্বশীলরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষায় কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
কিছু কিছু বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১০ সালের থেকেও ভয়াবহ বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে ২০১০ সালে যে মহাধস নামে তা সবাই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। সে সময় একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতনের সঙ্গে সূচকের বড় পতন হয়েছিল। এতে নিঃস্ব হন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। সাম্প্রতিক সময়েও তালিকাভুক্ত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। এতে একটু একটু করে পুঁজি হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ সংখ্যাও কম নয়, লাখের অধিক। কিন্তু সূচকের বড় পতন হয়নি।
আহসান হাবিব নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, সবাই ২০১০ সালের ধসকে মহাধস বলেন। কিন্তু এখন যে নীরব ধস চলছে তা মনে হচ্ছে কেউ দেখছেন না। গত ছয় মাসে আমার পুঁজি অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১০ সালের থেকে এটা কোনো অংশেই কম নয়। শুধু আমার নয়, অল্প অল্প করে বাজারের সিংহভাগ বিনিয়োগকারীর পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
অব্যাহত দরপতনের মধ্যে গত ২২ জুন প্রণোদনা স্কিমের ৮৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ছাড়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দেয় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সেই সঙ্গে সংবাদ আসে নির্ধারিত সীমার নিচে বিনিয়োগ থাকা ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে ধুঁকতে থাকা শেয়ারবাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। এতে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন পুঁজিহারা বিনিয়োগকারীরা।
কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ সাময়িক দেখা দেয়া ঊর্ধ্বমুখিতা স্থায়ী না হয়ে সপ্তাহ ঘুরতেই আবার পতনের মধ্যে পড়ে। একদিন কিছুটা উত্থান তো পরের দিনই মহাপতনের ঘটনা ঘটতে থাকে শেয়ারবাজারে। এ পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার বাজারে সূচকের কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। তবে সোমবার আবার সবকটি সূচকের পতন হয়েছে। এতে ফের হতাশ হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।
পতনের কবলে পড়ে গতকাল সোমবার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা মূলধন হারিয়েছে ডিএসই। এদিন লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। যা আগের কার্যদিবসে ছিল ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ একদিনে ডিএসইর মূলধন হওয়া হয়ে গেছে ১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, একদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ভোটের পর প্রায় এক মাস ঊর্ধ্বমুখী ছিল বাজার। সে সময় তালিভুক্ত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়ে। ফলে এক মাসের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ৭০০ পয়েন্টেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ২৭ জানুয়ারি থেকে হঠাৎ করে বাজারের ছন্দপতন ঘটে। সেই থেকে টানা দরপতন দেখা দেয় শেয়ারবাজারে।
তবে সূচকের পতন যতটা হয়েছে বাজারের ক্ষতি এর চেয়েও বহুগুণ বেশি হয়েছে। কারণ দরপতনের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে দেখা দিয়েছে চরম তারল্য সংকট। ফলে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া ডিএসইর গড় লেনদেন নেমে এসেছে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে। তালিকাভুক্ত ৩৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০০টিরই দাম কমেছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশের ওপরে দাম কমেছে ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে।
সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের মধ্যে ৪৮টির শেয়ারের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি দাম বেড়েছে ২৪টির। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, রেকিট বেনকিজার, বার্জার পেইন্টস, মুন্নুজুট স্টাফলার্স, ইষ্টার্ণ লুব্রিকেন্ট, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, মেরিকো ও গ্রামীণফোনের মতো দামি ও বড় বাজার মূলধনের প্রতিষ্ঠান।
বিনিয়োগকারী আরিফুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন পরেই কোরবানির ঈদ। চলতি সপ্তাহের পর ঈদের আগে আর লেনদেন হবে না। ঈদের খরচ জন্য কোনো শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করলেই দাম কমে যাচ্ছে। এ এক ভয়ানক পরিস্থিতি। লোকসান দিয়ে কিছু শেয়ার বিক্রি করেছি। সামনে কি অপেক্ষা করছে বুঝতে পারছি না। বাজারের এ অবস্থা চলমান থাকলে পথে বসতে হবে। পরিবার পরিজন নিয়ে কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমাদের চোখের পানিই সরকারের ঈদ উপহার।
এদিকে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬০ পয়েন্টে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮৯ পয়েন্টে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮২৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সব সূচকের পতনের পাশাপাশি এদিন ডিএসইতে যে কয়টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, কমেছে তার থেকে বেশি। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৩০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে ১৮৩টির। আর ৪০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সূচকের পতন হলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। দিনভর বাজারটিতে ৪৭৭ কোটি ৩৬ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৪৬৩ কোটি ৮৫ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন বেড়েছে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
আরেক বিনিয়োগকারী কামরুল হাসান বলেন, শেয়ারবাজারে কয়েকমাস ধরেই ভয়াবহ দরপতন চলছে। প্রতিনিয়ত আমরা পুঁজি হারাচ্ছি। জুলাইয়ের শেষের দিকে বাজার একটু ঊর্ধ্বমুখিতার আভাস দিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবই আই ওয়াশ। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি লুটে নেয়ার নতুন নতুন ফন্দি করা হচ্ছে। বাজারের এ আচরণ আমাদের প্রতিদিন হতাশ করছে। পুঁজিবাজার থেকে বের হয়ে যাব সে উপায়ও নেই। বিনিয়োগ করা অর্থের অর্ধেকেও ঠিক নেই।
শেয়ারের নীরব দরপতনে বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারেজ হাউজ মালিকদের আতঙ্কের ভয়াবহতা বুঝতে পেওে গত এপ্রিল মাসে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে ডিএসই। অবশ্য ডিএসইর ওই বৈঠকের আগেই ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য প্লেসমেন্ট বাণিজ্যকে দায়ী করেন।
এদিকে, নীরবে পুঁজি হারানোর কারণে বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বলছে, বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাজারে উত্থান-পতন হয়েছে, কিন্তু অস্থিতিশীল হয়নি। আমরা সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল পর্যায়ে এনেছি।
এর আগে, দেশের পুঁজিবাজারে ভয়বহ ধসের ঘটনা ঘটে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে। সেই সময়ও ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ওই মহাধসের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করা হয়। ফলে বর্তমনে সরকার খুবই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কথায়ও তেমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা কনফারেন্সে বিনিয়োগকারীদের তার ও সরকারের ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাজারের ইনডেক্স (সূচক) কত হবে তা আমি বলব না। ইনডেক্স ঠিক করে দেবে অর্থনীতি। অর্থনীতি যত বড় হবে, পুঁজিবাজারের সূচকও ততটা বাড়বে। পুঁজিবাজারকে পেছনে রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় না। আপনারা আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন, ঠকবেন না। আমরা সবাই লাভবান হব। আমরা নিজেরা বিজয়ী হব, সরকারকে বিজয়ী করব। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আজও পর্যন্ত কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
এ ব্যাপারে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর পেছনে কারা রয়েছে তা সবাই জানে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাও জানে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। বিএসইসি মাঝেমধ্যে লোক দেখানো জরিমানা করে। এভাবে কারসাজি বন্ধ করা যায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ভূমিকার কারণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, আমরা পুঁজি হারিয়ে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছি। পুরাতন চক্র বাজারে সক্রিয় হয়ে বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করছে। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান দিয়ে এই পুঁজিবাজার আর ভালো করা যাবে না। কারণ এই চেয়ারম্যান বিনিয়োগকারীদের পক্ষে কাজ না করে ইস্যুয়ারের (কোম্পানির) পক্ষে দালালি করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ