সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মুসলিম শাসনের ন্যায়বিচার

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
অভিযোক্ত লোকটির ফিরে আসার সময় এক সপ্তাহ ছিল। সময় ও স্রোত কাহারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময় দ্রুত ফুরিয়ে গেল। বাদশাহর দরবারের সকলেই লোকটি পথ চেয়ে অধীর আগ্রহে বসে আসে। লোকটির নির্ধারতি সময় প্রায় শেষ। তবু কেন আসছে না এই ভেবে রাজ দরবারের সবার চোখে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। দরবারের লোকজন বলাবলি শুরু করছে খাচার পাখী একবার ছুটে গেলে দ্বিতীয়বার আর খাচায় ফিরে আসে না। একবার যে মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণে বেঁচে গেছে সে আর ধরা দেবে না। কারণ মানুষ যতই ভালো আর বড়ই হোক না কেন বেঁচে থাকার আকুতি সবারই থাকে। 
বাদশাহ একটু বিচলিত হয়ে পড়লেন। এই ভেবে যে নিজের হাতে আপন ভাইয়ের মৃত্যুদন্ড দিতে হবে। কিন্তু বাদশাহর ভাইয়ের মধ্যে কোন অনুতাপের ছাপ দেখা গেল না। হাকিমের হুকুম পাওয়ার পরই জল্লাদ মৃত্যু নিশ্চিত করবে, এমনটি ভেবে সে প্রহর গুণছে। সর্বত্র পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। সবারই মুখে কালোছাপ বিরাজ করছে। ঠিক এমন সময় একটি আওয়াজের শব্দ পিনপতন নীরবতা দূরীভূত হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন। দারোয়ার চিৎকার মেরে বলে উঠল হুজুর অভিযুক্ত লোকটি ফিরে এসেছে। উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে গেল। কারণ যেখানে মানুষ মৃত্যু থেকে পালানোর হাজারো প্রচেষ্টা করে সেখানে মৃত্যু পথের যাত্রী নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফিরে এসেছে তা সত্যিই এক বিষ্ময়কর ব্যাপার! অভিযুক্ত লোকটি বলল হুজুর আমি যথাসময়েই আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু সমস্যা বাধিঁয়েছে আমার স্বজনেরা। তারা কিছুতেই আমাকে আসতে দিচ্ছিল না। কিন্তু আমি তাদেরকে বুঝিয়ে আসতে একটু দেরী হয়ে গেল। হুজুর অনিচ্ছাকৃত দেরী হওয়ার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমার উপর নির্ধারিত শাস্তি আপনি প্রয়োগ করতে পারেন। আমি প্রস্তুত।
এবার বাদশাহর ভাই সভাসদের সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন সম্মানিত উপস্থিতি! আমি যখন লোকটির জিম্মাদার হয়েছিলাম তখন আমারও বিশ্বাস ছিল না অপরাধী ফিরে আসবে। কিন্তু যখন সে বিপদে পড়ে সাহায্য চেয়েছিল তখন আমার মনের গহীনে সহানুভূতির যে ঢেউ লেগেছিল তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কিন্তু সে তার অঙ্গীকার রক্ষা করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। যা শিল্পির তুলিতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল। তাঁর এই বিরল ওয়াদারক্ষা করার ঘটনা দেখে দুই ভাইও মুগ্ধ হয়ে গেল। তারা একে অন্যের নিকট বলাবলি করতে লাগল যে, আমাদের পিতাকে তো আর ফিরে পাব না। তাহলে কেন আমরা সহানুভূতির হাতকে প্রশারিত করতে পিছিয়ে থাকবো। বাদশাহকে ঐ দুই ভাই বলল হুজুর আমরা এই ভদ্র লোকটিকে ক্ষমা করে দিলাম। তাকে ছেড়ে দেয়া হোক। কারণ তার মতো ওয়াদারক্ষাকারী মানুষের রাষ্ট্রের প্রয়োজন আছে। বাদশাহ তো রীতিমত অবাক। একি কান্ড! মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়ে আবার নিজেকে সপে দিচ্ছে মৃত্যুর হাতে। তা কি আমাদের এই যামানায় ভাবা যায়! অন্যদিকে আরেকজন ক্ষমা করে দিচ্ছেন নিজের প্রিয় পিতার হত্যাকারীকে। কারণ হত্যাকারী ওয়াদা রক্ষা করার যে বিরল দৃষ্টান্ত পেশ করেছে তা সত্যিই বিরল। বাদশাহ নুমান অবশেষে আফসুস করে বলে উঠলেন চরিত্রের প্রতিযোগিতায় তোমরা আমাকে পরাজিত করে দিয়েছ। আমি তোমাদের সাথে  প্রতিযোগীতা করতে পারব না। কিন্তু শরীক হতে পারব। তবে আমি এই মহান বন্দিকে ক্ষমা করে দিলাম। এবং আমার পক্ষ থেকে বন্দিকে দশ হাজার দিরহাম উপহার দিলাম। যেন পরিবার পরিজন নিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। মহান আরশের অধিপতির নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে এমন শাসকের আবির্ভাব ঘটিয়ে দেন যেন মানুষ  জুলুম থেকে মুক্তি পায়।
সুলতান সালাহ উদ্দীনের ন্যায়বিচার
একটা  সময় আমাদের মায়েরা ইসলামের সোনালী দিনের ইতিহাস বলে বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়াতো। এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। এখন কাটুন আর হিন্দি গানের আওয়াজে বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। সুলতান সালাহ উদ্দীন আইউবী একটি নাম একটি জীবন্ত ইতিহাস। গাজী সুলতান সালাহ উদ্দীন আইউবী ন্যায়বিচারের অগ্রপথিক ছিলেন। তার সময়ের একটি ঘটনা। একদিন সুলতানের এক সৈনিক একজন মহিলার শিশু সন্তানকে চুরি করে নিয়ে যান। শিশুটি মহিলার একমাত্র আদরের সন্তান ছিল। সন্তান হারানোর বেদনা কত নির্মম কত নিষ্ঠুর তা ভূক্তভোগী মা ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না। কলিজার টুকরা সন্তানকে হারিয়ে মা প্রায় পাগলের মতো এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছেন। কিন্তু সন্তানটিকে কোথাও খুঁজে পেলেন না। নিরূপায় হয়ে মহিলা ভাবলেন যে তার সন্তানকে সে আর খুঁজে পাবে না। কারণ সে ইসলামের শত্রুপক্ষের লোক। আর এখন চলছে মুসলিম শাসকের রাজত্বকাল। মুসলমানেরা কী তার শত্রুুপক্ষের সন্তানকে ফিরিয়ে দেবে। তবু মহিলা কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। কলিজার টুকরা সন্তানকে পাবার আশায় আবারো কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো কূল কিনারা পাচ্ছেন না। হঠাৎ এলাকার এক সর্দারের নিকট গেল। সন্তান চুরি হওয়ার সব ঘটনা খুলে সর্দারের নিকট বললেন। ঘটনাটি শুনে সর্দার বললেন তুমি সুলতান সালাহ উদ্দীন আইউবীর কাছে যাও। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রপ্রধান। তার কাছে অভিযোগ করা গেলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আমার বিশ্বাস তিনি তোমার কথা শুনবেন এবং উত্তম ফায়সালা দিবেন।
সুলতান সালাহ উদ্দীন তোমার শত্রুপক্ষের লোক বলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সর্দারের কথায় মহিলা একটু সাহস পেল। বুক ভরা আশা নিয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হয়ে মহিলা কান্নাজড়িত কন্ঠে শিশু সন্তান চুরি হওয়ার সব ঘটনা খুলে বললেন। মহিলার কান্না দেখে সুলতানের দরবারের সবার চোখে পানি এসে গেল। সুলতানের অন্তরেও সন্তান হারানোর বেদনা স্পর্শ করেছে। তিনি রাগে থর থর করে কাঁপতে লাগলেন। হুংকার দিয়ে বললেন আমার রাজ্যে এত বড় অন্যায় কাজ করবে এমন হিম্মত কার? তুমি শান্ত থাক মা। আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। এই বলে সুলতান নিজের গোয়েন্দা বাহিনীকে সন্তান খুঁজে বের করার জন্য বললেন। শিশু সন্তানটিকে এক সৈনিকের তাঁবুতে পাওয়া গেল। তারপর দোষী সৈনিককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হল। আর শিশু সন্তানটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়া হলো। মা তার সন্তানকে কাছে পেয়ে যেন সাত রাজার ধন পেলেন। ভুলে গেলেন সব ব্যাথা বেদনা। আর সুলতান সালাহ উদ্দীন আইউবীর জন্য হৃদয় উজাড় করে দোওয়া করলেন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যেন সালাহ উদ্দীন আইউবীর মতো ন্যায়পরাণ সুলতানের জন্ম হয়।
উপসংহার : বিশ^ব্যাপী বিচার বিভাগের উপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তলানীতে। ন্যায়বিচার পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। যারাই ক্ষমতায় থাকেন তাদের ইশারায় চলে আদালত । অথচ ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি ছিল বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা। আমরা যদি ইসলামের সোনালী দিনের বিচার ব্যবস্থা দেখি তাহলে দেখতে পাব যে খেলাফতের রাশেদায় খলিফাগণ বিচারপতিদের নিয়োগ করলেও তাদের উপর কোন চাপ কিংবা প্রভাব খাটাতেন না। আর বিচারপতিগণও খলিফাদের দ্বারা মনোনীত হলেও নিজেদের জ্ঞান ও বিবেক ব্যতীত উপর মহলের আদেশে কোনো রায় প্রদান করতে না। নির্দোষ মানুষকে ফাঁসি দেয়া তো দূরের কথা এক দিনের জেলবাসও অন্যায়ভাবে কাউকে দেওয়া হতো না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারাই থাকতেন তারা কেউ আদালতের কাজের উপর হস্তক্ষেপ করার সাহস করতে না। এমনকি বিচারপতি স্বয়ং বাদশাহ বা রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে রায় দিতে পারতেন এবং দিতেন। কিন্তু আজকের যুগে  রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেছেন এমন বিচারপতি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।তৎকালীন সময়ে সত্যাশ্রয়ী আলেমদেরকে বিচারকের আসন গ্রহণে রাজী করানো যেত না। তবে যেসব আলেম শাসকের পক্ষ থেকে বিচারকের আসন গ্রহণ করতে রাজী হতেন তাদেরকে জনগণ সন্দেহের চোখে দেখতো। কিন্তু এসব ইতিহাস আজ যেন বর্ষার বাদলে ডুবে গেছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার দুরূহ ব্যাপার হয়ে গেছে। বিশ্বে মুসলিম সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। কিন্তু যারা তাদের পরিচালনায় নিয়োজিত তারা ইসলামী ইনসাফ থেকে বহুদূরে অবস্থান করছেন।একজন ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে‘ আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন।’(সূরা আন নাহল-৯০)‘তোমরা সুবিচার কায়েম করো। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (হুজরাত-৯)
বিশ্বের সকল শাসকেরা যদি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ও রাসূল (সা:) এর সুন্নাতের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতো তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্যায় অবিচার চিরদিনের জন্য দূরীভূত হয়ে যেত। মানুষের জীবন ও যৌবন যেমন চিরস্থায়ী নয় তেমনি ক্ষমতার দাপট ও চিরস্থায়ী নয়। কারণ ক্ষমতার  দম্ভ চিরঞ্জীব নয়। প্রতিটি জুলুম ও নির্যাতনের হিসাব মালিকের আদালতে দিতে হবে। যেমন কুরআনের সূরা যিলযালের ৭ ও ৮ আয়াতে বলা হয়েছে,যে ব্যক্তি এক অণু পরিমাণ কোনো ভালো কাজ করবে (সেদিন) তাও সে দেখতে পাবে; ঠিক তেমনি কোনো মানুষ যদি অণু পরিমাণ খারাপ কাজও করে তাও (সেদিন) সে দেখতে পাবে। দুনিয়ার আদালতে মিথ্যার বিজয় হলেও পরকালের আদালতে মিথ্যার পরাজয় সুনিশ্চিত। সে পরাজয়ের গ্লানি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো সুপার পাওয়ায়ের নেই। সুতরাং মহান আরশের মালিকের নির্দেশ ও রাসূল (সা:)এর সুন্নাতের আলোকে জনগণের মাঝে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা সকল রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব। রাসূল (সা.) ভবিষ্যৎ বাণী হল, খেলাফতের পর রাজতন্ত্র,তারপর আসবে জুলুমতন্ত্র যা বিশ্বব্যাপী এখন বিরাজমান। তারপর আবার একদিন নবুয়তের পদ্ধতিতে খিলাফতই ফিরে আসবে। ইমাম হোসাইন এই খিলাফত রক্ষার জন্যই প্রাণ দিয়েছিলেন। তার শিক্ষা অনুসরণ করা এবং মানুষে মানুষে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠাই হোক আজকের শিক্ষা। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ