সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বিশ্বমানবতার বিপ্লবী নেতা হজরত ইবরাহীম (আ.)

মনসুর আহমদ : বিশ্বের বর্তমান ধর্মগুলির মধ্যে ওহী ভিত্তিক প্রমাণিত ধর্ম ইহুদী খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের আদি পুরুষ হজরত ইবরাহীম (আ.)। যতটুকু জানা যায় হজরত নূহ (আ.)-এর পরে হজরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন প্রথম নবী, যাকে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের বিশ্বজনীন দাওয়াত প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর বংশধর থেকে দুইটি শাখা সৃষ্টি হয়। একটি হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর নিয়ে, যারা আরবে প্রতিষ্ঠিত হন। এ বংশেই জন্ম গ্রহণ করেন শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ (স.)। দ্বিতীয় শাখা হজরত ইসহাক (আ.)- এর বংশধর। এ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত ইউসূফ (আ.), মুসা, দাউদ, সোলায়মান, ইয়াহইয়া ও হজরত ইসা (আ.)। এ শাখাটিতে দীনের অধঃপতন ও বিকৃতি ঘটে সৃষ্টি হয় ইহুদীবাদ ও পরে খ্রিষ্টবাদ।
ইবরাহীম (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল মূর্তি পূজারী এক রাজ পুরোহিতের ঘরে। যে নবীর উপরে ভবিষ্যতে দায়িত্ব প্রদান করা হবে শিরক মুক্ত একটি জাতি গঠনের, যার হাতে নির্মিত হবে ইসলামের প্রাণ কেন্দ্র বায়তুল্লাহ,তাকে পবিত্র রাখার, তার চিন্তাকে বিশুদ্ধ ও কলুষমুক্ত রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। হজরত ইবরাহীম (আ.) জীবনের ঊষালগ্নে আমাদের বাইরে বিশ্ব প্রকৃতির যে একটি চিরন্তনী ধারা আছে, সে আপন সূর্য চন্দ্র আলো আঁধার নিয়ে সর্বজনের সর্বকালের। জ্যোতিষ্ক লোকের ছায়া দোলে সেই ধারার ছন্দে। ইবরাহীমের জীবনে বিশ্ব স্রষ্টা রবের বিপুল প্রেমের আনন্দ এসেছিল চৈতন্যের নিবিড়তা যা তাঁকে অসীমের মধ্যে উপলব্ধি করতে সহায়তা করেছিল, তিনি তখন বিশ্বের নিত্য উৎসবের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন, বিশ্বের বাণী তাঁরই কন্ঠে উচ্চারিত হলো।
তিনি ঘোষণা করে ছিলেন নভোমন্ডল ও ভূম-লের অস্তয়মান চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকার দিকে তাকিয়ে -এগুলির আমার রব নয়। আমি একমুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করছি যিনি যিনি নভোম-ল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিক নই। (আনয়াম)
 ইবরাহীমের চিত্তে এই বিশ্ব প্রকৃতির চিরন্তন ধারার ছন্দ যে দোলা দিয়েছিল তার পেছনে বিদ্যমান ছিল স্বয়ং রবেরই ইঙ্গিত। আল্লাহর কথায় “আমি ইবরাহীমকে নভোম-ল ও ভূ-লের অত্যাশ্চার্য বস্তু সমূহ দেখাতে লাগলাম যাতে সে দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে যায়। অনন্তর রজনীর অন্ধকার যখন তার উপরে সমাচ্ছন্ন হল, তখন তিনি একটি তারকা দেখতে পেলেন। বললেন, এটি আমার প্রতিপালক। যখন তা অস্তমিত হল, তখন বললেন, আমি অস্তগামীদেরকে ভাল বাসি না। অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখলেন, বললেন, এটি আমার প্রতিপালক। অনন্তর যখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন বললেনঃ যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন, তবে অবশ্যই আমি বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
অতঃপর সূর্যকে চক চক করতে দেখলেন, বললেনঃ এটি আমার পালন কর্তা, এটি বৃহত্তর। অতঃপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যে বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত। আমি একমুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করছি, যিন নভোম-ল ও ভূম-ল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিক নই। তাঁর সম্প্রদায় তাঁর সাথে বিতর্ক করল। “ওয়া কাজালিকা নূরী ইবরাহীমা মালাকুতাস্ সামাওয়াতে ওয়াল আরদে ওয়া লিয়াকুনা মিনাল মুকিনীন।” (আনয়াম -৭৫)
ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সাথীদের মধ্যে এক সুন্দর আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে সাফ বলে দিয়েছে: তোমাদের সাথে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যে মাবুদের তোমরা পূজা কর তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করছি। এক আল্লাহর উপর তোমাদের ঈমান না আনা পর্যন্ত আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।” (আল মুমতাহিনা -৪)।
মহাসত্যের সন্ধান লাভ করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মালিক আসমান জমিনের মালিক অল্লাহকে রব মেনে নেয়ার সাথে সাথে তিনি প্রথমেই আহ্বান জানালেন তাঁর পরিবারকে তার কওমকে শিরক ও মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ ও রব হিসেবে মেনে নিতে। ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বললেনঃ তুমি কি প্রতিমা সমূহকে উপাস্য মনে কর? ইবরাহীম তাঁর পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারের আসে না, তার এবাতদত কেন কর? পিতা বলল, হে ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও তবে, আমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করব।”
তিনি তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, কোরআনের ভাষায়,“সে ঘটনা স্মরণ করো যখন সে তাঁর পিতা ও তাঁর কওমকে বলেছিল, এমন সব কেমন মূর্তি যার প্রতি তোমরা অনুরক্ত হয়ে পড়েছ ? জবাবে তারা বলে, আমরা আমাদের বাপ দাদাকে এদের ইবাদত করতে দেখেছি। সে বলে তোমরাও পথভ্রষ্ট এবং তোমাদের বাপ দাদারাও সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল।
তারা বলে, তুমি কি তোমার আপন চিন্তা ভাবনা আমাদের সামনে পেশ করছ, না ঠাট্টা করছ? সে বললো, না, বরঞ্চ তোমাদের রব প্রকৃত পক্ষে সেই যিনি আসমান জমিনের রব এবং যেগুলো তিনি পয়দা করেছেন এবং এ ব্যাপারে তোমাদের সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং খোদার কসম, তোমাদের অসাক্ষাতে আমি অবশ্যই তোমাদের প্রতিমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার সিদ্ধান্ত করছি।”
সত্যি সত্যি একদিন বিশেষ উৎসবের দিনে ইবরাহীমের সম্প্রদায় তাঁকে উৎসবে যোগ দিতে আহ্বান জানালে তিনি বললেন, “আমি পীড়িত। “সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে অপরাগ মনে করে ছেড়ে উৎসবে চলে গেল।”
ইবরাহীম এই সুযোগে মূর্তিগুলিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন ওদের প্রধানটি ব্যতীত; যাতে তারা তার কাছে প্রত্যাবর্তন করে।
 উৎসব থেকে ফিরে সম্প্রদায়ের লোকেরা মূর্তি গুলির দুরবস্থা দেখে বলল, আমাদের উপাস্যদের সাথে কে এরূপ ব্যবহার করল। সে তো নিশ্চয়ই কোন জালেম। কতক লোকে বলল, আমরা এক যুবককে তাদের সম্পর্কে বিরূপ আলোচনা করতে শুনেছি; তাকে ইবরাহিম বলা হয়। তারা বললঃ তাকে জনসমক্ষে উপস্থিত কর যাতে তারা দেখে। তারা বলল, হে ইবরাহীম, তুমি কি আমাদের উপাস্যদের সাথে এরূপ ব্যবহার করেছ? তিনি বললেনঃ না, এদের এই প্রধানই তো এ কাজ করেছে এবং কিছু যুক্তি উত্থাপন করলেন।
তাঁর যুক্তি শুনে তারা অনুভব করতে লাগল যে, এ যুবক সাধারণ কোন যুবক নয়। তাঁর যুক্তির সম্মুখে আমাদের যুক্তি অবান্তর। তাঁর মুখ বন্ধ করতে তাকে হত্যা করাই শ্রেয়। তারা বলল, “এক পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও।”
 হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর দাওয়াত পরিবার কওম সীমা অতিক্রম করে পৌঁছল ঔদ্ধত্য তাগুতী বাদশাহ নমরূদের দরবারে। মানুষ বিশ্বজগতের রব হতে পারে না। কিন্তু নমরূদ অহংকারী হয়ে নিজকে রব হিসেবে দাবি করল। ইবরাহীম (আ.) নমরূদের এ দাবির প্রতিবাদ জানালেন, বললেন, “আমার রব তো তিনি যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। নমরূদ বললো, জীবন ও মৃত্যু আমারই এখতিয়ার। ইবরাহীম বললো, আচ্ছা আল্লাহতো সূর্য পূবর্ দিক থেকে উদিত করেন তুমি ওটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও। এ কথা শুনে সে কাফের হতবাক হয়ে রইল।
 এভাবে ইবরাহীমের তওহীদ প্রতিষ্ঠার দাওয়াত সমাজে যখন একটি আন্দোলনের ঢেউ জাগাতে সক্ষম হল তখন ধর্মগুরু, সমাজপতি ও রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়ে ইবরাহীমকে দুনিয়া থেকে বিদায় করার চক্রান্ত মেতে উঠল। “তারা বললো, এর জন্য এক আগুন প্রজ¦লিত করো এবং তাঁকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করো। তারা তাঁর বিরূদ্ধে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেয়েছিল এবং আমরা তাদেরকে লাঞ্ছিত করলাম এবং ইবরাহীম বললো, আমি রবের দিকে যাচ্ছি তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।”
 নবীর বিপ্লবী আহ্বানের পর পর নমরূদী শক্তি আর চুপ থাকতে পারেনি। তারা নবীকে আগুনে ফেলে দিল। কিন্তু মহান রব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিল না তার প্রিয় বান্দাহকে আগুনে পুড়িয়ে মারবার। এরশাদ হচ্ছে: “তারা বলল, একে আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেল। আর (এ ভাবে) তোমাদের (খোদার) সাহায্য কর যদি তোমরা যদি কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে আগুন, ইবরাহিমের প্রতি ঠাণ্ডা হয়ে যাও এবং শান্তি স্বরূপ হয়ে যাও। ” (আম্বিয়া- ৬৯-৭০)।
‘ঐতিহাসিক রেওয়ায়েত সমূহে বর্ণিত রয়েছে, এক মাস পর্যন্ত সমগ্র শহরবাসী জ্বালানী কাষ্ঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে থাকে। এর পর তাতে অগ্নি সংযোগ করে সাত দিন পর্যন্ত প্রজ্বলিত করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অগ্নিশিখা আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। তখন তারা ইবরাহিম (আ.)-কে এই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করল। অবশেষে তারা ইবরাহিমকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করল। তখন আল্লাহ বললেন, ‘হে অগ্নি, তুমি ইরাহিমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।” ইবরাহিম (আ.) এই অগ্নিকুণ্ডে সাত দিন ছিলেন। তিনি বলতেন ঃ এই সাত দিন আমি যে সুখ ভোগ করেছি, সারা জীবনে তা ভোগ করিনি। -(মাযহারী)
“তারা ইবরাহিমের বিরূদ্ধে ফন্দি আঁটতে চাইল, অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম।” (আম্বিয়া)
এভাবে শিরকের বিরোধিতা ও তওহীদের দাওয়াত প্রদানের কারণে ইরাহীমের জন্য তাঁর জন্মভূমি সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি তাঁর দেশ, আপন কওম, পরিবার এমনকি আপন পিতাকে পরিত্যাগ করে হিজরতের জন্য বের হয়ে পড়লেন।
হিজরতে বেরিয়ে পড়ার প্রক্কালে তিনি ও তাঁর সাথে ঈমানদারগণ পরিষ্কার ভাষায় তাঁর কওমকে বলেছিলেন, “আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের এ সব খোদার প্রতি, যাদেরকে তোমরা খোদা মেনে পূজা কর, এ সবের উপরে একেবারে বিরাগ ভাজন হয়ে পড়েছি। আমরাতো তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেল, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান এনছে।” (মুমতাহিনা-৪)।
এই বের হয়ে পড়া ছিল ইবরাহীমের মানব জাতির নেতৃত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি ও পরীক্ষা। আল্লাহর কথায় “আর যখন ইবরাহীমকে তাঁর প্রভু কয়েকটি কলেমা (ফরমান)) দ্বারা পরীক্ষা করলেন, সে তা পূর্ণ করল। নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানব জাতির নেতা করব।” (বাকারা-১২৪)।
যে সব কালেমাতের মাধ্যমে আল্ল্াহ তায়ালা তাঁর খলিলকে জাতির নেতৃত্ব গ্রহণের যোগ্য করে তাঁর উপরে নেতৃত্ব অর্পণ করলেন সেগুলি ছিল আল্লাহর কাছে থেকে নির্দেশ আসবার সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় জাতিকে পরিত্যাগ করা, বাদশাহ নমরূদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান এবং সাহসিকতার সাথে তার যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি পেশ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য অগ্নিকু-ে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে আনন্দ চিত্তে বহন করে নেয়া, আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ আসার পর তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জান মাল দিয়ে অতিথি সেবা করা এবং আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্রকে জবেহ করা।
হজরত ইবরাহীমের শেষ পরীক্ষা মানব ইতিাহসে এক নজীরবিহীন ঘটনা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মুসলিম জাহানে হজ্জকে ফরজ করা হয়েছে। কোরবানীকে হজ্জের সময় হাজীদের সহ গোটা মুসলিম জাতির জন্য একটি উন্নত মর্যাদাশীল ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। হজরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর হুকুম পেয়ে তার প্রিয় পুত্রকে রেখে এসেছিলেন মরুর উপত্যকা প্রান্তরে। কিছু দিন পর পর তিনি সিরিয়া থেকে মক্কায় এসে স্ত্রী- পুত্রদের কাছে অবস্থান করতেন। এ ভাবেই হজরত ইসমাইল বড় হতে লাগলেন।
‘তারপর যখন ছেলেটি তাঁর সাথে দৌড়ে চলা ফেরার বয়সে পৌঁছল তখন একদিন ইবরাহীম বললো, পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, যে তোমাকে জবেহ করছি। এখন তুমি কি বলছ? সে বললো, আব্বা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি ইনশা আল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীল দেখতে পাবেন। অবশেষে তারা ঊভয়ে যখন খোদার আনুগত্যে মস্তক অবনত করলো এবং ইবরাহীম তাঁর পুত্রকে মাথার উপরে উপুড় করে ফেললো এবং আমরা তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমরা নেককারদেরকে এমনি ভাবে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চিতরূপে এ এক পরীক্ষা এবং আমরা একটি বড় কোরবানী ফিদিয়া স্বরূপ দিয়ে দিলাম এবং সন্তানকে রক্ষা করলাম। (সফফাত- ১০২- ১০৭)
আল্লাহর ইচ্ছা ছিল হজরত ইবরাহীমকে বিশ্বের মানুষের নেতা বানাবেন। আল্লাহর ঘোষণা- “ইন্নি জায়েলুন্ লিন নাসে ইমামা।” যে কারণে তিনি আল্লাহর পথে কোরবানী হতে প্রস্তুত এমন সন্তানকে তরবারির তল থেকে বের করে এনে দায়িত্ব দিলেন মুসলিম জাতির মিলন কেন্দ্র গোটা বিশ্বের সর্বকালের খোদা প্রেমিকদের মিলন ভূমি তৈরী করার। কোরআনের ভাষায়-আর সেই সময়টি স্বরণযোগ্য, যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবা ঘরের ভিত্তি সমূহ গেঁথে উঁচু করেছিল।’ এ মহৎ কর্ম সাধন কালে পিতা পুত্র দোয়া করেছিল, হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের নিকট থেকেব এই ইবাতদতটুকু কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সকল কথা শুনে থাক এবং সকল বিষয় অবগত রয়েছ।”
তাঁরা আরও বলেছিল, “হে আমাদের প্রভু! আর তুমি আমাদের দুজনকে তোমার প্রতি অনুগত বানাও এবং আমাদের বংশে তোমার প্রতি অনুগত একদল লোক সৃষ্টি করে দাও। আর তুমি আমাদেরকে আমাদের ইবাদতসমূহ শিখিয়ে দাও এবং আমাদের তওবা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী ও দয়াময়।”
এই কাবা ঘর তার ভিতরকার অমরতা কাল পরম্পরা ইবরাহীমের স্মৃতিকে বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোরবানীকে যে বেদনাকে এই স্মৃতি ঘোষণা করছে তার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি ঘোষণা আছে, তার বাণী হচ্ছে- আর যে ব্যক্তি ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে মুখ ফিরায় তা মুর্খতা বশত বৈ নয়। এবং অবশ্যই আমি তাঁকে দুনিয়ার বুকে মনোনীত করেছি আর আখেরাতে সে নিশ্চয়ই নেককারগণের অন্তর্গত। “যখন তার প্রভু তাঁকে বললেন, অনুগত হও, সে বলল, আমি নিখিল সৃষ্টির প্রতিপালকের অনুগত হলাম।”
আর এ জন্য ইবরাহীম তাঁর পুত্রকে অসিয়ত করলেন এবং ইয়াকুবও -“হে আমার পুত্র! নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য দীন মনোনীত করেছেন। তাই তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (বাকারা- ১৩১- ১৩৩)
হজরত ইবরাহীম এক দীর্ঘ ইতিহাস, একটি জাতি। পবিত্র কোরআনের ২৫ টি সুরায় প্রচুর আয়াতে তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের ত্যাগ ও কোরবানীর ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে, যেন পরবর্তী মানব সমাজ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কী ভাবে আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়, কী ভাবে সুখী ও সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
এই দীর্ঘ ঘটনায় স্পষ্ট করে দিয়েছে কী ভাবে খোদা প্রেমের আবেগ রুদ্ধ দুশ্চেষ্টার বন্ধন জালকে ছিন্ন করে, নবুয়তী শক্তির নিগুঢ় প্রবর্তনায় কী করে মর্দে মোজাহীদ পরিবার পরিজন- জন্ম ভূূমির মায়া পরিবেষ্ঠিত কারাগার ভেঙ্গে ফেলে প্রাণের প্রবাহকে বাধা মুক্ত করার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হতে হয়; তা বর্ণিত হয়েছে এ সব আয়াতে।
হজরত ইবরাহীম (আ.) যদি জন্ম ভূমি ইরাকেই বসবাস করতেন তা হলে হয়তবা ঐ স্থানটি মানুষের একমাত্র মিলন কেন্দ্র হতে। কিন্তু তাঁর জন্ম ঐ লোকালয়ের জন্যই নয়, এই বিশাল বিশে^র প্রয়োজনে তাঁর জন্ম। বিশ^ ব্রহ্মা-ের সাথে তাঁর প্রাণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তার ইন্দ্রিয় বোধের তারে তারে বিশে^র স্পন্দন নানা রূপ রসে জেগে উঠেছিল।
কিন্তু আজ তাঁর উত্তরসুরি মুসলিম সমাজ জাতি স্ররষ্টা ইবরাহীম (আ.)-এর ঋণ অস্বীকার করে তাঁর আদর্শকে পরিত্যাগ করে ধন সম্পদকে আকড়িয়ে থাকার প্রচেষ্টা চালায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থকে রক্ষার তাগিদে মুসলি জাতির চিরশত্রু,যারা মুসলমানের সকলকে সন্দেহ করে ভয় করে, ঈর্ষা করে বিশ্ব মানব সমাজের কাছে হেয় করতে চায়, জগৎ থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় তাদেরকে চরম আশ্রয় বলে মনে করে তাদের পদপ্রান্তে লুটিয়ে পড়ছে।
পিতৃত্বের যে ঋণ অস্বীকার করে মুসলমান জাতি নির্যাতিত হচ্ছে আজ যদি তারা সে ঋণকে মিটিয়ে দিয়ে শ্রেয়ের ক্ষুরধার নিশ্চিত দুর্গম পথে দুঃখকে মৃত্যুকে স্বীকার করে নেয় তা হলে বর্তমান কালের নমরূদ, ফেরাউনের অগ্নিকুণ্ড তার জন্য শীতল হবে, শত্রুর শাণিত সমস্ত অস্ত্রগুলি ভোতা হয়ে যাবে,মরু ভূমিতে যেমন আবে জম জম সৃষ্টি হয়ে প্রাণের বন্যা বইয়ে দিয়ে ছিল, আজও তেমনি সমস্ত বিশ্বের রহমতের ভান্ডার তার জন্য উন্মুক্ত হবে। এ সত্যই আল্লাহর ঘোষণা- “নিশ্চিতরূপে এর মধ্যে (ইবরাহীমের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে) নির্দেশাবলী রয়েছে ঈমানদারদের জন্য।” আজ মহাকাল আহ্বান করছে আমাদের পথ যাত্রার বাধা দূর করবার মহা শক্তি ইবরাহীমের ত্যাগী জীবন থেকে আহরণ করত আমরা যেন আবার যাত্রা শুরু করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ