বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দলগত কর্মসূচি দেয়ার পাশাপাশি বিএনপির নজর এখন সংগঠনে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ‘রাজনৈতিক দলগুলো অনৈক্যের চোরাবালিতে আটকিয়ে গেছে, আপোসকামিতার ইয়েতে ঢুকে গেছে’ বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটভুক্ত দলগুলোকে নিয়ে এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার। জোটে কী ফাটল ধরেছে- এরকম প্রশ্ন করা হলে মান্না জবাবে বলেন, জোট তো আছে। ঐক্যে ফাটল ধরেছে বলিনি। বলেছি যে, রাজনৈতিক দলগুলো অনৈক্যের চোরাবালিতে আটকিয়ে গেছে, আপোসকামিতার ইয়েতে ঢুকে গেছে। এটা সরকারের সাথে হতে পারে, অন্যদের সাথে হতে পারে, নিজেদের মধ্যে হতে পারে।  আমাদের খুবই দরকার ছিলো ৩০ ডিসেম্বরের ঘটনার পর (সংসদ নির্বাচন) আন্দোলনের মাঠে থাকা। সেটা তো আমরা আসলে থাকতে পারিনি-এটাই বুঝাতে চেয়েছি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেছেন।
জানা গেছে, জোট নিয়ে এই মুহূর্তে মাথাব্যথা নেই বিএনপির। দলটি এখন নিজেদের গোছাতেই ব্যস্ত। বিশেষ করে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিই প্রাধান্য পাচ্ছে। এছাড়া একটি নতুন নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি যে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলছে সেই প্রস্তুতিই এখন দলটির কাছে বড় বিষয়। তাই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট নিয়ে তেমন কার্যক্রম হাতে নেই। তবে নিয়ম মাফিক কিছু আলোচনা অব্যাহত থাকবে। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর বিষয়ে দলটির অবস্থান উন্মুক্ত। কেউ জোটে থাকতে চাইলে সহযোগিতা করা হবে, ছেড়ে যেতে চাইলেও বাধা দেওয়া হবে না। আপাতত জোটবদ্ধ হয়ে কোনও কর্মসূচিতে যাবে না তারা। দলগত কর্মসূচি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নজর এখন সংগঠনে। এ কারণে বিভাগীয় শহরগুলোয় বিএনপির চলমান কর্মসূচিতে জোটসঙ্গীদের যুক্ত করা হচ্ছে না। নিজেদের আয়োজনে এমন কর্মসূচিতে উপস্থিতিও ছিল লক্ষ্যণীয়।
বিএনপি নেতারা বলছেন, জোটের প্রশ্ন আসে নির্বাচন, বড় কোনও দাবি আদায় বা সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু নিকট-ভবিষ্যতে আন্দোলন বা নির্বাচনের কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে বিএনপি নজর দিচ্ছে দলকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করায়। সংগঠন শক্তিশালী হলে প্রতি ক্ষেত্রেই সফলতা আসবে। এক্ষেত্রে সমমনাদের নিয়ে জোট গঠন করার প্রশ্ন এলে সেটা সম্ভব হবে। ফলে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের নিয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কোনও দল বা ব্যক্তি ‘অযৌক্তিক’ কোনও দাবি তুলে জোট থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, শরিকদের প্রতি পরামর্শ হচ্ছে নিজের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি করে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার। এক্ষেত্রে কোনও সহযোগিতা লাগলে করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এটাকে ঠিক ‘একলা চলোনীতি’ বলা যাবে না। আমাদের সিদ্ধান্ত এই প্রোগ্রামগুলো (সমাবেশ) বিএনপির আয়োজনে করা। এ কারণে জোটবন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে শরিকদের সংশ্লিষ্ট করে প্রোগ্রাম করা হবে। তবে পরোক্ষভাবে আমাদের আহ্বান তো সবার প্রতি থাকছেই। অনেক ক্ষেত্রে সব কিছু ঘোষণা দিয়েও হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের শরিকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত আছে, যার যার সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো। সাংগঠনিক শক্তি জোরদার হলেই জোট বা ফ্রন্ট আরও শক্তিশালী হবে। এখন আমরা নিজস্ব কর্মসূচি ও সংগঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি। শরিকরা চাইলে নিজেদের উদ্যোগে কর্মসূচি পালন করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, সব দলকে নিজস্ব কর্মসূচি পালন করার স্বাধীনতা দেওয়া আছে। এখন বিএনপি নিজের দলীয় কর্মসূচি পালন করছে। কেউ জোটে থাকতে না চাইলে জোর করে আটকে রাখা যায় না মন্তব্য করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, সবাই নিজ নিজ আদর্শ ও বিশ্বাস থেকেই জোটে এসেছে। আবার নিজ নিজ উদ্যোগে জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। বিএনপি তো কাউকে বের করে দেয়নি।
প্রসঙ্গত, একাদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়ে ২০ দলীয় জোট ছাড়েন বিজেপির আন্দালিভ রহমান। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে জোট ছাড়েন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী। তাদের ফেরানোর কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি বিএনপির। এমনকি কাদের সিদ্দিকীর জোট ছাড়ায় কোনও প্রতিক্রিয়াও জানায়নি তারা।   বিএনপি নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০ দলীয় জোট আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিরোধীজোটকে হারানোর পরে জোটের শরিকরা বিভিন্ন ‘অযৌক্তিক’ প্রশ্ন তুলছে। শরিকদেরও নিজেদের শক্তির ওপর নির্ভর করে মাঠে নামতে হবে। প্রেস ক্লাব বা কোনও এসি হলরুমে আলোচনাসভা করে তো মানুষের কাছে যাওয়া যাবে না। খুন, গুম, ধর্ষণ, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, বন্যার মতো ঘটনাগুলোয় সাধারণ মানুষ সরাসরি ভুক্তভোগী। এসব ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাদের মানুষের কাছে যেতে হবে। দরকারে বিএনপি সহযোগিতা করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে। দুই জোট থেকে যতগুলো আসন ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার ৯০ শতাংশই দেওয়া হয়। এখন তারা যদি মনে করে, বিএনপি একাই আন্দোলন করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেবে, তারা শুধু জোটসঙ্গী হিসেবে সুবিধা ভোগ করবে তাহলে তো চলবে না। তাদেরও রাস্তায় নামতে হবে। বিএনপি করবে আর তারা খাবে, এটা তো হবে না। বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, দেশে এখন বন্যা। অনেক মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত। শরিকরা নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে টাকা-পয়সার কোনও সহযোগিতা লাগলে আমরা সাধ্যমতো দেবো। এছাড়া ধর্ষণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-সহ বিভিন্ন ইস্যুতে মিটিং-মিছিল করতে পারে বিভিন্ন জেলায়। শুধু ঢাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন বা কোনও হলরুমে আলোচনা সভা করে আর বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপালে তো হবে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, বিএনপি তার নিজস্ব কর্মসূচি ও সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত আছে। এ কারণে জোটগত কোনও কর্মসূচি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে এখন জোট শরিকদের করণীয় কী, সেটা নিশ্চয় তারা ভালো বোঝেন। আমরা তো তাদের কর্মসূচির বিষয়ে বলে দিতে পারি না। আমাদের কোনও সহযোগিতা লাগলে সেটা দিতে পারি। তবে শরিকরা তাদের সঙ্গে আছেন, আগামীতেও থাকবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দলের সার্বিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করেই বিএনপিতে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা ছাড়া আমরা কোনও সিদ্ধান্তই নেই না। ২০ দল গঠন করেছি তার পরামর্শে, ঐক্যফ্রন্ট করেছি তার পরামর্শ নিয়ে। নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছি তার পরামর্শে। জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, জোট গঠন হয়েছে একটা টার্গেটকে সামনে রেখে। আমরা একটা নির্বাচন করেছি। আমরা হেরেছি সেটি বলা যাবে না। কিভাবে ভোট হয়েছে সেটি সবাই দেখেছে। মিডিয়াতে সেসব প্রচারও হয়েছে। তিনি বলেন, জোটের প্রয়োজনীয়তা কখনোই শেষ হবে না। এই জোট ছিল এবং থাকবে। আমরা সবাই এখন নিজেদের সাংগঠনকি কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত। এর মাঝেও জোটের বৈঠক হচ্ছে।  জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে কাদের সিদ্দিকীর বেরিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে ফখরুল বলেন, এই দুই-একটা লোক বেরিয়ে যাচ্ছে, আসছে, যাবেই। এটা বরাবরই হচ্ছে, হবেই। সবাই তো আর চিরস্থায়ী হয় না। বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, মানুষকে হতাশ হতে দেবেন না। হতাশার কথা বলবেন না। আমরা যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে ভালোবাসি, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, মানুষের মুক্তি দেখতে চাই, তাহলে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ঝিমিয়ে পড়েছিল। কোনও কর্মসূচি না থাকায় দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এককভাবে কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে দলকে সংগঠিত করার দিকে মনযোগ দিয়েছেন তারা। বিষয়টিকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন। একইসঙ্গে শরিক দলগুলোও নিজ-নিজ সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কাজে মনোযোগ দিচ্ছে। মাঠে থাকারও চেষ্টা করছে কর্মসূচি নিয়ে।
২০ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সমাবেশ, মিটিং-মিছিল করে জনগণকে সংগঠিত করলে একসময় সরকার পুনঃনির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতেও বাধ্য হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে একটা সময় নিতে হয়। আমরা সময় নিচ্ছি, বিএনপি দল গোছাচ্ছে, এতে ক্ষতি কী? এটাকে আমরা পজেটিভলি নিচ্ছি। আমরাও বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় থাকার চেষ্টা করছি। সবকিছু মিলিয়ে জাতীয়কে আরও ঐক্যবদ্ধ করে আমরা মাঠে নামবো। প্রত্যেক দলের নিজস্ব কিছু সমস্যা থাকে বলে উল্লেখ করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, সেগুলো তো গোছানো সময়সাপেক্ষ। ফলে বাইরে থেকে বিএনপির সমালোচনা করবো, এটা তো হয় না।
জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক বলেন, বিএনপিকে বলে দিয়েছি, ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে মাতামাতি করলে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো না। বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল মনে করেই দলটির সঙ্গে তারা আছেন বলেও তিনি জানান।  
রাজনীতিতে জোটের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্যফন্টের অন্যথম শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, রুখে দাঁড়াবার এখনই সময়। একথা সত্য বিরোধীদলীয় রাজনীতি আজ অনৈক্যের কানা গলিতে আর আপোসকামিতার চোরাবালিতে আটকে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং নিয়মিত গণতন্ত্রের চর্চা থাকলে সরকার আজ এতখানি স্বৈরাতান্ত্রিক আচরণ করতে পারত না। সেজন্যই দল, গোষ্ঠী, পরিবার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-স্বার্থ বাদ দিয়ে সবাইকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা ভাবতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ