বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

১ কোটি ২০ লাখ কুরবানির চামড়ার কী হবে প্রশ্ন জনমনে

এইচ এম আকতার : ১৪ বছরেও সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটি (সিইটিপি) কাজ শেষ হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হচ্ছে- গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো নির্মাণের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। সরকার বলছে, কুরবানির সময় বাড়তি চামড়ার চাপ সামলানোর জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তত সাভার চামড়া পল্লী। কুরবানির পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে এ ট্যানারি পল্লী কতটা সক্ষম- তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে ট্যানারি মালিকরা। কি হবে কুরবানির ১ কোটি ২০ লাখ চামড়ার। এ নিয়ে প্রশ্ন জনমনে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিসিকের একটি ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আদালত ট্যানারি স্থানান্তরে বাধ্য করে। প্রতি দিন পঞ্চাশ হাজার টাকা করে প্রতিটি ট্যানারি মালিককে জরিমানা প্রতিশোধের রায় দেয় আদালত। তারপরেও যারা ট্যানারি স্থনান্তর করেনি তাদের গ্যাস বিদ্যুৎ এবং পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এতে করে বাধ্য হয়ে হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থনান্তর করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে।
অনেক প্লট মালিক তখনও তাদের প্লট বুঝে পায়নি। অনেকে আবার বুঝে পেলেও তাতে গ্যাস সংযোগ পায়নি। তখন মাত্র পাঁচটি কারখানা উৎপাদনের উপযোগী হয়। এতে করে গত দু’বছর ধরে কুরবানির চামড়া মূল্য পায়নি। বাধ্য হয়ে অনেকের কুরবানির চামড়া মাটিতে পুতে ফেলতে হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ যে পরিবেশের অজুহাতে হাজারিবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে স্থনান্তর করা হলো সে একই অবস্থা তৈরি হলো এখানে। নতুন করে আরো একটি(ধলেশ্বরী) নদী ধ্বংস হচ্ছে। এর দায়ভার কে নিবে। সরকারের এমন উদ্যোগে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক অর্ডার হারায় বাংলাদেশ। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি নেতিবাচক অবস্থার তৈরি হয়। যা এখনও বিদ্যামান রয়েছে।
জানা গেছে প্রতি বছরই সারাদেশে প্রায় ৭০ লাখ গরু মহিষ আর ৫০ লাখ ছাগল কুরবানি হয়ে থাকে। প্রাণি সম্পদ মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, এবারও করুবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা রয়েছে ১ কোটি ২৯০ লাখ। দেশিয় পশুতেই কুরবানি করা সম্ভব। ভারত থেকে কোন গরু আমদানি করতে হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ১ কোটি ২০ লাখ পশুর চামড়ার অবস্থা কি হবে। আদৌ কি কুরবানিদাতার তাদেও চামড়ার ন্যার্য্য মূল্য পাবে না কি নাম মাত্র বিক্রি করতে বাধ্য হবে। না কি দাম না পেয়ে ক্ষোভে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। এমন সব প্রশ্ন কুরবানিদাতার মনে উকি ঝুকি খাচ্ছে। কিন্তু এসব প্রশ্নের কোন জবাব নেই কারো কাছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ ধরনের সন্দেহ দেখা দেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ এখনও ট্যানারি পল্লির অবকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরির কাজ এখনও শুরুই হয়নি। এখনও তা ফেলা হচ্ছে খোলা স্থানে। এ বর্জ্যের বেশিরভাগ নির্ধারিত পুকুর ও আশপাশে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। আশপাশের ডোবা ভরে গেলে বর্জ্যসহ ময়লা পানি গড়িয়ে পড়ছে পাশের ধলেশ্বরী নদীতে। পরিকল্পনা আছে- এখানকার কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের। কিন্তু পরিবেশ দেখলে ওই পরিকল্পনার কথা ভাবাও দুষ্কর। এ পরিকল্পনার কার্যকর কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এখনও। চামড়া শিল্প নগরীর সীমানা প্রাচীর ভেঙে বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধ করতে মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হলেও তা ভেদ করে তরল বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে এখনও। এ ছাড়া কয়েকটি ড্রেনের ময়লা পানির নির্গমন পথের সংযোগ দেওয়া হয়েছে ধলেশ্বরীতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গোটা শিল্পাঞ্চলে রাস্তার অবস্থা ততটা ভালো নয়। ভাঙাচোরা, জোড়াতালি লাগানো রাস্তায় চলছে চামড়াবাহী গাড়িসহ যানবাহন। প্রকল্প এলাকার রাস্তায় মাটির পরিবর্তে বসেছে ইট। তবে সিইটিপির কাছাকাছি সড়কগুলোতে আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল হালিম বলেন, আগামী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে চামড়া শিল্প নগরীর কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। ২০০ একর জায়গার ওপর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য সংশ্লিষ্ট লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রি স্থাপনের জন্য একটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পের অধীনে একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।
 তিনি জানান, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের মানদ-ে ১ হাজার ৬০০টি প্যারামিটার রয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি প্যারামিটার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট সংক্রান্ত। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়াতে অবশিষ্ট ১ হাজার ৫০০ প্যারামিটার অনুযায়ী চামড়া শিল্প নগরীতে স্থাপিত ট্যানারিগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়ার মান উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত আছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্টে ক্রোম সেপারেশন ও সেডিমেন্টেশনের মান ক্রমশ উন্নত হচ্ছে।
 শিল্প সচিব বলেন, চামড়া শিল্প নগরীর কঠিন বর্জ্য তিনটি স্থানে ডাম্পিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় উৎপাদিত সব বর্জ্যই ক্ষতিকর নয়। ক্রোমিয়াম ব্যবহারের আগ পর্যন্ত উৎপাদিত বর্জ্য নিরাপদ এবং এসব বর্জ্য বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। এসব ব্যবহারযোগ্য ট্যানারি বর্জ্যকে কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র লাল পাল বলেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটির বাকি কাজ কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে। বর্তমানে সিইটিপির বেশিরভাগ কাজ চলছে। তবে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে শিল্প মালিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তারা যদি তাদের কারখানার বর্জ্য সিইটিপিতে না পাঠায় তাহলে এটিকে পুরোপুরি চালু করা কঠিন হবে।
 তিনি জানান, সিইটিপির প্রধান ২১টি অঙ্গের সবগুলোর সিভিল কাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। চারটি মডিউলের মধ্যে সব ক’টিতে ট্রায়াল রান, পারশিয়াল অপারেশন করছে। চারটি মডিউলে স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া শেষ হয়েছে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ জানান, আসলেই চামড়া খাতের অবস্থা ভালো না। সর্বত্র চামড়াজাত পণ্যের অর্ডার কমে গেছে। বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্টের বাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। শিল্প নগরীর কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে ক্রেতারাও অসন্তুষ্ট।
 তিনি বলেন, চামড়া খাতের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে, সাভারের ট্যানারি পল্লিতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শোধনাগারটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে না পারা। একদিকে সরকারের টাকা নষ্ট, আরেকদিকে ট্যানারি পল্লীর পাশে ধলেশ্বরী নদীও নষ্ট হচ্ছে। শুনেছি, এটিকে কার্যকর করতে কিছু মেশিনপত্র কেনা হয়েছে। তা যদি সঠিক হয় তাহলে চলতি বছরের শেষ দিকে এটিকে আংশিক চালু করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়।
উল্লেখ্য, শুরুতে ২০০৩ সালে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ট্যানারি হস্তান্তরের অনুদান ২৬০ কোটি ৩ লাখ টাকা। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডাম্পিং ইয়ার্ড, সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ও প্লাজ পাওয়ার জেনারেশন সিস্টেমের (এসপিজিএস) ব্যয় ধরা হয় ৬০৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অন্যান্য উন্নয়ন ও রাজস্ব ব্যয় ধরা হয় ২১৩ কোটি ৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ব্যয়ের আর্থিক অগ্রগতির পরিমাণ ৭৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
১৯৪ দশমিক ৪০ একক জমির ওপর স্থাপিত সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে মোট প্লটের সংখ্যা ২০৫টি। এর ওপর শিল্প ইউনিট হবে ১৫৫টি। এজন্য শিল্প মালিকদের নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৫৫টি প্লটের মধ্যে একটি প্লটের বিপরীতে মামলা থাকায় এ পর্যন্ত ১৫৪টি প্লট শিল্প মালিকদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিসিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারখানার মূল ভবনের কাজ শুরু করেছেন ১৫১ জন মালিক।
এ বছর এখনও কুরবানির চামড়ার মূল্য নির্ধারন করা হয়নি। ট্যানারি মালিকরা বলছে, আন্তজাতিক বাজারে চামড়ার যে দাম তাতে দাম নির্ধারন করা খুবই কঠিন কাজ। তাছাড়া ট্যানারি শিল্পের যে অবস্থা তাতে চামড়া কিনে কি হবে। এখনও আড়ৎ মালিকরা তাদের কাছে কাচা চামড়ার বিল পাওনা রয়েছে। গত বছরের চামড়া এখনও অবিক্রিত রয়েছে। তাহলে আমরা নতুন চামড়া কিনে কি করবো।
সূত্র জানায় অনেক ট্যানারি মালিক এখনও তাদের কারখানার কাজ সমাপ্ত করতে পারেনি। তাহলে তারা কাচা চামড়া কিনে কি করবে। তাছাড়া তারা তো আর ব্যাংক ঋণ পায় না। তাহলে তারা চামড়া কিনবে কি করে। চামড়া নিয়ে গত বার যে অবস্থার তৈরি হয়েছিল এবারও একই অবস্থা হতে পারে।
গত বছর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাঠিতে পুতে পেলতে বাধ্য হয়েছে। অনেকের চামড়া আবার কুকুরে খেয়েছে। অনেকে চামড়া রেখে চলে গেছেন। এবারও একই অবস্থার আশঙ্কা করছে তারা।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ গোস্ত ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সেক্রেটারি রবিউল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, এবার কুরবানির চামড়ার কী হবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এখনও চামড়ার মূল্য নির্ধারন হয়নি। এমনকি নির্ধারনের কোন উদ্যোগ নেই। ট্যানারি মালিকরা আমাদেও আগের বকেয়া এখনও পরিশোধ করতে পারেনি। তা হলে আমরা কি কওে চামড়া ক্রয় করবো। আমরা তো আর ব্যাংক ঋণ পাই না। যারা ঋণ পায় তারা চামড়া না কিনে কারখানা নির্মাণ করছে। সংগত কারনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কি হবে কুরবানির চামড়ার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ