সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

হজ্ব ফরজের ইতিহাস

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : আল্লাহতায়ালা বাবা আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)কে বেহেস্ত থেকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সেখান থেকে আল্লাহ পাক কল্যাণময় সেই পাথর ‘হাজরে আসওয়াদ’ ও পাঠালেন। আল্লাহ তাদেরকে কাবাঘর নির্মাণের আদেশ দিলেন। রাসূল (সা.) বলেন, ‘হযরত আদম(আ.) ও হযরত হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমনের পর আল্লাহতায়ালা হযরত জিবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে তাদেরকে কা’বা ঘর নির্মাণের আদেশ দেন। এ গৃহ নির্মিত হয়ে গেলে তাঁদেরকে কা’বা ঘর তাওয়াফ করার আদেশ দেয়া হয় এবং বলা হয়, আপনি সর্বপ্রথম মানব এবং এ ঘর সর্বপ্রথম ঘর যা মানবম-লীর জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।’ (ইবনে কাসীর, বায়হাকী)
কা’বা ঘরের হজ্বের ইতিহাস আরো পুরাতন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আদম(আ.) ও আসমান জমিন সৃষ্টির দুই হাজার বছর পূর্বে ফেরেস্তা কর্তৃক কা’বা ঘর নির্মিত হয়।
তাবারানীর বর্ণনা মতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) কে বেহেশত থেকে নামালেন, তখন তাকে বললেন- আমি তোমার সাথে সাথে এমন একটা ঘর নামাবো, যার চার পাশে তাওয়াফ করা হবে যেমন আমার আরশের চারপাশে তাওয়াফ করা হয় এবং তার কাছে নামাজ পড়া হবে, যেমন আমার আরশের কাছে নামাজ পড়া হয়। তারপর যখন বন্যার সময় এলো, তখন এই ঘরকে ওপরে তুলে নেয়া হলো। নবীগণ এই ঘরের কাছে গিয়ে হজ্ব করতেন, কিন্তু তার স্থানটা চিনতেন না। অত:পর এই জায়গায় আল্লাহ হযরত ইবরাহীমকে বসবাস করালেন। তিনি পাঁচটা পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবাঘর নির্মান করলেন। পাঁচটি পাহাড় হল- হেরা, ছাবীর, লেকমন, তুর ও খায়ের। সুতরাং তোমরা যত বেশি পার এই ঘর দ্বারা উপকৃত হও।
ইসবাহানীর বর্ণনায় রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন- হজ্ব আদায়ে ত্বরিত উদ্যোগী হও। অর্থাৎ ফরজ হজ্ব দ্রুত আদায় কর। কেননা কখন কি বাধা বিঘœ এসে পড়বে কেউ জানো না।
ইসবাহানীতে আরো বর্ণিত। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) বর্ণনা করেন। রাসুল (সা:) বলেছেন-আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ:)কে ওহীর মারফত বললেন- হে আদম, তোমার কোন অঘটন ঘটার আগে এই ঘরে হজ্ব আদায় করে নাও। আদম (সা:) বললেন- হে আমার প্রতিপালক, আমার কী অঘটন ঘটবে? আল্লাহ বললেন- সে তুমি জাননা। মৃত্যু হতে পারে। আদম (আ:) বললেন- মৃত্যু আবার কী? আমার বংশ ধরের মধ্যে কাকে আমি আমার দায়িত্ব হস্তান্তর করবো? আল্লাহ বললেন- আকাশ ও পৃথিবীর কাছে পেশ কর। আদম (আ:) প্রথমে আকাশের কাছে তাঁর দায়িত্ব পেশ করলেন। সে ঐ দায়িত্ব গ্রহনে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পৃথিবীর কাছে পেশ করলেন। সেও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। তারপর তিনি পাহাড় পর্বতের কাছে তা পেশ করলেন। সেও অস্বীকার করলো। অবশেষে এই দায়িত্ব গ্রহণ করলো তার সেই ছেলে, যে নিজের ভাইকে হত্যা করেছিল। এরপর হযরত আদম (আ:) ভারতবর্ষ থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে সফরে বেরুলেন। পথিমধ্যে তিনি যেখানেই পানাহার করার জন্য যাত্রা বিরতি করলেন, সেখানেই পরবর্তীকালে জনবসতি গড়ে উঠলো। এক সময় তিনি মক্কা শরীফে এলেন। এখানে ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানালো। তারা বললেন- হে আদম, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার হজ্ব নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হোক। আমরা আপনার দুই হাজার বছর আগে এই ঘরের হজ্ব করেছি। রাসূল (সা:) বললেন- সেদিন কা‘বা ঘর লাল রং এর ইয়াকুত পাথর দিয়ে নির্মিত ছিল এবং ভেতরে ফাঁকা ছিল। যে তাওয়াফ করতো, সে ঘরের ভেতরে যারা আছে তাদেরকে দেখতে পেত। কা‘বা ঘরের তখন দুটো দরজা ছিল। আদম (আ:) তার হজ্ব সমাধা করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ওহী যোগে জিজ্ঞেস করলেন- হে আদম, তোমার হজ্ব আদায় সম্পন্ন করেছ? আদম বললেন- হে আমার প্রভু, করেছি।
মহান আল্লাহ পাকের হুকুমে হযরত ইবরাহীম(আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কর্তৃক কাবাঘর পুণঃনির্মিত হল। এবার আল্লাহ তাদেরকে বললেন, লোকদের ডাকো যেন তারা কা’বা ঘরের হজ্ব করতে আসে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারী, সালাত আদায়কারী এবং রুকু সিজদাকারীদের জন্য এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্য ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে দূর দূরান্ত থেকে। ’(সূরা হজ্ব: ২৬,২৭)
আল্লাহ বলেন, “নিঃসন্দেহে প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, তাতো মাক্কায়, যা বরকতমন্ডিত এবং সারাজাহানের জন্য পথ প্রদর্শক। তাতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে, যেমন মাক্বামে  ইবরাহীম অর্থাৎ ইবরাহীমের দাড়ানোর যায়গা। যে কেউ তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ হবে। মহান আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হজ্ব করা লোকদের উপর ফরয বা অবশ্য কর্তব্য যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ আছে। এবং যে ব্যক্তি   অস্বীকার করবে, সে জেনে রাখুক নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ বিশ্ব জাহানের মুখাপেক্ষী নন।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৬,৯৭)
হজ্বের কেন্দ্রবিন্দু হল কা’বাঘর। আর কা’বাঘরের কেন্দ্রবিন্দু হল হাজরে আসওয়াদ। অতি প্রাচীন ও সেরা নিদর্শন এই হাজরে আসওয়াদ। এই হাজরে আসওয়াদ আল্লাহর পক্ষ থেকে বেহেস্ত হতে আল্লাহই পাঠিয়েছেন। অতি মূল্যবাণ এই পাথর। বিশ্বনবী এই পাথরে চুমু দিতেন। হযরত ইবরাহীম(আ.) কা’বাঘরের দক্ষিণ পূর্ব কোণে এই হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করেন। এই হাজরে আসওয়াদ যথাযথভাবে পুনঃস্থাপণ করে বিশ্বনবী (সা.) নবুয়ত লাভের আগেই কুরাইশদের মধ্যকার বিবধমান বংশীয় সম্ভাব্য সংঘর্ষের সমাধান করেন। তিনি বলেন,‘ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম বেহেস্তের দু’টি ইয়াকুত পাথর। পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহ বলেন, “স্মরণ কর, আমরা যখন বাইতুল্লাহকে মানুষের জন্য কেন্দ্র,শান্তি,নিরাপত্তার স্থান হিসেবে তৈরী করেছি এবং নির্দেশ দিয়েছি, তোমরা মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়।”(সূরা বাকারা: ১২৫)
মাকামে ইবরাহীম মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পাঠানো প্রাচীন ও বিখ্যাত নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই হাজরে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীম বেহেস্তের দু’টি ইয়াকুত পাথর। আল্লাহ এ দু’টি পাথরের নূর মিটিয়ে দিয়েছেন। নূর না মিটালে,এগুলোর আলোতে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমস্ত ভূখন্ড আলোকোজ্জ্বল হয়ে যেত।”
ফাকেহী উল্লেখ করেছেন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম বলেন-  আল্লাহ যখন ইব্রাহীম (আ.) কে লোকদের প্রতি হজ্বের আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন তখন তিনি মাকামে ইবরাহীমের উপর দাঁড়ান। পাথরটি তাঁকে নিয়ে সর্বোচ্চ পাহাড়ের সমান উঁচুতে উঠে। তখন তিনি বলেন-  হে লোকেরা, তোমরা তোমাদের রবের ডাকে সাড়া দাও। লোকেরা সাড়া দিয়ে বললো- লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। অর্থাৎ ‘আমরা হাজির। হে আল্লাহ, আমরা হাজির।’ তখন পাথরটির উপর তাঁর পায়ের দাগ পড়ে যায়। তিনি ঐ কাজ থেকে অবসর হওয়ার পর আল্লাহ তা’য়ালা পাথরটিকে তাঁর সামনে রাখার জন্য নির্দেশ দেন এবং পাথরটিকে সামনে রেখে ইবরাহীম (আ.) বাবুল কা’বার দিকে মুখ করে নামায পড়েন। ইবনে জরীর হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ইবরাহীম (আ.) কা’বা নির্মাণ শেষ করার পর আল্লাহ তাঁকে মানুষের প্রতি হজ্বে আসার আহ্বান জানানের নির্দেশ দেন। তখন তিনি উঁচুতে উঠেন এবং বলেন- হে লোকেরা, তোমাদের রব তোমাদের উদ্দেশ্যে একটি ঘর তৈরি করেছেন,তোমরা সে ঘরের হজ্ব কর এবং আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও। মানুষ তখন বাপের পৃষ্ঠদেশ  এবং মায়ের পেট থেকে সাড়া দিয়ে বলেছে -  আমরা তোমার ডাকে সাড়া দিলাম। হে আল্লাহ আমরা হাজির।’ তারপর রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন: আজ যারা হজ্ব করে তারা সবাই হযরত  ইবরাহীম (আ.) এর ডাকে কম বেশি সাড়া প্রদানকারী।’
হযরত আদম (আ.) তাওয়াফ শেষ করে যেখানে নামায পড়েন সেখানেই মাকামে ইবরাহীম অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাওয়াফ শেষ করে সেখানে দু’রাকাত নামাজ পড়েন এবং সেখানেই তাঁর উপর নাযিল হয়: ওয়ত্তাখাযু মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা। অর্থ ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমে নামাজ পড়।’
ইমাম বগবী বলেন, কা’বা ঘর নির্মাণ করার পর আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)কে নির্দেশ দেন যে, মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে,বায়তুল্লাহর হজ্ব তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আবী হাতেম হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন হযরত ইবরাহীম (আ.) কে হজ্ব ফরয হওয়ার কথা ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, এখানে তো জনমানবশূন্য মরু প্রান্তর। ঘোষণা শোনার মত কেউ নেই। যেখানে জনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ কীভাবে পৌছবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা। মানুষের কানে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। অতঃপর হযরত ইবরাহীম (আ.) আবু কুবায়স পাহাড়ে আরোহণ করে দু’কানে অঙ্গুলী রেখে ডানেÑ  বামে এবং পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করে চিৎকার করে ঘোষণা করেন, “হে মানুষেরা! তোমাদেরকে এ ঘরের হজ্ব করার নির্দেশ করেছেন, যাতে তোমাদেরকে জান্নাত দিতে পারেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারেন। সুতরাং তোমরা হজ্ব কর।” হযরত ইবরাহীম(আ.) এর আওয়াজ আল্লাহ তায়ালা সব মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। এমন কি যারা ভবিষ্যতে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আসবে তাদের কানে পর্যন্ত এ আওয়াজ পৌঁছে দেয়া হয়। যাদের ভাগ্যে আল্লাহ তায়ালা হজ্ব লিখে দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই এ আওয়াজের জবাবে ‘আমি হাজির,হে আল্লাহ, আমি হাজির’ বলে হাজির হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত ইবরাহীম (আ.) এর ঘোষণার উত্তরই হচ্ছে ‘লাব্বাইক’ বলার আসল ভিত্তি। (কুরতবী ১২তম খন্ড, ২৮ পৃষ্ঠা মাযহারী) হযরত ইবরাহীম (আ.) এর ঘোষণাকে সব মানবম-লী পর্যন্ত পৌঁছানোর কারণে কিয়ামত পর্যন্ত হজ্বের ধারা অব্যাহত থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ