সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ‘যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল।’ বাংলাভাষার একটি বহুল পরিচিত প্রবাদবাক্য। এর সঙ্গে ইংরেজি ভাষার একটি প্রবাদের মিল আছে। সেটা হচ্ছে ‘টিট ফর টেট।’ বাংলাতে এরকমই আরেকটা প্রবাদ হলো ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর।’ এসব প্রবাদ চালু হয় অতীব বাস্তবতার প্রেক্ষিতে। চমৎকার প্রবাদসমূহে অনেক কিছু শেখবার এবং উপলব্ধি করবার বিষয় থাকে। এসবের মাধ্যমে সমাজ ও সমাজের মানুষকে চেনা যায়। বোঝা যায়। তাই এ প্রবাদগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমন্ডিত।
কলকাতার ২৪ ঘণ্টা বাংলা সংবাদ চ্যানেল অভিনব একটি খবর পরিবেশন করেছে সম্প্রতি। এটাকে গল্পও বলা যেতে পারে। গল্প বা খবরটি হলো: ভারতের একটি সরকারি অফিসে লোকজন গেলে উৎকোচ তথা ঘুষ ছাড়া কোনও কাজই হয় না। মানুষকে খালি ঘোরানো হয় অবৈধ অর্থের জন্য।
বারবার বিরক্ত হয়ে একদিন একদল কৃষক ঘুষখোরদের অফিসে গোটা চল্লিশেক বিষধর সাপ ছেড়ে দেন। এরপর অবস্থা কী দাঁড়ায় তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। ঘুষখোর বাবুরা কান ধরে কৃষকদের কাছ থেকে প্রাণ ভিক্ষে চান আর ওয়াদা করেন জীবনে ঘুষ খাবেন না। অতঃপর কৃষকরা তাঁদের ছেড়ে দেয়া সাপগুলো সামলে নেন। এটা শুধু দেশটির এক অফিসেই নয়। ঘুষবাণিজ্য চলে কমবেশ সব অফিসেই। অথচ সরকারি অফিসগুলোর কাজই হচ্ছে জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এজন্য সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের যথেষ্ট মাইনে দেয়া হয়। এরপরও ঘুষগ্রহণ তাঁদের বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনও কাজের ফাইল নিয়ে এলে সেটি আটকে দিয়ে নানা অপকৌশলে অর্থ আদায় করেন পাবলিকের কাছ থেকে। অথচ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মাইনে হয়। সংসার চলে। বউ-পোলাপান মউজ করেন। অর্থাৎ যাদের জনগণকে সেবা দেবার কথা, উল্টো তাঁদের কাছ থেকেই সেবা আদায় করে নেয়া হয়। সেবকরা প্রভু সেজে চেয়ারে বসে থাকেন। আর যারা প্রভু তাঁরা সেবক হয়ে ফাইল নিয়ে ঘুরে বেড়ান দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। এই যেন মানুষের নিয়তি। শুধু ভারত কেন, এরোগ ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও যথেষ্ট সংক্রমণ ছড়িয়েছে। বিশেষত আমাদের বাংলাদেশে ঘুষের সংক্রমণ ভয়াবহ বলা যায়।
আমাদের এখানে চাকরি করেন সামান্য কেরানির। অথচ ঢাকায় একাধিক বাড়ি এবং গাড়িও আছে অনেকের। সন্তানদের বিদেশে লেখাপড়া করান দিব্যি। কোটি কোটি টাকার মালিকও অনেকে। কোত্থেকে আসে এতো টাকা? শুধু কেরানি কেন, অনেক পিয়নও গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে আছেন। কেরানি-পিয়নদের বিদেশেও বাড়ি আছে বলে বহুবার মিডিয়ায় খবর রটেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া আর কানাডা তাঁদের সেকেন্ড হোম বলে প্রকাশ। প্রশ্ন হলো: এমন কী জাদু তাঁরা জানেন যে, কেরানি আর পিয়নের চাকরি করে কোটি কোটি টাকা সুইজ ব্যাংকে জমান? মালয়েশিয়া বা কানাডায় বাড়ি বানাতে পারেন?
আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের আবজলের কথা জানি, তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। দেশে-বিদেশে অনেক বাড়ি। এখন সস্ত্রীক অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপদে অবস্থান করছেন। সেখানেও একাধিক গাড়ি হাঁকান বলে প্রকাশ।
ভারতের সরকারি অফিসে সাপ ছেড়ে দিয়ে ঘুষখোর অফিসারদের ঘায়েল করবার অভিনব ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে তা অবশ্য উল্লেখ করা হয়নি। তবে কৃষকদের বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়।
আমি একবার ভুপাল থেকে কলকাতা ফিরতে নাগপুর হয়ে আসছিলাম। ওখানে ট্রেন বদল করতে হয়েছিল। তাই থাকতে হয়েছিল কয়েক ঘণ্টা। হোটেলে খেতে গেলাম। সব হোটেলে নিরামিষ। জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী? মাছ-গোশত নেই কেন? সেদিন তামিল মুসলিমদের হোটেলেও একই অবস্থা। সব নিরামিষ। তাঁরা আমাকে জানান, সেদিন ছিল নাগপূর্ণিমা। এদিন নাগপুর অঞ্চলে মাছ-গোশত রান্না হয় না। নাগপুর অঞ্চলে নাগসম্প্রদায় নামে একটি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। তাঁরা বাড়িতে বিষধর সাপ পালেন। আমাদের দেশ-গ্রামে যেমন হাঁস-মুরগি পালন করা হয়, তেমনই নাগপুর অঞ্চলে নাগসম্প্রদায়ের লোকেরা বাড়িতে বিষধর সাপ পালেন। ঘুষখোর অফিসারদের অফিসে ক্ষুব্ধ কৃষকদের সাপ ছেড়ে দেবার ঘটনাটি হয়তো নাগপুর অঞ্চলেরই হবে।
আমি অবশ্য আমাদের ঘুষখোর অফিসারদের অফিসে সাপ ছেড়ে দেবার ভয়ঙ্কর কা- ঘটাতে পরামর্শ দিচ্ছি না। এছাড়া এখানে বিষধর সাপ পোষবার যেমন নিয়ম নেই, তেমনি কেউ পোষেনও না। তবে বেদে বা সাপুড়েদের কথা আলাদা। হ্যাঁ, শুনেছি, ওরাও নাকি বিষহীন সাপ নিয়ে বেড়ান এবং খেলা দেখান। আর এদের বিষহীন সাপ দেখেই মানুষ ভয় পেয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়েন। না, এমন বিষহীন সাপও কেউ কোনও অফিসে ছেড়ে দিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করবার চেষ্টা করবেন না। করলে সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগে আইনের কাছে সোপর্দ হতে পারেন।
আরেকটি তাজা খবর হচ্ছে: সিলেটের ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক ঢাকার ভূতের গলির বাসা থেকে নগদ ৮০ লাখ টাকাসহ হাতেনাতে আটক হয়েছেন। এগুলো কীসের টাকা তার কোনও সদুত্তর বণিকবাবু প্রথমে দিতে পারেননি দুদক টিমের কাছে। হ্যাঁ, বণিকবাবুরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থেকে এমন বাণিজ্যই তো করেন। মাত্রতো ৮০ লাখসমেত ধরা পড়েছেন। এটা একটা চালান মাত্র। আরও কতোবড় চালান তিনি পাচার করেছেন তার হিসেব কে দেবেন? এবং ভূতের অলিগলিতে থেকে আরও কতোশত চালান বাইরে পাঠিয়েছেন তার হিসেব বের করা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। নয় বাত কা বাতও। পার্থ গোপাল বণিকরা এখন অনেক ওপরে থাকেন। তাঁদের সংখ্যা যেমন বিপুল, ক্ষমতাও তেমনি বিশাল।
পরে অবশ্য পার্থ বণিক জানিয়েছেন, এগুলো তাঁর সারাজীবনের সঞ্চিত টাকা। এর মধ্যে ৩০ লাখ তাঁর শাশুড়ির দেয়া।
পার্থ বণিক জানান, ব্যাংকে তাঁর কোনও একাউন্ট নেই। হ্যাঁতো, দেশের ব্যাংকে একাউন্ট থাকবে কেন? সবতো বিদেশের ব্যাংকেই থাকে। এ চালানটাও নিশ্চয়ই যেতো। নিজের কথাতেই তিনি ধরা খাচ্ছেন। চোর যখন ধরা পড়ে তখন এমনই হয়। কী বুঝলেন কিছু?
রূপপুর বালিশকাহিনিতো এতোদিনে সবাই জেনে ফেলেছেন। সামান্য বালিশের দাম পড়েছে সাত-আট হাজার টাকা করে। লেপ-তোষকতো আরও বেশি। তবে সেগুলো সব পারমাণবিক লেপ-তোষক আর বালিশ কিনা তাই এতো মূল্যবান। সরকারি প্রতিষ্ঠান আর প্রকল্পের অর্থ কীভাবে মেরে দেয়া হয় তা রূপপুরের বালিশকাহিনিতেই গোটা জাতি জেনে গেছে।
ঘুষখোরদের শায়েস্তা করতে ভারতীয় নাগকৃষক সেজে অফিসে সাপ ছেড়ে দেয়া না হোক, বুনো ওল ঠাণ্ডা করতে দুদক এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনির সদস্যরা বাঘা তেঁতুলের ভূমিকা পালন করতেই পারেন। তবে বাছিরের মতো ভূমিকা নিলে বুনো এবং ঝুনো ওল মিজানদের ঠাণ্ডা করা মুশকিল বৈকি। অবশ্য বুনো ওল মিজান এবং বাঘা নয় ঝুনো তেঁতুল বাছির দুজনই ভেতরে অবস্থান করছেন। দেশের আইন-আদালত নিশ্চয়ই সত্য উদঘাটন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতেই পারি। ঘুষখোর বুনো ওল তথা দেশের অর্থ লোপাটকারীদের ঘাড় মটকে দেবার শক্ত ব্যবস্থা নিতেই হবে। তবে বাঘা তেঁতুল ছাড়া বুনো ওল ঠাণ্ডা করা মুশকিল। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের বনে-জঙ্গলে যেমন বুনো ওল জন্মায়, তেমনি বাঘা তেঁতুলও পাওয়া যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ