বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

লেখক সম্মানীর চেক ও ব্যাংক একাউন্ট

রহিমা আক্তার মৌ : অভ্রকে নিয়ে এসেছি আর্ট একাডেমীতে। অনেক মায়েরা বসে আছে এখানে। সবাই তাদের সন্তানকে নিয়ে এসেছে আর্ট শিখাতে। মায়েদের সাথে আমিও বসা। দুইপাশে দুই প্রিয় বান্ধবী। চলছে সব মায়েদের গল্প, কেউ শপিং এর গল্প, কেউ রান্নার গল্প আর কেউ বাচ্চাদের পড়ালেখার গল্প।
ব্যাগের ভেতর মোবাইলটা বেজে উঠলো, মোবাইল বের করে দেখি পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদকের কল। বই মেলার লিটলম্যাগ চত্বরে ঘুরে ঘুরে কিছু নতুন ম্যাগাজিন সংগ্রহ করি। যে পত্রিকা ভালো লেগেছে তাদের কল করেছি। ভালো মন্দ শেয়ার করেছি। এই সম্পাদকের একটা ম্যাগাজিন নিয়ে আসি, পড়ি, ভালো লাগছে বলে কল করি। তখনি তিনি পত্রিকায় লেখা পাঠাতে বলেন। ২/৩ টা লেখা পাঠিয়েছি। মোবাইলের ইয়েস বাটন চেপে কল ধরি।
হ্যালো রহিমা আক্তার মৌ বলছেন।
জ্বি, বলছি।
আচ্ছা আপনি যে নামে পত্রিকা লেখেন সে নামে কি ব্যাংক একাউন্ট আছে।
না ভাই, রহিমা আক্তার নামে আছে।
তার মানে মৌ নামটা একাউন্টে নেই।
ঠিক তাই।
ওকে সমস্যা নেই, নামের বানানটা একটু এসএমএস করে দিন।
ওকে, ধন্যবাদ।
কথা শেষ করে মোবাইল টিপে টিপে নামের বানানটা লিখে সেন্ট করি উনার নাম্বারে। মুখটা হাসি হাসি দেখে দুই বান্ধবী জিজ্ঞেস করে-
কি রে, এতো খুশি খুশি, ঘটনাটা কি?
মনে হচ্ছে খুশির খবর আছে, পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক কল করে একাউন্টের নাম জানতে চাইছে। নিশ্চই লেখার সম্মানী কিছু পাবো।
তাহলে খুশির খবরই। আমাদের মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।
আচ্ছা ঠিক আছে। আগে পাই, তারপর খাওয়াবো।
ওদের সাথে কথা বলতে বলতে হারিয়ে যাই সেই ২০১০ সালে। পত্রিকা থেকে পাওয়া প্রথম সম্মানীর চেকের টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম হোটেলে। ৩০টা পুরি, ৩০ পিছ জিলাপি আর ৩০ টা নিমকি কিনে সোজা এতিমখানায়। এখানে ২৫টা ছেলে বাচ্চা থাকে। গরম গরম জিলাপি পুরি আর নিমকি পেয়ে ওরা খুবই খুশি। ওদেরকে খাইয়ে দিয়ে বাসায় আসি। অন্যরকম এক আনন্দ সেদিন পেয়েছিলাম। নিজের উপার্জনের টাকা, নিজের লেখার সম্মানী দিয়ে কিছু করতে পেরে শান্তি অনুভব করি। অবশ্য এই জীবনে আমার প্রথম ইনকাম ছিলো ১৯৯২ সালে, সেদিন প্রথম মাইনে পেয়েছি তিনশ টাকা। যা হয়তো এখনকার বাজারে তিন হাজার টাকা হবে। সেদিন তিনশ টাকা দিয়ে কত কি কিনেছি। কতজনকে খুশি করেছি, সে শুধু আমিই জানি।
২০০৯ সাল থেকে পত্রিকায় লেখালেখি করি, কখনো নেশা বা পেশা হিসাবে নেওয়ার জন্যে লেখালেখি শুরু করিনি। অবসরকে কাজে লাগাতে, কিছু ভালো কাজ করতে, অন্য ভাবে বলতে গেলে আমার জীবনের টার্নিং এই লেখালেখি। পত্রিকার পাতায় প্রিন্ট অক্ষরে নিজের নাম দেখবো তাও কখনো ভাবিনি। প্রথম লেখা “নর না নারী” (কবিতা) প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক গ্রুপের ‘সাপ্তাহিক রোববার’ এ। এরপর আস্তে আস্তে চিঠিপত্রের কলামে লেখা শুরু করি। প্রথম চিঠিপত্রের লেখা প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’ এ। গল্প লিখতে শুরু করি। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় দৈনিক ভোরের কাগজের ‘পাঠক ফোরাম’ বিভাগে। তবে জীবনে প্রথম লেখা গল্প ‘চিরকুট’ আজো কোথাও প্রকাশিত হয়নি। লেখালেখি করতে এসে পরিচয় হয় রংপুরের লেখিকা সালমা সেতারার সাথে। আপার সাথে কথা হতো মাঝে মাঝে। একদিন কথা বলতে গিয়ে আপা আমায় বলেন-
“মৌ গল্প কবিতার পাশাপাশি তুমি ফিচার লেখো। গল্প, কবিতা চিরকাল তোমারই থাকবে। পাঠকের কাছাকাছি যেতে হলে তোমায় ফিচার লিখতে হবে। মৌলিক লেখা লিখিতে হবে।”
সালমা আপার কথাগুলো আজো কানে বাজে। আমি ফিচার লেখা শুরু করি। প্রথম ফিচার প্রকাশিত হয় দৈনিক জনকণ্ঠের ‘অপরাজিতা’ বিভাগে। এই ভাবেই জাতীয় পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আমার লেখালেখি। দ্বিতীয় গল্প আর ফিচার প্রকাশিত হয় বিশিষ্ট সিনিয়র সাংবাদিক  মরহুম আতাউস সামাদ স্যার এর সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক এখন’ পত্রিকায়। প্রথম কলাম প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদ পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পাতায়। প্রথম চিঠি প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা ‘মনোজগতে’। দ্বিতীয় চিঠি সাপ্তাহিক এ।
একদিন দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকার ‘অপরাজিতা’ বিভাগের সম্পাদক আপা কল করে বলেন-
রহিমা আক্তার বলছেন।
জ্বি।
আপনার একটা চেক আছে, অফিসে এসে নিয়ে যাবেন।
চেক আনতে অফিসে যাবো, এটা আমার দ্বারা হবে না। কারণ আমি অনেকটাই গৃহপালিত। বাচ্চাদের স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া নেই আমার। কিন্তু চেক আনবো কি করে। চেক দিয়ে কি করবো। আমার যে কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই।
আপাকে কল করে পরিচিত একজনের কথা বলে রাখি। তিনিই চেক নিয়ে আসবেন। চেকে টাকার পরিমান আমি নিজেও জানি। টাকার পরিমান বড় কথা নয়। লিখে সম্মানী পাচ্ছি এটাই আসল কথা। ভাবনা শুরু ব্যাংক একাউন্ট নিয়ে। আমার জাতীয় পরিচয় পত্রে নাম হলো রহিমা আহসান, কিন্তু চেক আসছে রহিমা আক্তার দিয়ে।
ব্যাংকে গেলাম, একাউন্ট খোলার কথা বললাম। ওরা ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখে আপত্তি জানায়। এরপর পরামর্শ দেয় ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে একটা পরিচয় পত্র আনতে, তা দিয়েই একাউন্ট খোলা যাবে। আমার মতো ব্যক্তি আবার কোথায় ওয়ার্ড কমিশনারকে খুঁজতে যাবো। যাই হোক খুঁজতে আমায় হবেই, প্রয়োজন আমার। খোঁজ খবর নিয়ে গেলাম উনার অফিসে। অফিস আমাদের এলাকায়ই ছিলো। কমিশনারের নিকট থেকে পরিচয় পত্র কেনো প্রয়োজন জানতে চাইলে উনাকে বিস্তারিত বলতে হয়।
ছবি আর কাগজপত্র নিয়ে ব্যাংকে একাউন্ট খুললাম। খুব সুন্দর একটা নাম্বার পাই আমি। নাম্বারটা দিতে গিয়ে ব্যাংকের আপা বলেন-
“ম্যাডাম আপনার একাউন্ট নাম্বারটা খুবই সুন্দর,  মনে রাখতে পারবেন সব সময়।”
কয়েকদিনের মাঝে চেক নিয়ে আসে পরিচিত সে লোক। মাত্র এই চেকটা জমা দিবো, কেমন জানি লাগে। অনেক সঞ্চয়ের এক হাজার টাকা ছিলো আমার কাছে। সঞ্চয় বলতে রিকসা ভাড়া বাঁচানোর টাকা। মেয়েদের স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে হেঁটে আসতাম। আবার ওদের আনতে যাবার সময় হেটে যেতাম। একবার হেঁটে গেলে দশ টাকা জমা হতো। এক হাজার টাকা জমা করতে আমাকে একশ’ বার হাঁটতে হয়েছে। দুই সন্তানের জন্যে প্রতিদিন আশি টাকা রিকসা ভাড়া দিতে হতো। প্রতিদিন দুই তিন বারের পথ হাটতাম, তাহলে ২০/৩০ টাকা জমা হতো। লেখা পাঠানোর জন্যে তিন টাকা করে হলুদ খাম কিনে তাতে পাঠাতাম। আমি কাগজে লিখতাম, সে লেখা ফটোকপি করে পত্রিকার অফিসে পাঠাতাম। আসল কপি নিজের জমা রাখতাম শাড়ীর ভাঁজে ভাঁজে। একটা হলুদ খামে দুইটা পেইজ পাঠানো যেতো। পেইজ বেশি হলে ডাক অফিসের লোকেরা ক্যা ক্যা করতো। তখন খয়েরি রংয়ের খাম একটাকায় কিনে ভেতরে ৪/৫ টা পেইজ করে ভরে ১০/১২ টাকায় পাঠাতাম।
খুলে গেলো আমার ব্যাংক একাউন্ট। ২০১০ সালের জুন/জুলাই থেকে কলাম লিখতে শুরু করি দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকায়। ২০১১ সাল প্রতি রবিবারে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে আমার কলাম। কিন্তু কোন সম্মানী পাইনি। আসলে লেখা প্রকাশিত হচ্ছে সেই আনন্দেই আমি আত্মহারা। লেখা প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক। কোন কোন দিন একই সাথে ৩/৪ টা জাতীয় দৈনিকে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। শুরু করি দিবস নিয়ে লেখা।
২০১৫ সালের শুধু মাত্র মে মাসে সাপ্তাহিক, মাসিক, দৈনিক পত্রিকা মিলে ৩৭/৩৮ টা লেখা প্রকাশিত হয়। ঘুম নেই চোখে, সংসারের দায়িত্বের পরে প্রেম ভালোবাসা সবই হয়ে উঠে আমার লেখাপড়া। মায়ের ফাঁকিবাজ মেয়েটা এখন পড়ালেখা নিয়েই থাকে। এই পর্যন্ত যে সব পত্রিকায় ম্যাগাজিনে লিখেছি তার একটা লিস্ট করেছি।
লেখক সম্মানী পাই দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা থেকে। সে টাকা ও এতিমখানায় খাইয়ে দিই। ২০১৪/১৫ সাল পুরো ২৪ মাসে ২৪ টা প্রবন্ধ লিখি ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর ‘অগ্রপথিক’ পত্রিকায়। ৩/৪ মাসের লেখক সম্মানী একসাথে পেতাম। উনারা চেক নয়, নগদে দিতেন। এখান থেকেও কিছু টাকার নাস্তা খাইয়েছি ওদের। সম্মানী পাই দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা থেকে। সাপ্তাহিক রোববার ম্যাগাজিনে অনেক লিখি।  সম্মানীর কথা উঠলে উনারা বলেন-
অফিসে আসেন, হিসাব করি। সম্মানী নিয়ে যান। আমি কখনোই পত্রিকার অফিসে যাইনি। সম্মানী আর পাইনি। সম্মানী পেয়েছি নয়াদিগন্ত পত্রিকা থেকে। বিভাগীয় সম্পাদক আপা বিকাশ নাম্বারে সম্মানী বিকাশ করে দিয়েছেন। এখনো মাঝে মাঝেই দেন।
অনেক লিখেছি পত্রিকায়, এখন ভেবে চিন্তে লিখছি। এমন কিছু লিখতে চাই, যা আমার অবর্তমানে আমাকে মনে রাখবে। একশ’ নারী লেখিকাদের নিয়ে একশ’ প্রবন্ধের কাজ হাতে নিয়েছি। এই লিস্টে থাকবেন চন্দ্রাবতী থেকে শুরু করে আজকের সিনিয়াররা। মাঝে মাঝে সেগুলো পত্রিকায় দিচ্ছি, প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ লেখা চাইলে তখন দিই।
মোবাইলে পত্রিকা দেখতে শিখেছি ২০১৬ সালে। এর আগে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আসার পথে পত্রিকার দোকানে যেতাম। ছুটির দিনে যে কোন বায়না ধরে বের হতাম পত্রিকা দেখার জন্যে। লেখা দেখলেই পত্রিকা কিনতাম। পুরো পত্রিকা বা ম্যাগাজিন রাখার জায়গা নেই। তাই নিজের লেখার অংশ কেটে উপরে দিন তারিখ আর পত্রিকার নাম লিখে ফাইল করে রেখে দিতাম। ৫০ শব্দের লেখা প্রকাশিত হওয়ায় ২০০৯ সালে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ কিনেছি ৮০/৮৫ টাকায়। আজ ২০১৯ সালে ২/৩ হাজার শব্দের লেখা প্রকাশিত হলেও পত্রিকা কিনি না। ই পেপার টা সংগ্রহ করে রাখি।
জানিনা কত টাকার চেক আসবে আজকের এই কলে, আদৌ আসবে কিনা। কিন্তু আমি খুশি। সাফল্য পেয়েছি আমার। এখন কাগজে লিখি না, মোবাইলে লিখি, ইমেইল করি। লেখা চলে যায় পত্রিকার ইমেইলে ইমেইলে। তবে আমি অনেক কাজই জানিনা। যা জানি, তা পুরোটাই করতে চেষ্টা করি। লেখাটা লিখতে কয়েকবার আবেগি হয়ে পড়ি, তবুও থেমে যাইনি। আমি জানি সত্যের জয় হয়, আমার জয় হবে ততদিন, যতদিন আমি সত্যের পথেই থাকবো।
লেখক : সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
rbabygolpo710@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ