শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খুলনায় গুজব আতঙ্ক

খুলনা অফিস : ‘ছেলেধরা’ ও ‘গলা কাটা’ গুজব ছড়িয়ে পড়েছে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ছেলেধরা সন্দেহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে কয়েকজনকে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। হত্যাও করা হয়েছে কয়েকজনকে। এদিকে, ‘ছেলেধরা’ ও ‘গলা কাটা’ গুজবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে শিশু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এমনকি অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয়ও পাচ্ছেন।
তবে পুলিশ বলছে, কতিপয় ব্যক্তি গত কয়েকদিন ধরে খুলনাতেও ছেলেধরা গুজব ছড়াচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের কোনও ঘটনার প্রমাণ তারা পাননি। বিষয়টি কেবলই গুজব। এ ধরনের গুজব দূর করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রচারণার পাশাপাশি জুম্মার নামাজে মসজিদে গিয়েও মুসল্লিদের উদ্দেশে সচেতনতামূলক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে।
সূত্র মতে, পদ্মা সেতুতে একশ মাথা লাগবে-এ ধরনের গুজব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে জেলা শহর বা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে চা দোকান থেকে শুরু করে লোকসমাগম স্থানে ব্যাপক গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সরব আলোচনা চলে। কেউবা বলছে- ঘটনা সত্য, আবার কেউবা বলছে- গুজব।
খুলনা মহানগরীর বাস্তুহারা এলাকার বাসিন্দা অভিভাবক মো. সামসুল আলম বলেন, তার তিন সন্তান স্কুলে লেখাপড়া করে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ‘ছেলেধরা’ ও ‘গলা কাটা’ গুজব শুনে বাচ্চাদের একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছি। বাধ্য হয়ে তাদের স্কুল থেকে আনা নেয়া করতে হচ্ছে।
অপর অভিভাবক শেখ নাজমুল হক বলেন, এমন ঘটনার কোনও তথ্য-প্রমাণ দেখা যায়নি। তবে, কীভাবে, কী উদ্দেশে এ ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খতিয়ে দেখতে হবে।
এদিকে জেলা শহর বা উপজেলার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যেও ‘ছেলেধরা’ ও ‘গলা কাটা’ আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে, তারা কেউই এ ধরনের ঘটনা সরাসরি দেখেননি। লোকজনের মুখে শুনেছেন।
নগরীর আড়ংঘাটা থানার ওসি (তদন্ত) দেবাশীষ রায় বলেন, কোনও কুচক্রী মহল এসব গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যস্ত রেখে অন্য কোনও অপরাধ সংঘটিত করার পাঁয়তারা করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া গলা কেটে নিয়ে যাওয়া কিংবা ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বিদ্যালয় কিংবা কোচিংয়ে পাঠিয়ে বাসাবাড়িতে চুরি বা ডাকাতি করার অভিসন্ধিও থাকতে পারে।
এদিকে, খুলনায় ছেলেধরা আতঙ্ক ও গুজব প্রতিরোধে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ছেলেধরা সন্দেহে কোনো মানুষকে যেন সাধারণ পথচারি বা এলাকাবাসী শারীরিক নির্যাতন না করে সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশ কর্মকর্তাদের মতবিনিময়, খুলনা জেলা ও মহানগরে পুলিশের সচেতনতামূলক মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও দেওয়ালে পোস্টার লাগানো অন্যতম। এছাড়া জুম্মার দিন পুলিশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন মসজিদে গিয়েও মুসল্লিদের সচেতন করছেন এ বিষয়ে।
অপরদিকে, ‘ছেলেধরা’ গুজবের বিষয়ে সচেতনতার লক্ষ্যে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি দপ্তর থেকে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় কন্ট্রোল রুমের নম্বর দেয়া হয়েছে। যাতে করে এ ধরনের ঘটনা নজরে পড়লে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের কন্ট্রোলরুমে সাধারণ মানুষ তথ্য প্রদান করতে পারে। লিফলেটে বলা হয়েছে, গুজবের কারণে গণপিটুনির নামে কোনো মানুষকে হত্যা করা দ-নীয় অপরাধ। এ সকল অপরাধ থেকে দূরে থাকতে সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারী দেয়া হয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সরদার রকিবুল ইসলাম বলেন, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলে ধরা আতঙ্ক ও গুজব ছড়াচ্ছে। আমরা সে সকল বিষয়ে গোয়ন্দা নজরদারি রেখেছি। তাছাড়া সাধারণ মানুষ যাতে ছেলেধরা সন্দেহে কোনো মানুষকে মারপিট না করে সেই আহ্বান জানানো হচ্ছে। কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহ হলে নিকটস্থ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করেন তিনি। শুক্রবার তিনি নিজে নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া বড়খাল পাড়স্থ আল-আমিন জামে মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের উদ্দেশে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ বলেন, বর্তমান সমাজে সাধারণ মানুষ গুজবে বিশ্বাস করে তা অকল্পনীয়। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে থানা, ফাঁড়ি পুলিশসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয় সে বিষয়ে সকলকে সজাগ থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ