শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সুন্দরবনে তিন বছরে বাঘ বৃদ্ধি আটটি!

সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার

খুলনা অফিস : সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে গত তিন বছরে বাঘের সংখ্যা ১০৬ থেকে বেড়ে ১১৪ হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরে বাঘ বেড়েছে আটটি। সর্বশেষ বাঘ জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জরিপটি করা হয়। বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ ও চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য কমায় বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনকে বন্যপ্রাণীদের জন্য নিরাপদ করা গেলে দ্রুত বাঘের সংখ্যা বাড়বে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ঝড়, বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় বনাঞ্চলের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অথচ নির্বিচারে বনভূমি উজাড় হওয়ায় উদ্ভিদ বৈচিত্র আজ বিলুপ্তির পথে। প্রাণি বৈচিত্রও আজ হুমকির সম্মুখীন। বনখেকোদের নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে সুন্দরবন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুধু তাই নয়, সব আইন-কানুন উপেক্ষা করে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ ও হরিণসহ নানা প্রজাতির পশুপাখি। প্রতিকুল পরিবেশে বর্তমানে সুন্দরবনে বেঁচে থাকা বাঘ ও সীমিত সংখ্যক পশুপাখির জন্য আবাসস্থলের অভাব ও প্রবল খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনের তিন দিকে থাকা ঘনবসতিও বাঘের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। সুন্দরবনে বাঘের জীবনযাপনে নানা প্রতিকুল পরিবেশের পাশাপাশি সাগরে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মিষ্টি পানি পানে অভ্যস্ত বাঘসহ অন্যান্য প্রাণি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই অকালে মারা যাচ্ছে। এছাড়া ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বন্যপ্রাণি হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। তবে স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে বাঘ হত্যার ঘটনাই বেশি ঘটছে। সুন্দরবনে বনদস্যু ও পশু শিকারিদের উপদ্রব বাঘের অবাধ বিচরণ ও পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি নিরাপদ বংশবিস্তারের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণি ও পাখি শিকার নিষিদ্ধ হলেও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় হরহামেশা বাঘের চামড়া, হরিণের গোশত, এমনকি বিরল প্রজাতির নানা ধরনের পাখি শিকার হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের জন্য চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম থেমে নেই। এর ফলে সুন্দরবনে বাঘের নির্বিঘেœ বেঁচে থাকা মারাত্মক হুমকি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘকাল ধরে চোরাশিকারিরা সুকৌশলে হত্যার পর বাঘের চামড়া, গোশত, হাড়, দাঁত ও চর্বি উচ্চমূল্যে বিক্রি করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের উন্মত্ত নেশায় মেতে উঠেছে। একেকটি বাঘের চামড়া প্রায় পাঁচ লাখ ও প্রতি কেজি হাড় দু’লাখ টাকায় বিক্রি হতে শোনা যায়, যা বিদেশে আরও উচ্চমূল্যে চোরাচালান করা হয়।
বাঘ রক্ষায় যেমন সুন্দরবন অত্যাবশ্যক, তেমনি সুন্দরবন রক্ষায়ও বাঘের প্রয়োজন। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষও বাঘের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন বিলুপ্ত হয়ে গেলে গোটা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের আশঙ্কা। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রচন্ড ক্ষতির সম্মুখীন হবে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের সুন্দরবন বলেও উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
সুন্দরবন বিভাগের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি। ১৯৮২ সালে জরিপে ৪২৫টি এবং ১৯৮৪ সালে অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরপি চালিয়ে ৪৩০-৪৫০টি বাঘ থাকার কথা জানানো হয়। ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি, ১৯৯৩ সালে সুন্দরবনের ৩৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্যাগমার্ক পদ্ধতিতে জরিপ চালিয়ে ৩৬২টি বাঘ থাকার কথা জানা যায়। ২০০৪ সালে জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। ওই সময়ে বাঘের পায়ের ছাপ গণনা করে জরিপ করা হতো। ২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে দাঁড়ায় ১০৬টিতে। হঠাৎ করে বাঘের সংখ্যা ৪০০ থেকে ১০৬ হওয়ায় ব্যাপক আলোচনায় আসে বিষয়টি। চলতি বছরের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপ অনুযায়ী, বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১১৪টি হয়েছে।
২০০১-২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫০ বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১০টি। ১৪টি বাঘ পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয়রা। ২০০৭ সালে একটি মারা যায় সিডরে। বাকি ২৫ বাঘ হত্যা করেছে চোরা শিকারিরা।
বাগেরহাটের শরণখোলায় কমিউনিটি পেট্রোল গ্রুপের সদস্য রাসেল আহম্মেদ বলেন, ‘লোকালয়ে আসা বাঘ নিরাপদে ফেরাতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছে। যার ফলে এখন আর মানুষ বাঘ পিটিয়ে মারে না।’
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বনদস্যুদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে বাঘ। তারা বাঘ শিকার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করে থাকে। সুন্দরবনের পাশে যেকোনও ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে।’
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ এবং শিকারিদের দৌরাত্ম্য কম হওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়েছে। বাঘের অবাধ চলাচলের জন্য সুন্দরবনের অর্ধেকেরও বেশি এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল ফাঁড়ি। পাশাপাশি চোরা শিকারিদের তৎপরতা বন্ধে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং চালু করা হয়েছে। বাঘের প্রজনন মওসুম জুন-আগস্ট এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটকদের আসা বন্ধ করতে যাচ্ছে বন বিভাগ। এতে প্রজনন, বংশ বৃদ্ধিসহ বাঘ অবাধ চলাচল করতে পারবে। সুন্দরবনকে বন্যপ্রাণীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে কাজ করছে বন বিভাগ।
এ ব্যাপারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার তালুকদার বলেন, ‘বর্তমান সরকার বাঘের সংখ্যা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করা হয়েছে। যার সুফল কিন্তু দেখা যাচ্ছে। তিন বছরে ৮টি বাঘ বেড়েছে। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ