রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মায়েদের অলস সময়

সুপ্রভ চৌধূরী নিপু : ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই আমি টিউশনি করাই। যার সুবাদে টাকা-পয়সার পাশাপাশি কিছুটা অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। যার ফল আজকের এই লেখাটি। বাচ্চার লেখাপড়ার ব্যাপারে মায়েদের সাথেই বেশি কথা হতো, সে জন্যই মায়েদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা একটু বেশিই। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সব ধরনের পরিবারেই পড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে। প্রতিদিন পড়াতে যাওয়ার সুবাদে তাদের প্রতিদিনকার লাইফস্টাইল সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা হয়েছে। মূলত লেখাটি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মায়েদের সম্পর্কে। আর পুরো লেখাটাই আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা থেকে লেখা।
একটা জিনিস কি কখনও খেয়াল করেছেন? আজকের দিনে মায়েদের কাছে একটি জিনিস প্রচুর পরিমাণে আছে। সেটা হচ্ছে, সময়। আপনি যদি ভাল করে খোঁজ নেন তাহলেই বুঝবেন অধিকাংশ বাড়িতেই একটি-দুইটা করে কাজের লোক আছেই। তারাই সকালের নাস্তা বানিয়ে দিচ্ছে, বাসন মেজে দিচ্ছে, কাপড় ধুয়ে দিচ্ছে, ছাদে কাপড় মেলে দিয়ে আসছে, তরকারি কেটে দিচ্ছে, বাটনা বেটে দিচ্ছে ইত্যাদি আরও ছোট বড় অনেক কাজ করে দিচ্ছে।
তার উপর আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন: ফ্রিজ, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন মায়েদের জীবন করে তুলেছে আরও সহজ। মায়েরা এখন প্রাইভেট কারে(উচ্চবিত্তের ক্ষেত্রে) বা রিকশা(মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে) ছাড়া এক পাও চলতে পারে না। গড়ে হিসাব করলে শুধু রান্নাটা ছাড়া আর কিছুই করতে হয় না মায়েদের। কারণ তারা আবার কাজের লোকের হাতের রান্না খায় না।
অনেকেই বলবেন দুই একজন কাজের লোক থাকা তো ভাল, মায়েদের কাজে একটু সাহায্য হয়, কাজের গতি বাড়ে। হ্যাঁ, আমিও সেটাই মনে করতাম, যদি না আমার চোখে এই পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক, ইতিবাচক দিকের থেকে বেশি হতো।
আমার এই দু’বছরের অভিজ্ঞতাই যা দেখছি তা হল মায়েদের জীবনে এখন প্রচুর অলস সময়। বাসার কাজের লোক, আধুনিক যন্ত্রপাতির কারণে মায়েদের কাছে অনেক অলস সময় থাকে। আচ্ছা এই সময়টা মায়েরা কি করে? কখনও ভেবে দেখেছেন? আমার চোখে যেটা ধরা পড়েছে, তা হলো-
প্রথমত, মায়েদের এই অলস সময় কাটানোর প্রধান জায়গা হল তাদের বাচ্চাদের স্কুল। সকালে একটু স্কুলের সামনে গেলেই বুঝতে পারবেন। বাচ্চাকে স্কুলে দিতে গিয়ে মায়েরা বসে যাই গল্পের ঝুলি নিয়ে। কে কি রান্না করেছে, কার স্বামী কত বাজার করেছে, কার ফ্রিজের কি অবস্থা, কে কোন শাড়ি কোথা থেকে কিনেছে, কার শাড়ির কাপড় ভাল, কার শাড়ির কাপড় খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি। যা লিখে বা বোলে শেষ করা যাবে না। আমি এমনও দেখাছি যে,গল্প করতে করতে মায়ের খেয়ালই নেই যে বাচ্চা পরীক্ষা দিতে চলে গিয়েছে আর বাচ্চার পেন্সিল বক্স মায়ের হাতের রয়ে গিয়েছে। বাচ্চা যখন ফিরে এসেছে তখন মায়ের খেয়াল হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই অলস সময় কাটানোর আরেকটি উপায় হল পাশের বাসার ভাবির সাথে আড্ডা মারা। সকালে স্কুলে সময় কাটানোর পর বিকেল থেকে সন্ধ্যার অনেকটা সময় কাটে পাশের বাসার  ভাবির সাথে গল্প করে। আর এই গল্পের মূল আকর্ষণেই থাকে হিন্দি সিরিয়াল, বাচ্চার লেখাপড়ার তুলনা। আর সেই গল্পের কিছু প্রভাব আমার উপরেও এসে পড়ে। আমি প্রায়ই এটা খেয়াল করতাম যে বাচ্চার মায়েরা যতটা তাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, তার থেকে বেশি চিন্তিত তার পাশের বাসার ছেলে-মেয়েদের থেকে যেন তার ছেলে-মেয়ে এগিয়ে থাকে। যদিও মায়েরা ছেলে-মেয়ের লেখা পড়ার ভার আমার উপর দিয়েই খালাস, তারা কোনদিন বাচ্চাদের বাসাই পড়াতে বসাত না। কিন্তু তুলনা করার সময় সরাসরি এ-প্লাস এর সাথে তুলনা করতো। আর পড়াবেই বা কোন সময়, যখন পড়ার সময় তখন মায়েরা একে অন্যের সাথে আড্ডাই ব্যস্ত। এর ফলে সংসারে যেমন অশান্তি বাড়ে তেমনি বাচচাদের লেখাপড়ারও ক্ষতি হয়।
সময় কাটানোর তৃতীয় কারণটি আমার কাছে খুবি বিপদজনক লেগেছে। সেটা হলো ভিনদেশী সিরিয়াল, এড, মুভি,নাটক দেখে সময় কাটাঁনো। আর একে বিপদজনক বলার কারণ হলো, ভিনদেশী সিরিয়াল দেখার প্রবণতা এমন ভাবে বেড়ে চলেছে যে, তার প্রভাব পড়ছে মায়েদের পোশাক-আশাক, কথা-বার্তা, চাল-চলনের উপর এমন কি সাংসারিক জীবনেও। মায়েরা ভিনদেশী সিরিয়াল দেখতে দেখতে সেগুলো এখন অনুকরণ করা শুরু করেছে। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা আমার খুব মনে পড়ছে, সেটা হল- একবার এক বাচ্চার মা এমন একটি পোশাক পরে আমার সামনে এসেছিল যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটুর, সে বিব্রত না হলেও আমি কিছুটা বিব্রত হয়েছিলাম। যদিও অনেক দেশেই ঐ ধরনের পোশাক কোন ব্যাপারই না কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে তা এখনও মেনে নেয়া যায় না। আর যেহেতু বাচ্চার শিক্ষার প্রথম ধাপটা শুরুই হয় মায়ের কাছ থেকে তাই এই ভিনদেশী সংস্কৃতির প্রভাব বাচ্চাদের উপরেও যে পরছে না তা আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না। ছোট ছোট বাচ্চারাও আজ হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করে। কারণ মায়ের কোলে থাকতেই যতটা না সে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়েছে তার থেকে বেশি বিদেশী সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়েছে।
এবার আসি এই যে মায়েদের কাজ না করা বা অলস জীবন-যাপন তার ফলাফলের দিকে। 
প্রথম যেটা আমার নজরে এসেছে সেটা হল মায়েদের স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আমি মনে করি, এখন এটা আর কোন ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নয়, এটা একটা জাতীয় সমস্যাই পরিণত হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিটা পরিবারেই এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমরা সবাই মোটামুটি জানি যে, ঘরের কাজ একপ্রকার শারীরিক ব্যায়াম। এই  ব্যায়াম বিভিন্ন রোগ থেকে আমাদের শরীরকে দূরে রাখে। যেমনঃ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্ত চাপ, কোমরে ব্যথা, দুর্বলতা ইত্যাদি। কিন্তু এখনকার মায়েরা এগুলো থেকে অনেক টা দূরে সরে গেছে। আর এই শারীরিক ব্যায়াম না করার কারণে এই রোগগুলো হয়ে উঠছে মায়েদের নিত্য সঙ্গী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চারাও জন্ম নিচ্ছে ঐসব রোগ নিয়ে। এখন প্রায় শুনি দুদিন আগে জন্ম নেয়া শিশুটির ডায়াবেটিস আছে, কিন্তু কোথা থেকে বাচ্চাটির শরীরে আসলো এই রোগ? উত্তরটা হলো মায়ের বা বাবার শরীর থেকে। এই শিশুটিকে সারা জীবন এই রোগটি বয়ে বেড়াতে হবে, যেখানে বাচ্চাটির কোন দোষই ছিল না। এর থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে যে মায়েরা যে শুধু নিজেদের ক্ষতি করছে শুধু তাই নই বরং নিজের সাথে সাথে বাচ্চার ভবিষ্যৎটাও নষ্ট করে দিচ্ছে।
এটা ছাড়াও আরও একটি বড় ব্যাপার আমার চোখে পড়েছে যে, দিন দিন অতিরিক্ত ওজনের শিশু জন্মের হার বাড়ছে। কারণ এখন কার মায়েরা প্রেগনেন্সির সময়টাতে এতো বেশি সচেতন হয়ে যায় যে সব রকম কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আপনি খেয়াল করে দেখবেন ডাক্তার সবসময় প্রেগনেন্সির সময়টাতে ভারি কাজ করতে বারন করে, কিন্তু কখনই এটা বলে না যে একেবারেই কাজ করবেন না। কিন্তু অতি সচেতন মায়েরা কাজ করাই বন্ধ করে দেয়।
তার উপরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়তি যত্ন, বিশেষ করে মেয়ের মায়ের। মেয়ের বাচ্চা হবে, আপেল, আঙ্গুর, নাশপাতি, বেদানা, কমলা, হরলিক্স, শাক-সবজি ইত্যাদি আরো অনেক পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে শুরু করে। এর ফলে মায়েদের শরীরে হঠাৎ করে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি বা শক্তি মজুদ হতে থাকে, যা প্রয়োজনের তুলনাই অনেক বেশি। যেহেতু অতি সচেতন মায়েরা প্রেগনেন্সিতে একেবারেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়, সেহেতু তাদের শরীরের হঠাৎ আগত প্রচুর পরিমাণের পুষ্টি বা শক্তি ব্যয় হয় না। সেই পুষ্টি বা শক্তি গিয়ে জমা হয় মা এবং বাচ্চার শরীরে। ফলে বাচ্চার ওজন প্রয়োজনের তুলনাই বেশি হয়ে যায়।  কিন্তু মায়েরা এই দিকটা খেয়ালি করে না। আর এই ভুলের মাশুল যে শুধু মাকেই দিতে হয় তা না, দিতে হয় বাচ্চাকেও। অতিরিক্ত ওজন হওয়ায় বাচ্চাটি ঠিক মত খেলাধূলা করতে পারে না এবং শরীরে বিভিন্ন রোগের জন্ম হয়। এভাবে চলতে থাকলে আগামি দশ-বার বছর পর কোনো সুস্থ শিশু এদেশে জন্ম নেবে কিনা তা নিয়ে একটা গবেষণা করা যেতে পারে। পরিশেষে এটাই বলব, আমি ছোট মানুষ, অনেক কিছুই বুঝিনা না বা বুঝলেও বলতে পারি না বা কেউ শোনে না, তবুও মায়েদের প্রতি একটা অনুরোধ একটু কাজ করুন, শরীরটাকে একটু খাটান, একটু ব্যায়াম করুন। তা না হলে  গাড়ির পার্টসে যেমন মরিচা ধরে যায়, ঠিক তেমনি মায়েদের শরীরেও রোগে শোকে ধরে যায়।
দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝুন, একবার দাঁত পড়ে গেলে আর কিছুই করার থাকবে না। এরকম আর দশ-বার বছর চলতে থাকলে আমাদের দেশ একটা পঙ্গু জাতিতে পরিণত হবে। যাদের দিয়ে বড় কোন কাজ সিদ্ধি করা সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ