শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

তরল দুধে গরল ঢালেন কে?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : দুধ একটি পুষ্টিকর খাবার। দুধকে পরিপূর্ণ খাবার বলে অভিহিত করা হতো এক সময়। শিশু, বুড়ো, রোগী সবারই প্রয়োজন এ খাবারটির। দুধ মানুষ এমনই খায়। আবার এদিয়ে বিভিন্ন উপাদেয় খাবারও প্রস্তুত হয়। ক্ষীর, পায়েস, রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, রসমালাই, সরমালাই, মোহনভোগ, নানান পদের মিষ্টান্ন। এসবের প্রধান উপাদানই হচ্ছে দুধ। বাঙালির আরেকটি প্রিয় খাবার দইও তৈরি হয় দুধ থেকে। কিন্তু একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাবারটি বিষাক্ত করে ফেলেছেন। বিশেষত তরল দুধ এখন এক আতঙ্কের নাম।
প্রাণের দুধে জীবন্ত ট্যাংরা মাছ পাওয়া যায় বলে গতবছর ৬ অক্টোবর যুগান্তর অনলাইন সংস্করণ রিপোর্ট করে। এতে বলা হয়: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুরে প্রাণের ভেজাল দুধের মধ্যে জীবন্ত ট্যাংরা মাছ পাওয়া যায়। কৃষক পর্যায়ে সস্তায় দুধ কিনে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে গিয়ে ভেজাল আর অন্যায়ের আশ্রয় নেয় প্রাণ ডেইরি। সিরাজগঞ্জে কোম্পানিটির জন্য সংগ্রহ করা তরল দুধে নোংরা পানি মেশানোর প্রমাণ পায় প্রশাসন। দুধ পরীক্ষার সময় তাতে জীবন্ত মাছও মেলে। এসব অপরাধ চক্রের হোতা আটকের পর ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করেছিল উপজেলা প্রশাসন।
উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুজ্জামান জানান, দুধে ভেজাল দেয়ার খবরে উপজেলার দহকুলা নদীর ঘাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়।
এ সময় সেখানে নৌকায় বহন করা ৮ মণ দুধের মধ্যে প্রতি ৪০ লিটার দুধের পাত্রে প্রায় ৮ লিটার করে নদীর পানি মিশিয়েছিলেন রায়গঞ্জের ঘুরকা বেলতলার দুধব্যবসায়ী আব্দুল মোতালেব।
এ সময় তাঁকে হাতেনাতে আটক করে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রকাশ্যে ভেজাল দুধ ফেলে দেবার সময় দুধের ভেতর থেকে জীবন্ত টেংরা মাছও বেরিয়ে আসে।
উল্লেখ্য, সিরাজগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে দুধ ব্যবসায়ীদের ভেজালের কারবার ওপেন সিক্রেট। ৪০ লিটার দুধে ৮ লিটার মিশ্রণ দেয়া হয়। সেই মিশ্রণ তৈরি করা হয় নদীর পানির সঙ্গে খাবার সোডা সহকারে।
প্রশাসনের আকস্মিক অভিযানে সেদিন এ চক্রের অন্যতম হোতা মোতালেব আটক হন হাতেনাতে। তাঁর জবানবন্দিতে জানা যায়, ভেজাল দুধের গন্তব্য।
আব্দুল মোতালেব জানান, প্রাণ কোম্পানিতে দুধ দিয়ে আসেন তিনি। কোম্পানির লোকেরা লিটার হিসেবে কিনে নেন। তাঁরা এ দুধ দিয়ে পাউডার করে। ছানা কাটেন। প্রতি লিটারে দাম দেন ৩৫ টাকা।
উপজেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক ও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর এসএম শহিদুল ইসলাম রন্টু, উল্লাপাড়া থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকীসহ পুলিশ সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন।
উল্লাপাড়া থানার এসআই নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, আটক মোতালেব স্বীকার করেন যে, তাঁরা দুধে নদীর পানি মিশিয়েছেন। এ দুধ প্রাণ কোম্পানিসহ বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়।
প্রশাসনের নজরদারি আর কঠোর অভিযানেও এদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত কৌশল আর অবস্থান পাল্টে অভিনব সব প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে সিন্ডিকেট।
কোম্পানির অতি মুনাফার যোগানদার এই সিন্ডিকেট সদস্যরা এতটাই বেপরোয়া যে, খালবিলের উন্মুক্ত পানি দুধে মিশিয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়। তাই প্রাণের জন্য রাখা দুধে মিলছে ময়লা, আবর্জনা এমনকি জীবন্ত মাছও।
নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক কর্মকর্তা এস এম শহিদুল ইসলাম রিন্টু জানান, যখন দুধ ঢেলে ফেলে দেয়া হয় তখন একটা ক্যান থেকে তাজা ট্যাংরা মাছ বেরোয়।
এছাড়া নদীর পানিতে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থাকে এবং দুধে এটি দ্রুত বাড়ে তাই এমন দুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অভিযোগের বিষয়ে জানতে গেলে শীতলীকরণ কেন্দ্রে দায়িত্বরত কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান জানান, বিষয়টি  খতিয়ে দেখা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ যাতে বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে, প্রাণের বিরুদ্ধে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজালের অভিযোগ পুরনো। সবশেষ গতবছর এপ্রিলে শীতলীকরণ কেন্দ্রে ল্যাব সুবিধা না থাকায় এবং ভেজাল দুধ কেনার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রাণ ডেইরিকে জরিমানা করে। এই হচ্ছে প্রাণ দুধের ভেজালকাহিনী। প্রাণের এ দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যই ভোক্তাদের খাওয়ানো হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার গ্রামাঞ্চল থেকে বিভিন্ন কোম্পানির সংগৃহীত দুধেও একইভাবে পানি এবং সোডা মেশানো হয় এমন দৃশ্য সাধারণ মানুষও প্রত্যক্ষ করেছে।
প্রকৃত অর্থে পরিপূর্ণ খাদ্য হিসেবে পরিচিত দুধ এখন গরল বা বিষে পরিণত করেছে এক শ্রেণির অতিলোভী ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানির তরল দুধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে আছে বিভিন্নরকমের এন্টিবায়োটিক, ব্যাকটেরিয়া, সিসা এবং ডিটারজেন্টসহ আরও মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থ। মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য দুধে কীভাবে এসব এন্টিবায়োটিকসহ ক্ষতিকর পদার্থ এলো তা উৎপাদক বা প্রক্রিয়াজাতকারি কোম্পানিগুলো বলছে না। বরং যার তত্ত্বাবধানে এ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে সেই প্রফেসর ফারুক সাহেবকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তবে আদালত ভোক্তা অধিকারের পক্ষে যুগান্তকারী অবস্থান নেয়ায় জনগণের মাঝে আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে।
উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশে অধিকতর পরীক্ষায়ও ১৪ কোম্পানির ১১টি নমুনার পাস্তুরিত দুধে এন্টিবায়োটিক ও ব্যাকটেরিয়াসহ ক্ষতিকর পদার্থ এমনকি প্রাণির মল পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তার মানে পাস্তুরিত দুধ নিয়ে অধ্যাপক ফারুকের রিপোর্ট সঠিক।
শুধু দুধ নয় আরও অনেক ভোগ্যপণ্যে ভেজাল ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। কিছু পণ্য ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনাকালে ধ্বংসও করেছে। এরপরও ভেজাল ও ক্ষতিকর সবপণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়া হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং সেগুলো দিব্যি দোকানে দোকানে এখনও বেচাকেনা হচ্ছে। দুশ্চিন্তার কারণ এখানেই।
আমি নিজে দেখেছি, যারা গ্রামে গাভি পালন করতেন তাঁদের ধারণা ছিল দুধে পানি মেশালে বা ভেজাল করলে গাভি বা বাছুরের ক্ষতি হবে। এজন্য দুধ তাঁরা ১০০% নির্ভেজাল রেখে বাজারে বিক্রির জন্য নিতেন। এ বিশ্বাস বা ধারণা হিন্দু-মুসলিম সবার মধ্যে দেখেছি। আমাদের বাড়িতে একসময় গাভি পালা হতো। আমার মা পার্বতী রায় নিজে দুধ দোহন করে বাজারে দিতেন। কোনওভাবে দুধে যেন এক ফোঁটা পানি না মেশে সেব্যাপারে কড়াকড়ি করতেন। আবার গ্রামের বাজারেও যন্ত্র দিয়ে দুধ পরীক্ষা করা হতো। আমি নিজেও কোনও কোনওদিন বাজারে দুধ বিক্রির জন্য নিয়ে যেতাম। আমাদের দুধ পরীক্ষা করে কোনওদিন ভেজাল পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দুধের মতো পরিপূর্ণ খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে মারাত্মক পাপ মনে করা হতো আগের দিনে। যে-দুধ শিশু এবং রুগ্নব্যক্তি খাবে তা ভেজাল করা বড় অপরাধ এবং পাপকর্ম তা আগের মানুষ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিশ্বাস করতেন। তাই দুধে ভেজাল মেশানো ছিল মানুষের ধারণার বাইরে। এখন ঠিক তার উল্টো।
বিশেষত শহরের মানুষ প্যাকেটজাত দুধের ওপর নির্ভরশীল। কারণ শহরে মানে ঢাকার মতো মহানগরীতে গাভি পালন করে দুধের চাহিদা মেটানো কল্পনাতীত। তাই নগরবাসীর প্যাকেটজাত পাউডার অথবা তরল দুধেই ভরসা রাখা ব্যতীত উপায় নেই।
কয়েক বছর আগে পাউডার দুধে মেলামাইন মেশানোর অভিযোগ ওঠে। তখন থেকে এর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা বেড়ে যায়। আর এমন অপকর্ম করেছিল চিনের কতিপয় ব্যবসায়ী। অবশ্য চিনে পাউডার দুধে মেলামাইন দূষণের দায়ে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল সেসময়। ফলে প্যাকেটজাত পাউডার দুধের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং তরল দুধের কদর বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এবার তরল দুধেও গরল পাওয়া গেল। তাই আদালত তরল দুধ আবারও পরীক্ষার আদেশ দেয়। এরই প্রেক্ষিতে ৩টি সংস্থা রিপোর্ট দাখিল করেছে সম্প্রতি আদালতে।
আমাদের দেশের নামিদামি কোম্পানিগুলোর প্যাকেটজাত তরল দুধে এবার এন্টিবায়োটিক, সিসা, ডিটারজেন্টসহ কয়েক প্রকার ক্ষতিকর পদার্থ পাওয়া যায়। আমরা দিব্যি এই গরল মিশ্রিত তরল দুধ খেয়ে দেহের বারোটা বাজিয়েছি। ভবিষ্যত বংশধরদেরও সর্বনাশ করেছি। আর এর জন্য দায়ী বড় বড় কোম্পানি যেগুলো তরল দুধে মানুষের জীবনবিনাশী গরলের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। এসব কোম্পানির মালিক ও দূষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কী সাজা হয় তা দেখবার জন্য গোটা জাতি সেদিকে চেয়ে আছে। কারণ শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য এবং পথ্য দুধে যারা গরল ঢালেন ও ভেজালের মিশ্রণ ঘটান তাঁরা মানবতার দুশমন। তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া সময়ের দাবি। দোষীদের কী সাজা হয় তা দেখবার জন্য গোটা জাতি চেয়ে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ