মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বালিশ দুর্নীতি’র ঘটনায় ৩৪ কর্মকর্তা দায়ী

* ১৬ জনকে সাময়িক বহিষ্কার
স্টাফ রিপোর্টার : পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে নজিরবিহীন ‘বালিশ দুর্নীতি’র ঘটনায় ৩৪ জন কর্মকর্তাকে দায়ী করে ১৬ জনকে সাময়িক বহিষ্কারসহ বিভাগীয় মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতির সাথে জড়িত প্রকল্প পরিচালকসহ চারজন বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাকি ৩০ জন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। এদের মধ্যে ১৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ, দুর্নীতির টাকা ফেরৎ চাওয়া, ভবিষ্যতে যেন তারা কাজ না পায় সে সুপারিশ করা হয়েছে।
ওই ঘটনায় দুটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দুটি কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ৩৪ জন কর্মকর্তা বা ব্যক্তি এই ঘটনায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।’
গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘আর আমাদের মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন্যস্ত দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা ইতিমধ্যে পিআরএল (অবসরপূর্ব ছুটি) বা অবসরে গেছেন। একজন অবসরে আর তিনজন পিআরএলে আছেন। তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আইনগত ব্যবস্থা হবে। যেহেতু তারা দায়িত্বে নেই। এজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
এর আগে গত ২১ জুলাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা দেখবেন বলে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এ জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দেন আদালত।
বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদন দুটি দাখিল করার পর আদালত এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আবেদনের পক্ষে ব্যারিস্টার সায়্যেদুল হক সুমন শুনানি করেন।
শুনানিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এ সময় আদালত আবেদনকারী ব্যারিস্টার সায়্যেদুল হক সুমনকে বলেন, ‘প্রতিবেদনে তো দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে। এখন আপনি কী চান?’ জবাবে ব্যারিস্টার সায়্যেদুল হক সুমন বলেন, ‘মাই লর্ড এত বড় প্রকল্প। এটা দেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়। কিন্তু এ প্রকল্পের সঙ্গে ৫০ জনের নাম এসেছে। যারা সবাই স্থানীয় অফিসের চাকরি করেন।’
এ সময় আদালত জানতে চান জড়িতদের কেউ মন্ত্রণালয়ের আছে কি না? জবাবে আইনজীবী সুমন জানান, প্রতিবেদন অনুযায়ী সবাই স্থানীয় অফিসের। পরে আদালত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মন্তব্য জানতে চান।
এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘দোষীদের নাম এসেছে। এখন সময় দেয়া যেতে পারে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।’
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগ কী ব্যবস্থা নেয়, তা আমরা দেখব। এ মামলার পরবর্তী শুনানি দুই মাস পরে অনুষ্ঠিত হবে।’এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল গণপূর্ত থেকে করা কমিটি।
এতে পাবনার রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য বিছানা, বালিশ ও আসবাবপত্র অস্বাভাবিক মূল্যে ক্রয় দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন দুটিতে রূপপুর বালিশকা-ের ঘটনায় ৩৬ কোটি ৪০ লাখ নয় হাজার টাকার গরমিল পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাড়তি অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনারও সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
এ ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি ভবনে আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম সরবরাহ কাজের চুক্তি মূল্য ১১৩ কোটি ৬২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অথচ মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে ৭৭ কোটি ২২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ চুক্তি মূল্য সরবরাহ করা মালামালের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৩৬ কোটি ৪০ লাখ ৯ হাজার টাকা বেশি। এই বাড়তি পরিশোধিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এর আগে, গত ২ জুলাই রূপপুর গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের করা দুটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুই সপ্তাহের মধ্যে তা জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে আসবাবপত্র বিশ্বস্ততার সঙ্গে (গুড ফেইথ) কেনা ও উত্তোলনের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন আদালত।
এ ঘটনা তদন্তে সরকারের দুটি কমিটির প্রতিবেদন দাখিল এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হলো, রাষ্ট্রপক্ষকে তা দুই সপ্তাহের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত রুলসহ আদেশ দেন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, রাজশাহী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মাণাধীন গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ও তা ভবনে তোলায় অনিয়ম নিয়ে গত ১৬ মে একটি দৈনিকে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে হাইকোর্টে এ নিয়ে রিট দায়ের হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ