মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খুলনার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ৩৬৬ মামলা

খুলনা অফিস : খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ৬টি হত্যাসহ মোট ৩৬৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি হত্যা মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। অপরদিকে, এক যুগ পার হলেও এ আদালতে বিচারাধীন ৪টি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচারকার্য এখনও শেষ হয়নি। তবে, দ্রুত বিচার আইনে বিচারাধীন ২০১৭ সালের ২০ জুন দৌলতপুর দেয়ানায় বিএল কলেজ ছাত্র শিবলু মোল্যাকে কুপিয়ে হত্যা এবং ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল সাতক্ষীরা তালা থানাধীন ঘোনা গ্রামে জমিজমা বিরোধের জের ধরে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়া বেগমকে হত্যা মামলার সাক্ষ্য চলমান রয়েছে।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দায়রা ৯টি, দ্রুত বিচার ২টি, এসটিসি ৪টি, আপিল ১৭৭, রিভিশন ১৭৫টি সবমিলিয়ে ৩৬৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে দায়রা ৪টি এবং দ্রুত বিচার ২টি সবমিলিয়ে ৬টি হত্যা মামলা এ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

আদালতের উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী ফকির মো. জাহিদুল ইসলাম নথির বরাত দিয়ে জানান, সরকারি বিএল কলেজের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল ওরফে শিবলু মোল্লা (২৭)কে ধারাল অস্ত্রাঘাতে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা মামলাটি এ আদালতে দ্রুত বিচার ২/১৯ বিচারাধীন রয়েছে। ২০১৯ সালের ৮ মে বিচারের জন্য এ আদালতে আসে। এবং ১৩ মে চার্জ গঠন হয়। এ হত্যা মামলাটির ৪২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে যেটি এখনও চলমান রয়েছে। এ মামলার পরবর্তী সাক্ষীর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৮ ও ২৯ জুলাই। এ হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৪ জন আসামির মধ্যে ১২ জন জামিনে রয়েছে, বাকী দুই আসামি আরিফ ও বাবু কারাগারে রয়েছে।

বিগত ২০১৭ সালের ২০ জুন রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় শিবলু মোল্যা দৌলতপুর দেয়ানা পূর্বপাড়া হাসপাতাল মোড়স্থ একটি বেঞ্চে বসে কোল্ড ড্রিঙ্কস পান করছিলেন। সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে ধারাল অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসামিরা সেখানে এসে তার সাথে তর্কাতর্কি শুরু করে। এক পর্যায়ে তাকে এলোপাতাড়ি মাথায়, ঘাড়ে, বুকে-পিঠে, হাত-পায়ে কুপিয়ে জখম করে তারা পালিয়ে যায়। এরপর তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের পিতা দৌলতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ইন্সপেক্টর শেখ আবু বকর ২০১৮ সালের ৮ মার্চ আবু বকর এক পুলিশ সদস্যসহ ১৪ জন আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হচ্ছে- আরিফ শেখ (২৮), রহমত (২২), মো. কাশেম (২৫), আবু হানিফ (৩৬), পুলিশ কনেস্টবল মো. গোলাম মোস্তফা ওরফে বিপ্লব (৪৫), মো. ইউসুফ (২৪), বাবু শরীফ (২৫), জসিম (২৮), শহিদুল ইসলাম (৫০), এনামুল শেখ ওরফে ইমা (২৬), জুয়েল ওরফে কসাই জুয়েল (৩০), আবুল হাসান (৪৫) এবং বাবু শরীফ (২৫)।

অপরদিকে দ্রুত বিচার ৮/১৬ এ আদালতে বিচারাধীন ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল সাড়ে ৩টায় সাতক্ষীরা জেলার তালা থানাধীন ঘোনা গ্রামে জমিজমা বিরোধের জের ধরে মো. রোকন উদ্দিন শেখের বাড়িতে আসামিরা হামলা চালায়। এসময় তার স্ত্রী ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়া বেগমকে হত্যার উদ্দেশে উপর্যুপোরি মাথায়, মুখে, বুকে, পেটে, পিঠে, ঘাড়ে, হাতে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ওই সময় রাবেয়ার পেটে থাকা ৮ মাসের বাচ্চাও কাটা পড়ে।

ওই সময় তার ডাকচিৎকারে স্বামী রোকন এগিয়ে আসলে তাকেও হত্যার উদ্দেশে বামহাতের কব্জির ওপর, ডান পায়ের নলায়, বাম পায়ের নলায় এবং ডান পায়ের উরুতে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। এরপর রোকনকে জখম অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। রোকন বহু সম্পত্তির মালিক হওয়ায় আসামিরা তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে সম্পত্তি গ্রাস করার উদ্দেশে হামলা চালিয়ে এ হত্যাকা- ঘটায়। এরপর ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম আদালতে ১১ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হচ্ছে- সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার কোমর উদ্দীন শেখ, জহুর শেখ, সাজাদুর রহমান ওরফে লাভলু শেখ, আহাদুর রহমান ওরফে ডাবলু শেখ, জিল্লুর রহমান ওরফে বাবলু শেখ, সাত্তার খান, রাশেদ শেখ, ফারুক শেখ, ময়েজ উদ্দীন মোড়ল, ওমর শেখ ও সিদ্দিক মোড়ল। এ হত্যা মামলায় ৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬ জনের সাক্ষ্য গৃহীত হয়েছে।

এ আদালতের সেরেস্তা সহকারী মাজহারুল ইসলাম বিচারাধীন ৪টি চাঞ্চল্যকর দায়রা হত্যা মামলার নথির বরাত দিয়ে জানান, বটিয়াঘাটা উপজেলার মোহাম্মদনগর এলাকার ডা. মোশারেফ হোসেনের ছেলে মো. খালেদ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা মামলাটি এ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। পূর্ব শত্রুতার জেরে ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে পরদিন বেলা ২টার মধ্যে যেকোনো সময়ে সাচিবুনিয়া গ্রামের চৌ রাস্তার মোড় থেকে আসামিরা খালিদকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর লোহার রড, হাতুড়ি দিয়ে তাকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার পিতা ডা. মোশারেফ হোসেন বাদী হয়ে বটিয়াঘাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিআইডি এএসপি মোস্তফা হালিম ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এ হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত ৫ আসামির মধ্যে ২ জন মারা গেছে। এ মামলাটি এখনও সাক্ষীর পর্যায়ে রয়েছে।

২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় পাইকগাছা থানার হিজামপুর ওয়াপদা বেড়িবাােধর ওপর নেহার আলী মোড়ল (২৮) সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর আহত অবস্থায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে পাইকগাছা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (নং-২)। ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল এস আই নাসির উদ্দিন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এ হত্যা মামলাটি সাক্ষ্যর পর্যায়ে রয়েছে।

২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারী পাইকগাছা কাটি বাজারস্থ গাজী এন্টারপ্রাইজের সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে কাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জমির গাজীর ছেলে চৌকিদার আব্দুল জলিল গাজী নিহত হয়। কাটিপাড়া বাজারের দিকে আসা মোটরসাইকেলে তিন আরোহি আসতে দেখে সেটি থামিয়ে তল্লাশি করেন পেট্রোল পার্টির ইনচার্জ দিপক কুমার ও তার সঙ্গীয় সদস্যরা। তল্লাশি করাকালে পেছনে থাকা এক আসামি অস্ত্র বের করে দিপকের মাথায় ঠেকিয়ে ধরে। ওই সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে দিপককে বাঁচাতে আসা চৌকিদার আব্দুল জলিল গাজীর দিকে এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে আসামিরা। ওই সময় জলিল গাজী গুলিবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় পাইকগাছা রাড়–লী পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ আবু দাউদ বাদী হয়ে পাইকগাছা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর ২০০৭ সালের ৩১ মে জেলা ডিবি পুলিশ ওবায়দুল হক আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এ মামলার দুই আসামি হচ্ছে-সাতক্ষীরা তালার সাহাজাদপুর গ্রামের রেজোয়ান গোলদারের ছেলে শহিদুল গোলদার (২৯), পাইকগাছা শ্রীকন্ঠপুর এলাকার সুলতান শেখের ছেলে আনোয়ার শেখ (২৫)। এই দুই আসামিই পলাতক রয়েছে। এ হত্যা মামলাটি সাক্ষ্যর পর্যায়ে রয়েছে।

২০০০ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোনো সময়ে দাকোপ থানার চান্নিরচক ভরাটে খাস খাল পানির মধ্যে ওই গ্রামের ছেলে পতিত পবন এর লাশ পাওয়া যায়। আসামিরা তাকে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে শ্বাস রোধে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ননী গোপাল সর্দার বাদী হয়ে দাকোপ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (নং ১২)। এরপর ২০০৪ সালের ৮ মার্চ এসআই শহিদুল হক আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এ হত্যা মামলায় ১৮ জনের মধ্যে ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে যেটি এখনও চলমান রয়েছে। খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি এডভোকেট আহাদুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আইনকে যথাযথ ব্যবহার এবং শ্রদ্ধার সাথেই কোর্টকে সর্ব্বোচ্চ সহযোগিতা করছি। কোর্ট অনেক আন্তরিক, প্রশাসনের বিশেষ সহযোগিতায় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সাক্ষ্য যদি পাওয়া যায় তাহলে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, দৌলতপুর দেয়ানা পূর্বপাড়ায় শিবলু মোল্যা হত্যা মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ একেবারেই শেষ পর্যায়ে, যেটি খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ