মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

ভোটের বন্যা

সারাদেশে বন্যাকবলিত মানুষ যখন প্রচন্ড কষ্টে কোনোভাবে দিন পার করছে গণমাধ্যমে তখন অন্য রকম বন্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। পানির নয়, এই বন্যা ভোটের বন্যা। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রকৃত ভোটাররা বঞ্চিত হলেও এবং কয়েকদিন আগে থেকে ভোটারসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মামলা, গ্রেফতার ও ধাওয়ার মুখে রাখা হলেও ৩০ ডিসেম্বর আয়োজিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের বন্যা বইয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তার ওয়েবসাইটে যে ফলাফল প্রকাশ করেছে সেখানে দেখা গেছে, হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯০ থেকে শতভাগ পর্যন্ত। এমনকি মৃত ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক প্রবাসীও ভোট দিয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে, ভোটের আগে যারা দেশেই আসেননি। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে কমিশন দেখিয়েছে, শতভাগ ভোট পড়েছে অন্তত ২২৭টি কেন্দ্রে। এ ছাড়া ৯০ থেকে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়েছে অন্তত সাড়ে সাত হাজারের বেশি কেন্দ্রে। আর ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ ভোট পড়েছে এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫ হাজার ৭১৯টি। যার অর্থ, ২৩ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ ভোটাররা ভোট দিয়েছেন!
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শতভাগ ভোট পড়েছে এমন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ। রংপুর-৫ আসনে সর্বোচ্চ নয়টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। চট্টগ্রাম-৮ ও রংপুর-২ আসনে সাতটি করে এবং রংপুর-৬ ও লালমনিরহাট-৩ আসনে ছয়টি করে কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এদিক থেকে চট্টগ্রাম-৫, কক্সবাজার-৩, ময়মনসিংহ-২ ও ১০, দিনাজপুর-১, গাইবান্ধা-৪, নওগাঁ-৩ এবং সিলেট-৪ আসনের কেন্দ্রগুলোও পিছিয়ে নেই।
ওদিকে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে গোপালগঞ্জ-১ আসনের ফলাফলে। সেখানে যেন শুধু নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করার জন্যই ভোটের ‘ঢল’ নেমেছিল। এই আসনের ১৩৩টি কেন্দ্রের মধ্যে দুটি ছাড়া সব কেন্দ্রেই ৯১ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়েছে বলে দেখিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যে দুটিতে এত ভোট পড়েনি সেখানেও প্রদত্ত ভোটের হার ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, মাত্র নয়টি কেন্দ্রে ধানের শীষের পক্ষে দু-একটি করে ভোট পড়লেও সব মিলিয়ে ২১টি ভোট পড়েছে বলে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে নৌকার পক্ষে পড়েছে তিন লাখ তিন হাজার ৯৪২টি ভোট। তাছাড়া গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনের ৩৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৯টি কেন্দ্রেই সব ভোট পড়েছে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকায়।
আবার বিএনপি তথা ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বগুড়া অঞ্চলে কিন্তু ভোটের বন্যা সেভাবে দেখা যায়নি, যা দেখা যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। সেখানে বগুড়া-১ আসনের ১২২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪২টিতে ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ এবং বাকি ৮০টি কেন্দ্রে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দেখানো হলেও ধানের শীষের প্রার্থী সব মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ১৬ হাজার ৬৯০টি ভোট। অন্যদিকে ধানের শীষের ঘাঁটি হলেও দুই লাখ ৬৮ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন নৌকার প্রার্থী!
এভাবেই নৌকার তথা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী দেখিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটও পেয়েছেন তারা ৯০ থেকে শতভাগ পর্যন্ত। অন্যদিকে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের দিন ভোটারের উপস্থিতিসহ দেশে যে পরিস্থিতি ছিল সে পরিস্থিতিতে কোনো একটি কেন্দ্রেও শতভাগ ভোট পড়ার তথ্য সঠিক হতে পারে কি না? উল্লেখ্য, দৈনিক সংগ্রামই প্রথম নয়, সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানও এরই মধ্যে এ ধরনের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। সুজন-এর এক রিপোর্টে প্রসঙ্গক্রমে সিইসি নূরুল হুদার একটি মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সিইসি স্বীকার করেছেন, এত বেশি সংখ্যক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া মোটেও ‘স্বাভাবিক’ নয়। জনাব নূরুল হুদা অবশ্য একথাও বলেছেন যে, এ বিষয়ে এখন আর তাদের করার কিছু নেই! মূলত সিইসির এ ধরনের বক্তব্যের পাশাপাশি অস্বাভাবিক ভোটের হার এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ফলাফল ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বলাবলি হচ্ছে, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল একটি কলংকজনক অধ্যায়। বড়কথা, ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে কমিশনও জালিয়াতি করেছে। একই কারণে সিইসিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ্িবশিষ্টজনেরা আরো বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। একই কারণে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অনাস্থার। বিশিষ্টজনেরা আরো বলেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় তাহলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতায় রদবদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।
আমরাও মনে করি, বিশিষ্টজনদের এমন আশংকার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ নেই এবং গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকারকে রক্ষা করতে হলে সিইসিসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এজন্য প্রয়োজনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে হবে। বস্তুত ৯৬ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়ার, মৃত ও প্রবাসীদের দিয়ে ভোট দেয়ানোর, তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষিত ফলাফল পাল্টে ফেলার এবং ব্যালট পেপার ও ইভিএম-এর ভোটের মধ্যে বিরাট পার্থক্যের যে তথ্য-পরিসংখ্যান খোদ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, সেগুলো বিস্ময়কর তো বটেই, সকল বিচারে অগ্রহণযোগ্যও। অন্যদিকে অমন একটি জালিয়াতির নির্বাচনকেই সিইসি এবং তার সহকর্মিরা সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে ঘোষণা করছেন। স্বীকৃতি দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এত বেশি হারে ও সংখ্যায় ভোট পড়া মোটেও ‘স্বাভাবিক’ নয় বলে স্বীকার করার পরও একই সিইসি আবার বলে বসেছেন, এসব বিষয়ে তাদের নাকি আর করার কিছু নেই! আমরা মনে করি, এ ধরনের স্বীকারোক্তি ও মন্তব্যের কারণেই সিইসি নূরুল হুদা এবং তার সহকর্মিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এজন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের উচিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেয়া। গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগও রাষ্ট্রপতিকেই নিতে হবে। আমরা চাই না, বিশিষ্টজনদের এই আশংকা সত্যে পরিণত হোকÑ যখন নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতায় রদবদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ