শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আবারও বন্যার কবলে বাংলাদেশ

এইচ এম আব্দুর রহিম : আবারও বন্যার কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। অনেক এলাকার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি মাসে বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ এশিয়ার অনেক দেশ। চলমান বন্যার সঙ্গে ভূমিধস মিলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপালে এ পর্যন্ত ২০০ মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ২৮ জেলা এখন বন্যার কবলে। সরকারি হিসেব মতে, চারটি জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩২ জন। তবে বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১৫ লাখ। বিবিসি জানিয়েছে, এবারের বন্যার ভয়াবহতা আগের বন্যাগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে, এফডব্লিউসি বলছে, সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন, সুরমা, সোমেশ্বরী, তিতাস, মেঘনা, ধরলা, ঘাগট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, আত্রাই, ধলেশ্বরী, পদ্মা নদীর পানি বিপদ সীমানার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পুরো বর্ষাকাল এ অবস্থা চলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
 আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এখন আর ধারণক্ষমতা নেই। বানের পানি ধেয়ে আসছে নতুন এলাকার দিকে। সাধারণত আমরা ভেবে থাকি, বন্যাতো প্রাকৃতিকভাবে আসে। এর জন্য আবার কে দায়ী হবে? মানুষের কার্যকলাপের কারণে সাম্প্রতিককালের বন্যার জন্য মানুষের দায় আছে। সংঘটিত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক মাত্রায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উন্নত রাষ্ট্রগুলো দায় এডাতে পারে না। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী ২০ বছরে এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল এমনিতেই এই মহা দেশের সবচাইতে পানিবহুল আর পৃথিবীর অন্যতম পানি বহুল এলাকা। এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের গড় ১ হাজার মিলিমিটার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২০১২ সালে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল,ভারী বর্ষণ বাড়তে থাকলে বাংলাদেশ ভারত চীনের ১৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বা অভ্যন্তরীণ বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। ১৯৫০-২০১৭ সাল পর্যন্ত উপাত্তে দেখা যায়, বাংলাদেশ, ভারত, চীনের ২২ লাখ মানুষ বন্যায় প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে শুধু দেখা যায় ১৯৫৯ সালের বন্যায় চীনে ২০ লাখ লোক মারা যায়।
এছাড়া হিমালয়ের হিমবাহ ও ¯েœাপ্যাক গলে নদী গুলোকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলেছে, যা বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। ভারতের পানিনীতি ও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। বাঁধ দিয়ে শুকনা মৌসুমে ব্যাপক আকারে নদী আটকে দিয়ে ভারত সেচ কাজে পানি ব্যবহার করছে অবাধে। কিন্তু বন্যা শুরু হলে বাঁধ ছেড়ে দিয়ে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতের পশ্চিম বঙ্গ বন্যার কবলে পতিত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে,বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তবে বন্যাও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ যতটা না প্রাকৃতিক কারণে ঘটছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বাংলাদেশে জনগণ এর মধ্যে দিয়ে রাত পার করছে। কিন্তু এর জন্য তারা কতটা দায়ী? জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যতটুকু কার্বনডাই অক্সাইড নির্গমন দরকার,তার মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ নির্গমন করে বাংলাদেশ। বেশীর ভাগ নির্গমনের জন্য দায়ী উন্নত রাষ্ট্রগুলো,যারা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তাই ঋণ নয়, বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে মনোযোগী হয়ে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জনে ধনী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের পর আর এটা শুধু তাদের নৈতিক দায় নয়, আইনগত বাধ্যবাধকতাও। তবে হ্যাঁ, বন্যা ও লাগান যায়, যদি আপনি যথাযথ হিসাব না করে অপরিকল্পিত বাঁধ, ড্যাম ও ব্যারাজ তৈরি করেন।
 এদিকে বাংলাদেশমুখী ভারত নেপালের অভিন্ন নদীসমূহের ওপর যেমন বাংলাদেশে মরুময় পরিস্থিতি তৈরি করে, তেমনি ভয়াবহ বন্যার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষত ভারত নিজেদের নগদ লাভের আশায় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধ্বংস করে দুই দেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক নিয়মে নদীর বাড়তি পানি প্রবাহ স্বাভাবিক সমুদ্রে গিয়ে পড়তো। মধ্যপথে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় এসব পানির বিপুল অংশ ধারণ করে সারা বছরের চাহিদা পূরণ করতো। কিন্তু ভারত নেপালের বহু সংখ্যক নদী কেন্দ্রিক প্রকল্প করে বড় বড় আধার পানি আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এই পানি এমনিতেই এসব আধারকে টুইটুন্বর করে রাখে। এর সঙ্গে বর্ষা মওসুমের বিপুল পরিমাণ পানিযুক্ত হয়ে উপচে পড়ে এবং তা দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। এরই পরিনতিতে ভারত, নেপাল, বাংলাদেশে বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজানের পানি সামাল দিতে না পেরে ভারত ফারাক্কাও গজল ডোবা বাঁধ খুলে দেয়। এবার ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে আটকে থাকা বিপুল বাড়তি পানি প্রবলবেগে বাংলাদেশের দিকে ধেঁয়ে আসছে। যা ভরাট হওয়া খালসহ এখানকার দুর্বল পানি অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ- বেড়ি বাঁধগুলো ভেঙে গিয়ে জনপদ ও ফসলি জমিগ্রাস করছে। এই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে।পানি আটকে রেখে ড্রাম প্রকল্প নির্মাণ করেছে ভারত। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, মহা নন্দা, বরাক, প্রভৃতি বাংলাদেশমুখী নদীসমূহের উপর নির্মিত অসংখ্য ড্যামও প্রকল্পের জন্য সারা বছর পানি আটকে রাখা হয়। সেই পানির সঙ্গে বর্ষা মওসুমের বিপুলধারা ধেয়ে আসে এ দেশের জনপদে। এসব পানি ভারত ও নেপালে বন্যার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতে পানি আটকে রাখার কারণে বাংলাদেশের নদী গুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য ছোট নদী প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। খাল, বিল গুলো পানি ধরে রাখার মত অবস্থা এখন আর নেই। এর ফলে দেশে বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও বরফগলা পানির বিপুল ধারা যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেঁয়ে আসছে। কিন্তু এখানকার জলাশয়গুলো ভারত-নেপালের প্রকল্পের প্রতিক্রিয়ায় ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতা ২৫ ভাগ কমে গেছে। পদ্মা নদীর তলদেশ ১৮ ফুট ভরাট হয়ে গেছে। অসংখ্য চর স্থায়ী হয়ে গেছে। এসব কারণে দেশে বন্যার ছোবল বারবার হানছে। যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এ দেশ হারিয়ে ফেলেছে।
মানব সৃষ্ট বিপদ ও প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার পর ও আল্লাহ এ দেশটিকে টিকিয়ে রেখেছে। মানব সৃষ্ট দুর্যোগে প্রতিবছর বিপুল পরিমান সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে এবং দেশটির উন্নয়ন তৎপরতা পিছিয়ে যাচ্ছে। এ দেশে বন্যা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রায় এ দেশের মানুষ উপোরোক্ত কারণে বন্যার কবলে পতিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ঢাকার শ্যামলি এলাকায় একতলা পর্যন্ত ডুবে গিয়ে ছিল। ৮৮সালের বন্যা ৯৮ সালের বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ছিল। এ দেশে বন্যার ইতিহাস খুব বেশি আগের নয়। কবে থেকে এ দেশে বন্যা হয়ে ছিল তা জানা যায় না। অতীতের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ১৭৬৭ সালে বড় ধরনের একটি বন্যা হয়ে ছিল। ১৯৪৩ সালে বড় ধরনের বন্যার কথা জানা যায়। মূলত ১৯৫৪ সাল থেকে বন্যার দাপট শুরু হয়। তখন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২টি বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি মহাপ্রলয়ঙ্করী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০৫৪, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৮, ৭০, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৮০, ৮৪, ৮৭, ৮৮, ৯৮  এতে। এ বিষয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ৯টি বন্যা হয়েছে। দেশটির জন্ম হয়েছে প্রলয়ঙ্করি বন্যার বোঝা মাথায় নিয়ে। ১৯৭০ সালের বন্যায় লোক মারা যায় সরকারি হিসেব মতে ৫ লাখ। এ বন্যায় উপকূলে ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ ৯৮ হাজার টন খাদ্য শষ্য নষ্ট হয়। ১৯৭১ সালে আরো একটি মহাপ্রলয়ঙ্করি বন্যা হয়। এ বন্যায় ১৪ হাজার বর্গমাইল প্লাবিত হয় এবং ১২ লাখ টন ফসল বিনষ্ট হয়। এ বছর মানুষ মারা যায় ১২০ জন। ২ লাখ ১৯ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট এবং ২ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। এভাবে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ সালে বন্যায় বিপুল ক্ষতি হয়। ’৯৮-এর বন্যাগুলো মহাপ্রলয়ঙ্করি হিসাবে চি‎ি‎হ্নত করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালের মহাপ্লাবনে ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দেশের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার বর্গমাইল তলিয়ে যায়। বন্যার করাল গ্রাসে সরকারী হিসাব মতে, লোক মারা যায় ৩৩৩ জন। আর বেসরকারি হিসাব মতে, ৬০০ জনের বেশি। দেশের ৬৪টি জেলার ৪৭টি বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। ৪৬৮টি উপজেলার ২৯৩টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারি হিসেব মতে, ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ। বেসরকারি হিসেব মতে, ৩ কোটি। বাস্তুহারা হয় ৩০ লাখ মানুষ। বিগত ৩৬ বছরে যেসব জায়গা তলিয়ে যায়নি এমন সব জায়গা ও তলিয়ে গিয়ে ছিল ৮৮ মহাপ্লাবনে। এ বন্যায় দেশের ৮০ লাখ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বন্যায় ১ কোটি কৃষক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ছিল। ২০ লাখ একর জমির ফসল পুরোপুরি এবং ১৫ লাখ একর জমির ফসল আংশিকভাবে ভেসে যায়। বন্যায় সরকারি হিসাব মতে, ফসল ক্ষতি হয় ২০ লাখ টন শস্য। এছাড়া দেশে ৬ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ১৭৫ কিলোমিটার ধ্বংস হয়। এ ছাড়া সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। দেশের ২৪৬টি সেতু ও কালভার্ট বিধ্বস্ত এবং প্রায় আড়াই হাজার ফুট রেলপথ বন্যায় ভেসে যায়। সর্বোপরি গাছপালা ভেসে যায় আর পরিবেশের বিপুল ক্ষতি হয়।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, ৮৮ এর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ মেরামতের জন্য তখন প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়ে ছিল। এছাড়া কয়েক হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছিল। বন্যায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। বন্যায় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ বন্যায় রাজধানী অনেক এলাকা ডুবে যায়। ধানমন্ডি, শেরে বাংলানগর, গুলিস্তান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিছু অংশ ছাড়া রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় জলমগ্ন হয়েছিল। তখনকার হিসাবে ৬০ লাখ লোকের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রায় ৫০ লাখ পানিবনিদ হয়ে পড়ে। ঢাকায় প্রায় ৪০০ ত্রাণশিবির খোালা হয়েছিল। এসব ত্রাণশিবিরে প্রায় ৫ লাখ বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছিল। বন্যার পানি বিমানের রানওয়েতে উঠে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বন্ধ করা হয়েছিল। আবহাওয়া অফিস, আগারগাঁও, সম্প্রচার ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে পানি উঠে গিয়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালে রোগী বন্ধ রাখা হয়েছিল। মিডফোর্ট হাসপাতালের সব অপারেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। ডুবে যাওয়ায় ঢাকা শহরে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছিল। ওয়াসার ২৭টি নলকূপ বিকল হয়ে পড়েছিল। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কমে গিয়েছিল। এতে ৭১ জনের প্রাণহাণি ঘটে ছিল। ৮৮ সালের বন্যা ৯৮ সালের বন্যার মতো স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু সরকারের ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। তারপর ও বন্যায় অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিকূল প্রভাব পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিখাত। এ ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অকৃষিখাতের অবকাঠামো যতেষ্ট ক্ষতি হয়। এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে বিপুল ক্ষতি হয়। বিশেষ করে নদী ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করে। পানির স্রোতে ভেসে যায় গাছপালা। আবাদি জমি নষ্ট হয়ে যায় বালির আস্তরণে। ১৯৯৮ সালের বন্যার ক্ষতিয়ান এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। এ বন্যার সময় জাতীয় দৈনিকে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়। ৯৮ সালের বন্যা ছিল ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। ভয়ঙ্কর বন্যায় ৬৪ জেলার মধ্যে ৫২টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ১২ কোটি মানুষের মধ্যে ৩ কোটি মানুষ ছিল বন্যাকবলিত। দেশের মোট ৬৫ হাজার হেক্টর জমি দীর্ঘ দিন ধরে বন্যায় ডুবেছিল। অন্যন্য ক্ষতির হিসাব বাদ দিলেও খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২১৮ লাখ মেট্রিক টন। বন্যায় মানুষ মারা গিয়েছিল ১ হাজার ৫০০ জন। গবাদি পশুর মৃত্যুর সংখ্যা ২২ হাজার। বন্যা বিরতি দিয়ে স্থায়ী হয় ৮০ দিন। দেশের ৩ লাখ নলকূপ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পনীয় জলের সংকট চরমভাবে দেখা দিয়েছিল। বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।
এছাড়া ২০০০ সালের আগস্ট-সেপ্টেন্বরে এক আকস্মিক বন্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ৭টি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ২টি জেলার ৪১টি উপজেলার ২৮০টি ইউনিয়নে বন্যায় ৩০ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিল।
অপর দিকে ২০০৭ সালের ১৫ নবেন্বর বাংলাদেশের উপর দিয়ে সিডর প্রবাহিত হয়। এর আঘাতের কবলে পড়ে দেশের ২২টি জেলা সিডরে ১৫ হাজার লোক মারা যায়। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, এটি ১৩১ বছরের ইতিহাসে বড় দশটি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে অন্যতম। তবে বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশে আরো আগামীতে রয়েছে অজানা শঙ্কা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ