বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

তিন মোড়ল’র প্রতিপত্তি এখনো অটুট

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বিশ্ব ক্রিকেটে তিন মোড়ল হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত। এই তিনদলের দুটি এবারের বিশ্বকাপে বাদ পড়ে যায় অজি আর ভারত। ফাইনালে টিকে ছিল কেবল স্বাগতিকরা। আর শেষে এসে তারাই জিতেছে শিরোপা। এই শিরোপায় যতটা গৌরব ঠিক ততটাই মাখা ছিল লজ্জার। ঐতিহ্যবাহী লর্ডসে ফাইনাল নিজেদের করে নেয় ইংলিশরা। আগে ব্যাট করে ২৪১ রান করে নিউজিল্যান্ড। এরপর জবাবে ইংল্যান্ডও করে ২৪১। খেলা গড়লো সুপার ওভারে। সুপার ওভারে ইংল্যান্ড করলো ১৫ রান। আবার সেই নিউজিল্যান্ড জবাবে করলো ১৫ রান। অর্থাৎ ফের টাই। সুপার ওভারের নিয়ম অনুযায়ী, যদি এ ৬ বলেও ম্যাচের ফলাফল না হয়, তা হলে যে দল বেশি বাউন্ডারি মেরেছে, সেই দলকেই জয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। দু’দলের মারা বাউন্ডারির সংখ্যা দিয়েও যদি ম্যাচের নিষ্পত্তি না হলে দেখা হবে সুপার ওভারের শেষ বলে কোন দল কত রান করেছে। যে দল বেশি রান করেছে, নিয়ম অনুযায়ী সেই দলই জিতবে। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে আসে ১৪টি চার ও ২টি ছক্কার মার। মোট বাউন্ডারি পায় ১৬টি। অন্যদিকে দ্বিতীয় ইনিংসে ২২টি চারের সঙ্গে ২টি ছয় মারে ইংল্যান্ড। যে কারণে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। তবে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় হয়তো কিছুটা ছন্দপতন আছে। তারপরও বিশ্ব ক্রিকেটে চলছে ‘তিন মোড়লের’ রাজত্ব। ক্রিকেটের তিনটি সম্পদশালী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোটা কোনো বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না।
এবারের টুর্নামেন্টের সম্প্রচার থেকে ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করবে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। যার সিংহভাগ ব্যয় করা হবে এই খেলার উন্নয়নে। তবে এই অর্থের বেশিরভাগই যাচ্ছে ক্রিকেটের সবচেয়ে ধনী তিন দেশে। ২০১৬-২৩ সম্প্রচার চুক্তির আওতায় ২০১৯ ও ২০১৩ বিশ্বকাপ হচ্ছে মূল ইভেন্ট। সেখান থেকে অর্জিত অর্থ থেকে ৯৩টি সহযোগী বা জুনিয়র ক্রিকেট দেশ আইসিসি থেকে পাবে ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। অথচ ভারত একাই লাভ করবে ৩২০ মিলিয়ন পাউন্ড। এর বাইরেও বিগ থ্রির আলাদাভাবে রয়েছে ঘরোয়া টুর্নামেন্টের সম্প্রচারের লোভনীয় চুক্তি। অপরদিকে দলগত আয় কম থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলোকে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে খেলোয়াড়দের সরে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) সাফল্যের কারণে এসব খেলোয়াড়রা টি-২০ ফ্র্যাঞ্চাইজির দিকেই ঝুঁকে পড়ছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিশ্রুতিশীল ফাস্ট বোলার ডোয়াইন অলিভার প্রোটিয়া জার্সি তুলে রেখে ইংলিশ কাউন্টি দল ইয়র্কশায়ারে যোগ দিয়েছেন। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক জেসন হোল্ডার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণে আইসিসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির হর্তাকর্তাও বলা হয় এই তিন দেশকে। মাঠের লড়াইয়েও বড় হিসেবে স্বীকৃতি আছে এই তিন টেস্ট খেলুড়ে দেশের। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে তিন দলই। ইংল্যান্ড তো আবার খাদের কিনারেও চলে গিয়েছিল। যদিও প্রত্যাশা অনুযায়ী সেমিফাইনালে উঠে এসেছে তিন দলই। বরং এভাবে বলা যায়, এ তিন দলকে সেমিফাইনালে না দেখলেই বিস্মিত হতে হতো! শুধু মাঠের খেলাতেই নয়, এই তিন মোড়লের হাতেই নিয়ন্ত্রণ আইসিসির কোষাগারেরও। সংবাদ সংস্থা এএফপির তথ্য মতে, এবার বিশ্বকাপে শুধু সম্প্রচার খাতের রাজস্ব থেকেই আয় হবে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড। ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে এ অর্থ আইসিসির জন্য চাবিকাঠি। কিন্তু এই উপার্জিত অর্থের অধিকাংশেরই ঠিকানা ‘তিন মোড়ল’ ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের কোষাগার। ২০১৬-২৩ সম্প্রচার চক্রে রয়েছে ২০১৯ ও ২০২৩ বিশ্বকাপ। এ সময়ে ৯৩টি ‘সহযোগী’ কিংবা পুঁচকে ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ আইসিসির কাছ থেকে পাবে মোট ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। আর ভারত একাই আয় করবে ৩২০ মিলিয়ন পাউন্ড। ক্রিকেটের এই তিন মোড়ল আরেকটি জায়গাতেও বেশ এগিয়ে। তাদের ঘরোয়া লিগগুলো আকর্ষণীয় অঙ্কের সম্প্রচার চুক্তি পেয়ে থাকে। কিন্তু একই সময় দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে পারছে না। এসব দেশের খেলোয়াড়েরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দিয়ে যোগ দিচ্ছেন ওই তিন দেশের আকর্ষণীয় কোনো টি-২০ ফ্র্যাঞ্জাইজিতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের ‘ন্যূনতম আয় উল্লেœখযোগ্য অঙ্কের’ করতে আইসিসির কাছে আবেদন করেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক। এতে খেলোয়াড়েরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দ্বিধায় থাকবেন না বলেও বিশ্বাস করেন হোল্ডার। দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিসও গত সপ্তাহে এরকম শঙ্কা প্রকাশ করেন। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিশ্চিতের আগেই প্রোটিয়া অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘ওয়ানডে দলে তাকিয়ে মনে হচ্ছে প্রোটিয়া দল থেকে খেলোয়াড়েরা টি-২০ তে যোগ দেবে। সব খেলোয়াড়, এমনকি আমার নিজেকেও সেখান থেকে কীভাবে দূরে রাখা যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তা।’ হোল্ডারের দাবি বাস্তবায়ন হবে না বলেই বিশ্বাস করেন ডু প্লেসিস। তার ভাষায়, ‘ওটা খুঁতহীন বিশ্ব। কিন্তু আমরা খুঁতহীন বিশ্বে বাস করি না। শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান-এ চারটি দেশের অবস্থা আমাদের মতোই। অনেকটাই দ্বিতীয় সারির দল আরকি, তার ওপরের সারিটা আলাদা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ সমস্যা সেরা উদাহরণ হতে পারে। তারাই সম্ভবত সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির মধ্যে আছে। এ কারণে বেশ কিছু খেলোয়াড় হারিয়েছে। তবে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত সব সময়ই বেশি আয় করবে। হ্যাঁ, তাদের মুদ্রা হয়তো শক্তিশালী কিন্তু যে আয়ের প্যাকেজগুলো ছোট দলগুলোর চেয়ে আলাদা।
এ বিষয়টি পাল্টানো গেলে তা বাকি দলগুলোর জন্য খুব ভালো ফল বয়ে আনবে। কিন্তু তা বাস্তবতা থেকে অনেক অনেক দূরে।’ নিউজিল্যান্ড অবশ্য আধুনিক ক্রিকেটের গতিপথের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। আইপিএল কিংবা অন্যান্য টি-২০ ফ্র্যাঞ্জাইজি লিগে খেলোয়াড়দের যোগ দেয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো ‘না’ নেই। আর নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটের সূচির সঙ্গেও ফ্র্যাঞ্জাইজি লিগগুলোর সূচি সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু ক্রিকেটে উঠে আসছে এমন দেশ কিংবা ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত শক্তি অথচ অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল, এমন দলগুলোর জন্য টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড-কাউন্টি কিংবা টি-২০ লিগে যে পারিশ্রমিক, তা খেলোয়াড়দের দেয়ার সামর্থ্য নেই দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উপার্জিত বেশির ভাগ অর্থের ঠিকানা এখনো ‘তিন মোড়ল’-এর কোষাগার। ২০১৬-২৩ সম্প্রচার চক্রে রয়েছে ২০১৯ ও ২০২৩ বিশ্বকাপ। এ সময়ে ৯৩টি ‘সহযোগী’ কিংবা পুঁচকে ক্রিকেট খেলুড়ে জাতি আইসিসির কাছ থেকে পাবে ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। আর ভারত একাই আয় করবে ৩২০ মিলিয়ন পাউন্ড।
এখানেই শেষ নয়। ক্রিকেটের এই তিন মোড়ল আরেকটি জায়গাতেও বেশি এগিয়ে। তাদের ঘরোয়া লিগগুলো আকর্ষণীয় অঙ্কের সম্প্রচার চুক্তি পেয়ে থাকে। কিন্তু একই সময় দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে পারছে না। এসব দেশের খেলোয়াড়েরা হরহামেশাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন কিংবা ছেড়ে দিয়ে যোগ দিচ্ছেন ওই তিন দেশের আকর্ষণীয় কোনো টি-২০ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা ঘরোয়া লিগে। সব মিলিয়ে আইসিসির প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সেভাবে অন্য দলগুলোর প্রভাব নেই যা আছে তিন মোড়লের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ