বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কোচ বিদায়ের পন্থাটি কতটা সঠিক?

অরণ্য আলভী তন্ময় : একজন নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিতি ছিলো বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কোচ ষ্টিভ রোডসের। একজন ইংলিশম্যান হলেও তার মধ্যে সেভাবে কাজ করেনি কোন অহমিকা। তবুও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে তাকে। ২০২০ সালের টি-২০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি ছিল এই প্রধান কোচের সঙ্গে। তবে বিশ্বকাপে আশানুরূপ পারফরম্যান্স না পাওয়ায় অনেক আগেই ইংলিশ কোচের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তাই বাংলাদেশের কোচ হিসেবে আর থাকছেন না রোডস। বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। এ মাসের শেষ দিকে তিন ম্যাচের ওয়ানডে খেলতে শ্রীলঙ্কায় যাবে বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলতে না পারার হতাশার মধ্যে শোনা যাচ্ছিল, শ্রীলঙ্কা সফরই হতে যাচ্ছে স্টিভ রোডসের শেষ মিশন। তবে বিসিবি তার আগেই চুক্তি বাতিল করেছে ইংলিশ কোচের সঙ্গে। ২০২০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবে টি-২০ বিশ্বকাপের আসর। ওই পর্যন্ত বিসিসির সঙ্গে চুক্তি ছিল রোডসের। কিন্তু ১৬ মাস আগেই শেষ হয়ে গেল তার বাংলাদেশ অধ্যায়। ২০১৮ সালের ৭ জুন জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে রোডসকে নিয়োগ দেয় বিসিব। চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসে শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না তার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ দিয়ে নামা মিশনে হারতে হয় ২-০ ব্যবধানে। যদিও ক্যারিবিয়ানদের মাটিতে ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে পায় ৩-১ ব্যবধানের জয়। তবে রোডসের সেরা সাফল্য আসে ২০১৮ সালের এশিয়া কাপে। দারুণ পারফরম্যান্সে সংযুক্ত আরব আমিরাতের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জায়গা করে নেয় ফাইনালে। যদিও ভারতের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি শেষ বলে হার মানতে হয় টাইগারদের। এতে তার সফলতার প্রমাণ মেলে। এদিকে বিসিবি নতুন প্রধান কোচের সন্ধানে নেমে পড়েছে। ইংলিশ স্টিভস রোডস চুক্তি শেষ না করেই বিশ্বকাপ শেষে চলে গেলেন। তার জায়গায় নতুন কোচ খুঁজতে বিসিবি তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়েছে সম্প্রতি।
 বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান কোচ হতে বিসিবি বরাবর ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে সিভি পাঠাতে বলা হয়েছে আগ্রহীদের। বিসিবি এমন কোচ খুঁজছে যার যোগাযোগের সক্ষমতা থাকবে বাড়তি যোগ্যতায় পূর্ণ। সেই সঙ্গে থাকতে হবে সবার সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রেখে দলকে এগিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা। আরও থাকা চাই চমৎকার প্রেজেন্টেশন এবং রিপোর্ট তৈরির নৈপুণ্য। বিসিবি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে, তারা এমন প্রধান কোচ চান যার বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং প্রয়োজনে একা স্বাধীনভাবে কাজ এগিয়ে নেবেন। তাদেরই বিসিবি যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেছে যাদের অবশ্যই এলিট পর্যায়ে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা আছে। সেসব প্রার্থী অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবেন যাদের ভান্ডারে আছে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশের জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। এর বাইরেও আগ্রহীদের জন্য যোগ্যতার বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদের কোচ চায় বাংলাদেশ। তবে ২৬ জুলাই শ্রীলঙ্কা সফরে তিন ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের অর্šÍবর্তীকালীন প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করবেন খালেদ মাহমুদ সুজন। সামনে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট ভারতে। নভেম্বরে ওই সফরে ভারতের বিপক্ষে তিন টি-২০ ও দুই টেস্টের সিরিজ খেলবে। ৩ নভেম্বর শুরু সেই সফর শেষ হবে ২৬ নভেম্বরে। বিসিবি এই সফরের বেশ আগেই প্রধান কোচকে নিয়োগ দিয়ে দিতে চায়। সেই সঙ্গে কোচিং স্টাফদেরও। কিন্তু বিসিবি যেভাবে কোচ বিদায় করেছে এটি কতটা সঠিক পন্থা সেই প্রশ্নও রয়েছে। অথচ মাশরাফিদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরেন রোডস। পরিকল্পনা ছিল আফগানিস্তান ‘এ’ দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের খেলা দেখবেন। এ নিয়ে জাতীয় দলের এক ক্রিকেটারকেও বলেছিলেন, চট্টগ্রামে দেখা হবে। কিন্তু টাইগার কোচের সেই পরিকল্পনায় হঠাৎ জল ঢেলে দেয় বিসিবি। তার আগাম বিদায় প্রসঙ্গে বিসিবি সিইও নিজামুদ্দিন চৌধুরী সুজন জানিয়েছেন, দুই পক্ষের সমঝোতায় বিদায় নিয়েছেন স্টিভ রোডস। বিশ্বকাপের ফল ভালো না হওয়ায় বিসিবির এই সিদ্ধান্ত। সত্যিই কি তাই? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিবির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এশিয়া কাপের পরপরই রোডসকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে চেয়েছিল বিসিবি। কিন্তু বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ভাবনায় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ২০১৮ সালে মাশরাফিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন রোডস। তার কোচিংয়ে গত সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি জয় করে আয়ারল্যান্ডে। এমন সফল একজন কোচকে বিদায়ের জন্য পরিস্কার ব্যাখ্যা দেয়নি বিসিবি। তবে বিসিবি সূত্র জানিয়েছে,  বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালকদের সঙ্গে রোডসের সম্পর্ক একেবারেই শীতল। গত সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপ চলাকালীন এই ঝামেলার সৃষ্টি।
শ্রীলঙ্কা ম্যাচে তামিম ইকবালের বৃদ্ধাঙ্গুলী ভেঙে যায়। তার পরিবর্তে দেশ থেকে ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকারকে উড়িয়ে নিয়ে যায় টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি রোডস। টিম মিটিংয়ে এ নিয়ে চিৎকার করেছিলেন রোডস। তার আচরণ মেনে নিতে পারেনি বিসিবি। তাৎক্ষণিকভাবে বিসিবি সিদ্ধান্ত নেয় এশিয়া কাপের পর অব্যাহতি দেওয়ার। কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য সেটা করেনি। রোডসের বিদায়ে ক্রিকেট দল এখন অভিভাবক শূন্য। তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজ খেলতে টাইগাররা ‘দ্বীপরাষ্ট্র’ শ্রীলঙ্কা যাচ্ছে ২৩ জুলাই। ২৬, ২৯ ও ৩১ জুলাই তিন ম্যাচে জাতীয় দলের অর্ন্তবর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবেন সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন। নভেম্বরে ভারত সফরে যাওয়ার আগে সাকিব, মুশফিক, তামিম, মাহমুদুল্লাহ, মোস্তাাফিজদের নতুন কোচ নিয়োগ দিতে মরিয়া ক্রিকেট বোর্ড। টাইগারদের নতুন কোচ হিসেবে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে জেমি সিডন্স, চন্ডিকা হাতুরাসিংহে, মিকি আর্থার, এন্ডি ফ্লাওয়ারের নাম। রোডসের বিদায় প্রসঙ্গে মিডিয়ার মুখোমুখিতে টিম ম্যানেজার ও বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘মনে হয় না বিশ্বকাপের জন্য রোডসকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এক বছর ধরে সে জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করছে। বিসিবি ও রোডসের উভয়ের সমঝোতায় কাজটি হয়েছে। আমি মনে করি বিসিবির প্রত্যাশা সে পূরণ করতে পারেনি।’ মাসখানেক আগেও হয়তো ঘূর্ণাক্ষরে এমন কিছু ভাবেননি স্টিভ রোডস; গত বছর বলেছিলেন, বাংলা শেখার চেষ্টা করছেন। এ বিশ্বকাপেই এক সাংবাদিককে মজা করে বলেছিলেন, বিশ্বকাপের পর বিদ্যাটা ভালো করে ঝালিয়ে নিতে চান। আপাতত শুধু ‘বিদায়’ শব্দটা শিখেই চলে যেতে হচ্ছে তাকে! বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল খারাপ করায় আপাতত ‘বলির পাঁঠা’ যে রোডসকেই হতে হচ্ছে! তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠে গেছে, মাথাব্যথাটা ‘ক্রনিক’ হয়ে গেলে প্যারাসিটামল খেলেই ভালো হয়ে যাবে? তবে রোডসের বিদায় চমক বলার উপায় নেই। গত বছর যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন বরং খানিকটা বিস্ময় ছিল। আন্তর্জাতিক কোনো দলে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা নেই, ক্রিকেটার হিসেবেও বড় কেউ নন-এমন একজন বাংলাদেশ দলের চাপ কতটা সামলে নিতে পারবেন? বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান রোডসের কোচ ঘোষণার সময় বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে একজন ইংলিশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তারা। রোডসও প্রথম গণমাধ্যম পর্বে বলেছিলেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফাইনালে যাওয়াও অসম্ভব মনে করি না। যদিও এক বছরের মধ্যে স্বপ্ন বুদবুদ হয়ে মিলিয়ে গেছে টেমস নদীতে। শুধু রোডসকে দায়ী করা উচিত নয়। ইংলিশ কোচকে নিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ধারণা, আসলে পরিস্কার হয়ে গেছে প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই। দারুণ সদালাপী মানুষ, নিপাট ভদ্রলোক, কথাও বলতে ভালোবাসেন। কিন্তু পরিকল্পনা বা কৌশলগত ব্যাপারে ঠিক ঝানু নন। সেটা গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক ক্রিকেটার ফাঁস করেছিলেন গণমাধ্যমে। সেটা হয়তো খুব বড় সমস্যা ছিল না। কাউন্টির সবুজ মখমল থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রুক্ষ চত্বরে মানিয়ে নেওয়ার জন্যও একটু সময় দরকার; রোডসকে দিতে কারও আপত্তি ছিল না, অন্তত বিশ্বকাপ পর্যন্ত।
ইংলিশ কন্ডিশন হাতের তালুর মতো চেনা থাকার কথা, আর লম্বা বিশ্বকাপে সেই জ্ঞান খুব করেই দরকার ছিল বাংলাদেশের। সমস্যা হলো ওভালে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে যখন বাংলাদেশ উইকেট পড়তে ভুল করল; ২৬০-২৭০ রান যেখানে পার স্কোর, সেখানে দ্রুত ব্যাট চালাতে গিয়ে বাংলাদেশ অলআউট ২৪৪ রানে! কোচের ভূমিকা সেখানেও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এরপরও হুট করে চলে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি তাতে। এর চেয়ে অনেক বেশি বিতর্কের মধ্যে গিয়েও চাকরি টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন সাবেক কোচরা। আসলে এক বছর কোচ যাচাই করার জন্য কতটা যথেষ্ট, প্রশ্ন উঠতে পারে। বিসিবির আনুষ্ঠানিক ভাষ্য, দুই পক্ষের সম্মতিতে চুক্তি বাড়ছে না। ব্যাপারটা ভদ্রভাবে ‘আপনার কাল থেকে আর আসার দরকার নেই, ফাইলপত্র গুছিয়ে নেবেন’ গোছের কিছু, বলার অপেক্ষা রাখে না। সমস্যা ‘সময়’ নিয়েই; এমনিতে বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের চুক্তি বিশ্বকাপের পর শেষ হয়েছে, সেটা নতুন করে বাড়ছে না। কোচিং স্টাফের মধ্যে ব্যাটিং কোচ নিল ম্যাকেঞ্জিও পূর্ণকালীন নন। স্পিন বোলিং কোচ সুনিল যোশির বেতন দেওয়া হয় দিন মাফিক, তারও থাকার সম্ভাবনা কম! বিশ্বকাপ শেষেই কোচিং স্টাফ ফাঁকা! তবে ভবিষ্যতে কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে বিসিবিকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ