বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দুধেও ক্ষতিকর উপাদান

দেশে দুধে পানিসহ ভেজাল মেশানোর কর্মকান্ড অনেক পুরনো হলেও সাম্প্রতিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর কিছু তথ্য। বিভিন্ন কোম্পানির প্যাস্টোরাইজড বা পাস্তুরিত দুধে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিপদজনক। অন্য অনেক খাদ্যপণ্যের মতো দুধেও যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও আরো কিছু উপাদান মেশানো হচ্ছে- এ ব্যাপারে বেশ কিছুদিন ধরেই জনগণের মধ্যে জোর আলোচনা চলছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক তার পরীক্ষায় দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পেয়েছিলেন। অর্থাৎ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক মেশাচ্ছিল। কথাটা প্রকাশ করার পর ওই অধ্যাপককে প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বৃহত্তর জনস্বার্থে অধ্যাপক আ ব ম ফারুক তার পরীক্ষা ও গবেষণা বন্ধ করেননি। সময়ে সময়ে তিনি পরীক্ষার ফলাফলও প্রকাশ করছিলেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল ওই অধ্যাপকের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল।
একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎপর হয়েছিলেন উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিরাও। তারা এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে সঠিক তথ্য জানানোর জন্য সরকারের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআইয়ের প্রতি নির্দেশ জারি করেছিলেন। সে নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পরমাণু শক্তি কমিশন, আইসিডিডিআরবি, এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি নামে সমধিক পরিচিত বিসিএসআইআরসহ উন্নত মানের কয়েকটি ল্যাবরেটরিতে বাজারের বিভিন্ন পাস্তুরিত দুধ, খোলা দুধ এবং গোখাদ্য পরীক্ষা করিয়েছে। সব পরীক্ষাতেই দুধে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপিত রিপোর্টে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিএসটিআইয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১৪টি কোম্পানির মধ্যে ১১টির দুধেই সিসার উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিটি কোম্পানিরই দেশের বাজারে যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে এসব কোম্পানির নামও প্রকাশ করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো এত বেশি প্রচারণা চালায় যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তো বটেই, স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের পক্ষেও একথা কল্পনা করা সম্ভব হয় না যে, ‘বিখ্যাত‘ এসব কোম্পানিই জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। সেটাও আবার বিএসটিআইসহ সরকারি ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের চোখের সামনে এবং এতটা প্রকাশ্যে। উল্লেখ্য, গরুর খোলা দুধে অণুজীবের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪ থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত। এই অণুজীব অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে গরুর শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সে কারণে হাইকোর্ট বেঞ্চের মাননীয় বিচারপতিরা খামারীদের উদ্দেশে দেয়া নির্দেশে বলেছেন, তারা যাতে পশু চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া কোনো গাভীকেই অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ায়। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সিসা ও অন্যান্য উপাদান মিশ্রণকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়ে আগামী ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট দাখিল করার জন্যও মাননীয় বিচারপতিরা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কোম্পানির দুধে কি পরিমাণ ব্যাক্টেরিয়া, অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে সে সম্পর্কেও রিপোর্ট দাখিল করতে বলেছেন মাননীয় বিচারপতিরা।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুধের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যত খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী কোম্পানিই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তো জানানো হচ্ছেই, সেই সাথে আসছে বিভিন্ন পরামর্শও। এরকম একটি পরামর্শে জনগণকে অন্তত ১৫ দিনের জন্য দোষী কোম্পানিগুলোর দুধ এবং দুগ্ধজাত অন্যান্য পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এই পরামর্শ যারা দিয়েছেন তারা মনে করেন, জনগণ কেনা বন্ধ করলেই কোম্পানিগুলোর উচিত শিক্ষা হবে এবং তারা আর জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পাবে না। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে যদি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং বিএসটিআইসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তৎপর হয়ে ওঠে তাহলেই দুধে বিষাক্ত উপাদান মেশানো বন্ধ হতে পারে। পরামর্শদাতারা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন, পাস্তুরিত দুধ জীবন রক্ষাকারী কোনো পানীয় বা খাদ্য নয়। সে কারণে ১৫ দিন বা এক-দেড় মাস দুধ না খেলেও তেমন ক্ষতি হবে না। বরং বাঁচা যাবে সিসা, ব্যাক্টেরিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রভৃতির ভয়ংকর ক্ষতির কবল থেকে।
দুধের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তরল খাদ্যে যারা কেবলই মুনাফার লোভে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে জনগণের সর্বনাশ করছে সে সব কোম্পানির বিরুদ্ধে আমরা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন। সরকারের উচিত ঘটনাক্রমে পরীক্ষা করার এবং কেবলই উচ্চ আদালতের নির্দেশে তৎপর হওয়ার পরিবর্তে অনুমতি দেয়া থেকে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের কঠিন পদক্ষেপ নেয়া, যাতে কোনো কোম্পানির পক্ষেই দুধে ভেজাল বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান মেশানো সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ