শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

চাকরী ছেড়ে সফল ব্যবসায়ী হতে হলে যা প্রয়োজন

জাফর ইকবাল : নানা কারণেই অনেকে চাকরী ছেড়ে দিচ্ছেন। কেউ নিজে কিছু করার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ প্রতিষ্ঠানের উপর রাগে ক্ষোভে চাকরী ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে যারাই চাকরী ছাড়ার বিষয়ে ভাবছেন তাদের কিছু বিষয়ে অবশ্যই চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে চাকরী ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করতে গেলে কিছু বিষয়ে আগে থেকেই নিশ্চিৎ হতে হবে।
কারণ প্রথমবারের মত চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় পুরো সময় দেয়াটা অনেকটা পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার মত। বেঁচে গেলে দারুন একটি অভিজ্ঞতা। সবাই আপনাকে বাহবা দেবে, নিজেও বিরাট কিছু অর্জন করবেন। কিন্তু একটু এদিক সেদিক হলেই আর দেখতে হবে না! অন্য যে কোনও কাজে নামার চেয়ে এই কাজে আপনাকে অনেক বেশি বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় “আম, ছালা” সবই যাবে।
০১. শুধুমাত্র একটি আইডিয়া, কিছু স্যাম্পল বা প্রটোটাইপ, সার্ভিস ডেমো বা এই ধরনের জিনিসপত্র হাতে থাকাটা ব্যবসায় পুরোপুরি নামার জন্য যথেষ্ঠ নয়। আপনার হাতে এমন কিছু থাকতে হবে যা সত্যিকার লাভজনক ব্যবসার সৃষ্টি করবে। আপনার কাছে যা-ই থাক না কেন, তার পেছনে একটি ভালো পরিকল্পনা ও প্রমাণিত বিজনেস মডেল থাকতে হবে। এবং এটা কতটা লাভজনক হতে পারে তার বাস্তব সম্মত তথ্য আপনার হাতে থাকতে হবে। শুধুমাত্র একটি আইডিয়া বা হঠা‌ৎ আসা সুযোগের ওপর ভিত্তি করে এতবড় ঝুঁকি নেয়া আজকের দিনে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
০২. আপনার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব কখনওই আপনার সত্যিকার ক্রেতা বা গ্রাহক নয়। আপনি যদি একটি অনলাইন ফ্যাশন স্টোর খোলেন, এবং তার গ্রাহক যদি হয় শুধুমাত্র আপনার পরিচিত মানুষ আর আপনার ব্যক্তিগত ফেসবুক বন্ধুরা তবে বলতেই হচ্ছে, আপনি এখনও কোনও ‘সত্যিকার’ ক্রেতা পাননি। আর এই অবস্থায় সবকিছু বাদ দিয়ে সেই ব্যবসার পেছনে লাগাটা মোটেও ভালো কিছু নয়। আপনার টার্গেট কাস্টোমার, সাধারন ভোক্তা, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা-যে-ই হোক না কেন, আপনার পরিচিত গন্ডির বাইরের মানুষ যতক্ষণ আপনার পন্য বা সার্ভিস না নিচ্ছে-ততক্ষণ বলা যাবে না যে আপনার সত্যিকার ক্রেতা আছে।
০৩. এক্সপেরিমেন্ট করে আপনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন আপনার ব্যবসা ভবিষ্যতে ভালোই চলবে, এবং আপনার সত্যিকার ক্রেতার সংখ্যাও একটু একটু করে বাড়ছে। কিন্তু একটি ব্যবসা সত্যিকারের ‘রানিং’ হতে ও নিয়মিত লাভ উঠে আসতে ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এর মানে হচ্ছে, আপনার ব্যবসা হয়তো ভালো চলছে, কিন্তু যতটা প্রয়োজন, ততটা অর্থ এখনও ব্যবসা থেকে আসছে না-যা দিয়ে আপনি ‘মাছের তেলে মাছ ভাজার’ মত করে ব্যবসার লাভ থেকেই ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারছেন।
০৪. সব উদ্যোক্তাই যে তাদের চাকরিকে অপছন্দ করেন তা কিন্তু নয়। টেক্সটাইল মেশিনারিজ মার্কেটিং করাটা শুধু তার চাকরী নয়, এটা তার ফ্যাশন। সেইজন্যেই তিনি এটাকেই ব্যবসা হিসেবে বেছে নিতে চাচ্ছেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি যে কাজ করবেন, ব্যবসাতেও প্রায় সেই একই কাজ করবেন। এবং কাজটিকে তিনি যথেষ্ঠ উপভোগ করেন।
০৫. আপনি যদি চাকরিজীবি অবস্থা থেকে ব্যবসায়ে নামার পরিকল্পনা করেন, তবে ধরে নেয়া যায় বর্তমানে আর্থিক দিক দিয়ে আপনার তেমন একটা শক্ত অবস্থান নেই (যদি না আপনার পেছনে এক বা একাধিক বাঘা ইনভেস্টর থাকে)। এই ক্ষেত্রে আপনাকে একটু সাবধানে পা ফেলতে হবে, বিশেষ করে আপনি যদি দারুন প্রতিযোগিতাপূর্ণ কোনও ব্যবসায় নামতে যান। আপনি যদি একদম ছোট থেকে শুরু করেন, আপনার পন্য বা সেবা প্রস্তুত করতে যে পরিমান খরচ হয়, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তারচেয়ে অনেক কম খরচে তা প্রস্তুত করতে পারে। অনেক সময়ে নতুন প্রতিযোগীদের বাজার থেকে তাড়াতে বড় কর্পোরেশন গুলো রীতিমত লস দিয়ে তাদের পণ্য বিক্রী করে। তাদের অন্যান্য অনেক পণ্য বাজারে থাকার কারণে এই লস তারা পুষিয়ে নিতে পারে। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগের এই সুবিধা না থাকার কারণে তারা প্রতিযোগীতায় টিঁকতে পারে না।
০৬. দু:খজনক হলেও সত্যি যে নতুন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগুলোর অর্ধেকই শুরুর ৫ বছর পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তিন ভাগের এক ভাগ কোম্পানী ৩ বছরের মধ্যে তাদের মূলধন খুইয়ে বসে। আরও একভাগ ক্ষতির মুখে না পড়লেও লাভও করতে পারে না, অর্থা‌ৎ তাদের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয় না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও একটা সময়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোনও ব্যবসা ৩ বছরের ভেতর নিয়মিত লাভ করলে এবং ৫ বছরের বেশি টিঁকে গেলে, তার বড় কোম্পানী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটা ঠিক যে ব্যবসায় পূর্ণ মনযোগ ও সময় দেয়ার জন্য আপনি ৩ থেকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে চাইবেন না। এবং এটা যুক্তিযুক্তও নয়।
০৭. নিজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারাটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আপনার ওপরে যখন একজন বস থাকবেন, এবং আপনি জানবেন যে আপনার ওপর সব সময়ে নজরদারী করা হচ্ছে, তখন আপনি এমনিতেই আপনার নির্ধারিত কাজ মনযোগ দিয়ে করবেন। কিন্তু যখন আপনি নিজেই আপনার নিজের বস, এবং আপনার ওপর নজর রাখার কেউ নেই, তখন পূর্ণ মনযোগে কাজ করাটা বেশ কঠিন। কারণ আপনি চাইলেই কাজ থেকে ছুটি নিতে পারছেন। পরিশ্রমের মাঝে চাইলেই একটু আরাম করতে পারছেন। কিন্তু একটি ব্যবসাকে দাঁড় করাতে গেলে একাগ্র মনে গভীর ভাবে কাজ করাটা খুবই জরুরী। আর এজন্য আপনাকে নিজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। নিজেকে শাসন করা শিখতে হবে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারলে অন্যদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।
০৮. মিজান টেক্সটাইল মেশিনারিজ মার্কেটিং এ অনেক বছরের ক্যারিয়ার, এবং এই ক্ষেত্রেই ব্যবসা করতে চাচ্ছেন। কারণ, তার এই ফিল্ডে যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা আছে। তিনি নি:সন্দেহে একটি ভালো কাজ করছেন, এবং বলাই যায় তার সফল হওয়ার একটি ভালো সম্ভাবনা আছে।
০৯. একজন ব্যবসায়ীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ গুলোর একটি হল তার নেটওয়ার্ক। আপনার যদি সঠিক জায়গায় সঠিক লোক থাকে, তবে ব্যবসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সরকারী কর প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন সরবরাহকারী, পাইকার-ইত্যাদি জায়গায় বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ থাকা মানে আপনার ব্যবসায়ে অনেক সুবিধা হওয়া। প্রয়োজন মত ঋণ পাওয়া, ধারে পন্য পাওয়া, টেন্ডারে কাজ পাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে ‘পরিচিত’ মানুষ অনেক সাহায্য করতে পারে। আপনার ব্যবসার পণ্য বা সেবার উন্নয়নের সাথে সাথে এই সম্পর্কগুলোর উন্নয়নও জরুরী। ব্যবসা শুরুর অনেক আগেই আপনি আপনার সহপাঠী, আত্মীয়দের কে কে এসব পর্যায়ে আছে-তা খুঁজে বের করে এদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন। এই সম্পর্কগুলো আপনার মূলধন হিসেবে কাজে লাগবে।
১০. সঠিক জায়গায় সঠিক ‘বন্ধু’ থাকার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করুন প্রয়োজনের সময়ে পরামর্শ দেয়ার জন্য আপনার গুরু বা মেন্টর রয়েছেন। এটা একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য খুবই জরুরী।
১১. পৃথিবীর কোনও ব্যবসায়ীই বলতে পারবেন না যে ব্যবসা করতে গিয়ে তাকে চাপ নিতে হয়নি বা বড় কোনও ধাক্কা সামলাতে হয়নি। সফল উদ্যোক্তা তারাই যারা চাপের মাঝেও ঠান্ডা মাথায় নিজের কাজ করে যেতে পারেন। যে কোনও ধাক্কা সামলানোর মত মানসিক দৃঢ়তা একজন সফল উদ্যোক্তার অপরিহার্য একটি গুণ।
পরিশিষ্ট: একটি নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবন ছেড়ে, আরও বড় সাফল্যের আশায় অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানো নি:সন্দেহে একটি সাহসী কাজ। এই সাহস করার কথা ভাবতেই পারে পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষ। এবং আপনি যদি তাদের একজন হন, তবে বলাই যায় আপনি একজন অসাধারন মানুষ। অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে হলে ঝুঁকি নিতেই হয়। পরিকল্পনা হয়তো আপনাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু এটা আপনাকে অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। প্রবল অন্ধকারেও আপনার হাতে মশাল হয়ে জ্বলে এই প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ