শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

গাছের কষে কোটি টাকা

-ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ
লক্ষ জাতের সবুজ শ্যামল বৃক্ষরাজির সৌন্দর্যে ঘেরা এই বিশ্ব চরাচর। কোটি কোটি মাখলুকাতের জীবনোপকরণ সরবরাহকারী বৈচিত্র্যময় এই গাছ গাছালি। সবুজ পাতার সমারোহে ভরপুর সুন্দর ফুল ফলের চোখ জুড়ানো এই সুখ মেলা। ফুল ফলের সুঘ্রাণ আর সুমিষ্ট সুস্বাদুতায় মোহমুগ্ধ বিশ্ব জগতের প্রানীকুল। জগতভরা প্রাণীকুলের নি:সৃত কার্বন-ডাই-অক্সাইডমালাকে বৃক্ষরাজির জীবনীশক্তি আর বৃক্ষরাজির নিঃসৃত অমূল্য সম্পদ অক্সিজেনমালাকে প্রাণীকুলের জীবনী শক্তি হিসেবে সরবরাহের প্রাকৃতিক চক্রমালা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহপাক সৃষ্টির আদি থেকে প্রকৃতিগতভাবে চালু করে দিয়েছেন। গোলাপ, চামেলী, জুই, চম্পা, রজনীগন্ধা,বেলী, চাঁপা আরো কত রস কষে ভরপূর মূল্যবান ফুল আর ফুলের বাগান আমরা মনের সুখে চোখের মোহে দেখে দেখে সীমাহীন তৃপ্ত হয়ে থাকি। তারপরও যেমনী করে এ সব নেয়ামত শেষ হয় না, তেমনি পিপাসাও থাকে বাকি। আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, কমলা, আপেল, আংগুর, বেদানা, বেল, আতা এসব আমরা বার বার খেয়ে তৃপ্ত হই , দেহ আর মনের গঠন পরিগঠনে কাজে লাগাই। এর পরও চোখের আড়ালে রয়ে গেল সীমাহীন ফলরাজীর বহর। মন চায় আরো বেশী করে খেতে। অনুরূপভাবে বনজ ও ঔষধী যে সব গাছ গাছালী এদেশে সেদেশে বিশ্বজাহানে সবুজ শ্যামল লতা পাতায় সাজানো এ সবই প্রাণীকুলের কল্যাণে, রোগ শোকের নিরাময়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। কত শত কোটি টাকার সম্পদ এভাবে বনে জঙগলে উৎপাদিত হয়ে মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে তার হিসাব কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছেই মওযুদ। 
বিশ্ব জুড়ে স্থলবন্দর, বিমানবন্দর আর নদীবন্দর ব্যবহার করে কোটি কোটি মানুষের আগমন নির্গমন হয়ে আসছে সৃষ্টির আদি থেকে। তেমনি করে আমদানী রপ্তানী হচ্ছে অসংখ্য জাতের পশু পাখী আর হাজার জাতের প্রাণীকুল। আনাগোনা হয়ে আসছে খনিজ, জলজ, স্থলজ সব জরুরী সম্পদরাজী যুগ যুগ ধরে। এতো সবের হিসাব রাখার সময় সুযোগ আর যোগ্যতা কত জনের রয়েছে ? অনবরত অগণিত মনোমুগ্ধকর ফুল ফলও মানবকুলের সামনে দিয়ে আমদানী রপ্তানী হয়ে আসছে। জ্ঞানী গুণী আর খোদাভীরু লোকেরা এতোসব ভেবে চিন্তে শুকরিয়া স্বরূপ আল্লাহর সিজদায় পড়ে যায়।
 বিশ্ববাজারের মত বাংলাদেশও এতো সব পণ্য সামগ্রীর আমদানি রপ্তানির প্রযুক্তি চলমান। বাংলাদেশেও তেমনী নদীবন্দরের অন্যতম সেরা একটি বন্দর হল চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দর ব্যবহার করে শুধু মানুষই আগমন নির্গমন হয় না, বরং এখান দিয়ে অগণিত মাল সম্পদের আমদানী রপ্তানীতে বিশ্ববাজারের ভারসাম্যও রক্ষা করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে যে সব মালপত্র নদীপথে এই চট্টগ্রাম বন্দরে আসে তাকে বলে আমদানী। আর যে সব মাল এ দেশ থেকে বাহিরে পাঠানো হয় তাকে বলে রপ্তানী। বিদেশ থেকে রাত দিনে সারাক্ষণ কি পরিমাণ এবং কত ধরনের মালপত্র আমদানী হচ্ছে তার হিসাব করা কঠিণ। একই অবস্থা রপ্তানীর ব্যাপারেও। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অগণিত মালপত্র এই বন্দর দিয়ে আমদানী রপ্তানী হয়ে আসছে। সৃষ্টির আদি থেকেই এ দৃশ্য চলে আসছে। যত মাল এখান দিয়ে আমদানী হচ্ছে তন্মধ্যে বিচিত্র ধরনের নাইলন সুতা একটি। অতি সুক্ষ্ম,সরু, মজবুত , উন্নত ও বিচিত্র জাতের সুতার এক ধরনের জাল এ বন্দর দিয়ে আমদানী হয় যা দেশীয় শিল্প কারখানাসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ।
 আমরা যে সুতার বস্ত্রসমূহ পরিধান করে থাকি তার অধিকাংশই দেশীয় সুতার তৈরী। এ সব সুতা তৈরী করা হয় তুলা থেকে। এই তুলা উৎপন্ন হয় কার্পাস তুলাগাছ থেকে। তুলা তৈরীর আরেক প্রকার গাছ হল শিমুল গাছ। শিমুল আর কার্পাস তুলা গাছের উৎপাদিত তুলা দিয়েই সব সুতি কাপড়ের চাহিদা পূরণ করা হয়। মানবজাতির চাহিদানুসারে বস্ত্রের উৎপাদনে প্রাকৃতিক জগৎ প্রস্তুত নানানভাবে। তাই প্রয়োজনীয় তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যেই চাষীরা তুলাগাছের আবাদ করে থাকে। তুলা থেকে সুতা, আর সুতা থেকে কাপড় তৈরীর জন্য দেশে বিরাজমান শত শত সুতার মিল আর কাপড়ের মিলের প্রতিষ্টা করা হয়েছে।
সেখানে আধুনিক সব প্রযুক্তির মেসিন ব্যবহার করে সঠিক বুদ্ধি আর কলা কৌশল প্রয়োগে বিশ্ব ব্যাপী নানান জাতের কাপড়ের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। আরামদায়ক সুতি কাপড়ের যত চাহিদা বিশ্বব্যাপী রয়েছে তার সবই ঐ তুলাচাষের ফসল। চাহিদা পূরনে তেমনীভাবে পাটের সুতায় তৈরী কাপড়ও বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত হয়ে আসছে।   
কিন্তু ঐ যে উন্নত মানের নাইলন সুতার আমদানী হয় , তা আসে আমেরিকা আর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। আসে আরো অন্যান্য দেশ থেকেও। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন আমদানী হয় শত শত কোটি টাকার বিশেষ গুণের এই নাইলন সুতার কাঁচা জাল। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায় যে ,এই সব সুতার উৎপাদন হয় বিচিত্র ধরনের গাছের কষ থেকে। ঐ সব সুতাগাছের নিছক কষই যে প্রযুক্তির সহযোগীতায় কোটি টাকা মূল্যের সুতা জাতীয় সম্পদে পরিনত হয়ে দেশ বিদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এটাই বিশ্ব বিধাতার অভিনব প্রকৃতি ও প্রযুক্তি ।
বিশ্ব প্রযুক্তি মেলার আরেক মেলা হল এই নাইলন সুতা পাকা করার প্রযুক্তি। বাংলাদেশের সোনার গাও শিল্প নগরী ঘুরে দেখা গেল ট্রাকের পর ট্রাক ভর্তি ঐ সব সুতার জাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শত শত টন এই এলাকায় আনা হচ্ছে। উন্মুক্ত মাঠ জুড়ে সুতার জালগুলি আলাদা  করা হয়। চিকোন সেই সুতা বৈদ্যুতিক মেসিনের  সহযোগিতায়  পাকানো হয়। পাকানো সুতার নালগুলি একটি অন্যটির সাথে মিশিয়ে আবার পাকানো হয়। ্এভাবে পাকানো সুতার বান্ডিলই বিভিন্ন মার্কেটে সরবরাহ করা হয়। যত ধরণের মোটা সুতার চাহিদা বাজারে থাকে তত মোটা সুতা পাকা করে তার বান্ডিল ট্রাক ভর্তি করে বাজারজাত করা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। বিশ্ব ব্যবসায়ীদের মত লাভবান হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীগণও। শত শত বেকার যুবক মাসে ২০ -২৫ হাজার টাকা আয় করে স্বাবলম্বীতা অর্জন করে চলেছে। এলাকার অসচ্ছল সব মানুষেরা সচ্ছল ও ধনী হয়ে উঠছে। নাইলনের মজবুত ও পাকা সুতা ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের কাপড় ও জাল তৈরী করা হয়। কিন্তু এ সুতার মূল ব্যবহার হয় বড় বড় জাহাজ, মিলকারখানা এবং অন্যান্য শক্ত কাজে ব্যবহৃত মজবুত রশির কাজে।
লোহার মত শক্ত এসব রশি লোহার গেরাফিতে বাধা হয়। ঐ গেরাফি নদীর কিনারে ফেলে দিয়ে দ্রুত শ্রোত ধাবমান নদীতে লঞ্চ বা জাহাজ আটকিয়ে রাখা হয়। মিল কারখানায় অনুরূপ মজবুত আটকানোর কাজে অতি শক্ত এই নাইলন সুতা ব্যবহার করা হয়। জেলেরা সাগরে বা নদীতে যে সব বড় বড় জাল দিয়ে অনবরত বড় মাছ, ছোট মাছ ধরতে থাকে ঐ জালও এই মজবুত নাইলন সুতা দিয়ে তৈরী করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ