মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

উন্নতির পূর্ব শর্ত সততা ও দক্ষতা

“দক্ষ পেশাজীবিতেই জাতীয় উন্নতি” নামক সেমিনারে সচেতন শিক্ষাবিদদের মাঝে অতি মূল্যবান এক বিষয়ের উপর আলোচনা করেন প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন জাতীয় শিক্ষক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তার আলোচনার মূল্যবান বিষয় ছিল- সালেহিয়াত ও সালাহিয়াত। সালেহিয়াত হলো সততা। আর সালাহিয়াত হল দক্ষতা। সততা আর দক্ষতার সমন্বয়েই আসে উত্তম পেশা বা গুড প্রফেসনাল। দক্ষতায় শুধু ব্যক্তির সম্মান সমৃদ্ধিই আসেনা। দক্ষতায় গড়ে উঠে  উন্নত জীবন ,উন্নত জাতি।
 মহানবী (সা:) এর জীবনে দক্ষ পেশাজীবিতে উন্নত সোনার মদিনা গড়ে উঠে ছিল। একদল মর্দে মুজাহিদের সুদক্ষতা ও সততায় আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হয়ে আজও বিশ্ববাসীর  কাছে সোনার মদিনাই বিরাজমান। সেই মদিনার একটি চমৎকার ঘটনা আছে। রাসুলের কাছে এসে এক যুবক অভাব মুক্তির পথ চাইল। রাসুল (সা:) তাকে বিয়ে করতে বললেন। যুবকটি বিয়ে করল। কিন্তু তার অভাব পুরন হলনা। সে এসে রাসুলকে তার অভাবের কথা আবার জানাল। রাসুল (সা:) তাকে আরো একটি বিয়ে করতে বললেন। যুবকটি তাই করল। কিন্তু যুবকের অভাব শেষ হয়না। তাই সে আবার রাসুলের কাছে এসে অভাব পূরনের পথ চাইল। রাসুল (সা:) এভাবে তাকে চতুর্থবারের মত অভাব পূরণের জন্য যুবকটিকে আরো একটি বিয়ে করতে বললেন। এবারের স্ত্রীটি সেলাই কাজে ছিল সুদক্ষ। সে যুবকের সংসারে এসে সেলাই কাজে মনোযোগী হল। দক্ষতার সাথে যুবকের স্ত্রী সেলাই কাজ করে। যুবক সে জামা কাপড় বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। তার মালের চাহিদা বাজারে বেড়ে যায়। এবার যুবকের তিন স্ত্রী মিলে চতুর্থ স্ত্রীর সেলাই কাজে সহযোগীতা করা শুরু করে। যুবকের ব্যবসায়ে উৎপাদন বাড়ে। বিক্রিও বাড়ে। ফলে আয়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। যুবকের অভাব পূরণ হয়। সংসার তার সুখে ভরে যায়। একজন সুদক্ষ স্ত্রীর কর্মম্পৃহায় কর্মহীন তিন স্ত্রী সক্রিয় হয়ে যায় । পরিবারটি পরে সুখী পরিবার হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করে। পরিবারের বোঝা বলে কথিক তিনজন অথর্ব স্ত্রী পেশাজীবিতে পরিণত হয়ে গেল। পুরা পরিবারের উপর সাফল্য এনে দিল। যুবকের পরিবারটি এভাবেই উন্নত পরিবারে রূপ নিল। এভাবেই উন্নত মানুষের উন্নত পরিবার গড়ে উঠে। আর উন্নত পরিবারেরাই মিলে মিশে গড়ে তোলে উন্নত জাতি। এ ব্যাপারে ইংরেজী এক প্রবাদ হলো- To be important is nice, to be nice is very nice. অর্থ্যাৎ আবশ্যক হওয়া সুন্দর, আর সুন্দর হওয়া খুবই সুন্দর। লেন, দেন, কথাবার্তায় যে সুন্দর তাকেই বুঝানো হয়েছে। আচরণ, কর্মকান্ড আর চরিত্রে যে সুন্দর তাকেই বুঝানো হয়েছে। ধর্মকর্মে যে সুন্দর তার পেশাগত জীবনও সুন্দর ও সফল হবে। ধার্মিক মানুষেরা শিক্ষা দীক্ষা, কাজে কর্মে আমাদের কাছে পছন্দনীয় ও কারিগরি মর্যাদায় সমাসীন হবে। সেইতো দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম মানুষ। তাদের দ্বারাই গড়ে উঠে উত্তম সমাজ ও উত্তম দেশ। তার ডাকেই মানুষ সাড়া দিবে। কোরআন পাকে এজন্যেই মুসলিম জাতিকে সম্মোধন করে  সূরা আল ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহপাক বলেন- ‘কুনতুম খাইরা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্নাস তা’ মুরুনা বিল মা রূফ ওয়াতান হাওনা আনিল মুনকার।’ অর্থ্যাৎ “তোমরাই সর্বোত্তম জাতি। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানব কল্যাণের জন্যে। তোমরা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।” কিন্তু সেরা সেই মুসলিম জাতি আজ  অভাব, দৈন্যতা আর পরাজয়ের গ্লানীর যাতাকলে নিষ্পিস্ট ও বিপর্যস্ত। কি দুর্ভাগা এই মুসলিম জাতি।
এতো কিছুর পরও তারা ঘুমিয়ে আছে। অভাব অন্টন আর  জীর্ণতা দীনতায় মহাবিপর্যস্ত মুসলমান আজও  আত্মকোন্দল, দলাদলি আর দ্বিধা দ্বন্ধে শতভাগে বিভক্ত হয়ে কেঁদে মরছে। সেরা সেই জাতি আজ ভুলে গিয়েছে নিজের জাতি সত্তা ও গৌরবের ইতিহাস। চারিদিকে আজ মুসলমানের উপর অমুসলিমদের সীমাহীন অত্যাচার আর নির্যাতন চলছে চরমভাবে। মুসলিম জাতি সত্তা আজ একেবারেই ভুলুন্ঠিত।
আজকের দিনে তাই সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াল্ড এসেম্লি অব মুসলিম ইয়থ। তাদের আওয়াজ হল, মুসলমানের কোন বন্ধু নেই। মুসলমানের বন্ধু মুসলমানই শুধু। মুসলমান প্রকৌশলীগণকে তাদের দক্ষতা দিয়ে বিশ্বকে জয় করতে হবে। এভাবেই পেশজীবি সব ডাক্তার, উকিল, সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী, ওয়ায়েজিন, গণ প্রতিনিধিকে  নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবী হতে হবে। তবেই আমরা উন্নত জাতি গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
চট্টগ্রামের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ধারে, পাঁচ তারা হোটেল সিগালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শান্ত স্নিগ্ধ নীরবতার আকর্ষণীয় চিত্তাকর্ষক সেই মূল্যবান সেমিনারটি উক্ত পেশজীবীদেরকে ওয়ার্ল্ড মুসলিম এসোসিয়েশন (ওয়ামী )উপহার দিল। ধন্যবাদ ওয়ামীকে। ওয়ামীর পরিকল্পনা মোতাবেক দুই দিনের ঠাসা কর্মসূচীতে শুরু হয় সূরা হুজুরাতের প্রথম ১৮ আয়াতের সুললিত কন্ঠের তেলাওয়াত, তরজমা ও চমৎকার ব্যাখ্যার মাধ্যমে । শ্রোতাÑ দর্শকদের মুগ্ধকারী উন্নত মানের ছিল উক্ত আলোচনা। রাসুলের সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা, পাপীদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা ছাড়া বিশ^াস না করা, দুই দল যুদ্ধকারী হলে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, আল্লাহর পক্ষাবলম্বন করা, মুমিনরা পরস্পরকে উপহাস না করা, ঐক্যবদ্ধ হওয়া, অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা না করা, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যকারীদের কোন কর্ম নিষ্ফল না হওয়া, আল্লাহর পথে ধন- সম্পদ আর প্রান বিলিয়ে জিহাদ করা, জিহাদের জন্যই ঈমানদারগণ সৎপথে চলবে, আল্লাহ সবকিছু দেখেন ও জানেন ইত্যাদি মূলনীতির উপর উক্ত আয়াতের  বিস্তারিত আলোচনা থেকে আমরা দারুনভাবে শিক্ষা লাভ করি। সমস্ত জড়তা, পরাজয়, গ্লানী পিছে ফেলে সততা, দক্ষতা, বিজয় আর উন্নতজীবন লাভের মহান শিক্ষা নিয়ে আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে সেমিনার থেকে বিদায় নেই।
-ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ