শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আদালতের এজলাসে খুন

নির্জন রাস্তায় বা অন্ধকার কোনো স্থানে নয়, এবার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে প্রকাশ্যে। সেটাও আবার কুমিল্লা আদালতের এজলাসে এবং একজন বিচারকের সামনে। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, গত সোমবার কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও তৃতীয় দায়রা জজ আদালতে একটি হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলার সময় ওই মামলার আসামী হাসান হঠাৎ একই মামলার অন্য আসামী ফারুকের ওপর ছুরি দিয়ে হামলা চালায়। ধাওয়া খেয়ে আসামী ফারুক দৌড়ে গিয়ে বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে পড়ে। সেখানে তখন বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস তার চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন। অন্যদিকে হামলাকারী হাসান বিচারকের সামনেই আসামী ফারুককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। আক্রান্ত ফারুক প্রথমে বিচারকের টেবিলের ওপর এবং পরে কক্ষের মেঝেতে পড়ে যায়। তার শরীরের রক্তে টেবিল এবং মেঝে রক্তাক্ত হতে থাকে।
অন্যদিকে পুলিশ এসে হামলাকারীকে নিবৃত্ত ও গ্রেফতার করলেও আক্রান্ত ফারুককে বাঁচানো যায়নি। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু ঘটেছে। উল্লেখ্য, হামলাকারী হাসান এবং আক্রান্ত ও পরে নিহত ফারুক দু’জনই ২০১৩ সালে কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জের হাজী আবদুল করিম হত্যার আসামী। আদালতে হত্যাকান্ড যখন ঘটে তখন ২০০৭ সালের অন্য একটি হত্যা মামলার শুনানি চলছিল। এ সময় হাসান ও নিহত ফারুকসহ অন্য আসামীদের আদালতে হাজিরার জন্য আনা হচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, উপস্থিত সকলের মনোযোগ যখন চলমান শুনানির প্রতি ঠিক তখনই মামলার চার নম্বর আসামী হাসান হঠাৎ আট নম্বর আসামী ফারুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। ভয়ে বিচারকের খাস কামরায় পালিয়ে গেলেও আসামী ফারুক তার জীবন বাঁচাতে পারেনি।
আদালতের এজলাসে একজন বিচারকের খাস কামরায় সংঘটিত এ হত্যাকান্ডটি নিয়ে জনমনে একই সঙ্গে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক হত্যা মামলা উপলক্ষে যথেষ্টসংখ্যক পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও একজন খুনের মামলার আসামী কিভাবে আদালতে ছুরি নিয়ে প্রবেশ করতে এবং অন্য এক আসামীর ওপর হামলা চালাতে পারলোÑ সে প্রশ্নই এসেছে প্রাধান্যে। বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমার সামনে একজন আসামীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হলো। আমার ওপরও হামলা হতে পারতো। আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’ একই ধরনের প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও ঘুরে-ফিরে উঠছে। নিহত আসামীর আইনজীবী জানিয়েছেন, ঘাতক হাসান তার ওপরও হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অন্য এক মামলার জন্য আগত একজন এসআইয়ের বাধার কারণে সে ওই আইনজীবীর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার পুরো ঘটনা তদন্ত করার এবং পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যের কোনো অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ওদিকে আদালতের ভীত ও ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা বলেছেন, পৃথিবীর আর কোনো দেশের আদালত প্রাঙ্গণে এত দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে বলে তাদের জানা নেই। তারা আরো বলেছেন, এখানে কর্তব্যে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের কর্মতৎপরতা মোটেই ভালো নয়। আইনজীবীরা একই সঙ্গে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, কুমিল্লার আদালতে সংঘটিত হত্যাকান্ডকে হাল্কাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ঘাতক হাসান শুধু একই মামলার অন্য এক আসামীকে হত্যা করেনি, করেছেও  আদালতের এজলাসে। বড়কথা, নিহত আসামী বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বিচারকের সামনেই উপর্যুপুরি ছুরিকাঘাত করেছে ঘাতক হাসান। এর মধ্য দিয়ে সে শুধু আদালত আবমাননা করেনি, মাননীয় বিচারকের জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। একই কারণে ওই নারী বিচারক জানতে চেয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা কোথায়?
আদালত যে কোনো দেশে জননিরাপত্তার প্রধান স্থান। সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। সে আদালতের এজলাসেই সকলের চোখের সামনে একটি ভয়ংকর হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। আক্রান্ত হতে হতে বেঁচে গেছেন এমনকি বিচারক নিজেও! আমরা আশা করতে চাই, সরকার আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপারে অনতিবিলম্বে তৎপর হয়ে উঠবে এবং বিচারক থেকে বাদী, আসামী, সাক্ষী, আইনজীবী এবং বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ