শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে

গতকাল মঙ্গলবার নয়া পল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। ‘বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের নামে অতীতের মতো কোনো বিশৃঙ্খলা বা ভাঙচুর সহ্য করা হবে না। জনগণ ও রাষ্ট্রের যে কোনো ক্ষতিসাধনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তথ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে একথা বলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভাগীয় পর্য়ায়ে ঘোষিত সমাবেশের কর্মসূচি নিয়ে তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ‘উস্কানিমূলক’। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দম বন্ধ করা বাকশালী শাসনের বহমান অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জনগণকে সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে ইনশাআল্লাহ।
তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, আমি তার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনি (তথ্যমন্ত্রী) যে বিশৃঙ্খলার কথা বলছেন, সেটিই তো উস্কানিমূলক, একটা অশুভ উদ্দেশ্য নিয়েই এ ধরনের বক্তব্য রাখছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ না থাকলে তো কোন সমাবেশই হবে না, নিজেদের আয়োজন নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবো এই কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে, কোনো পাগলে বিশ্বাস করবে? এসব কথা বলে পরিবেশ তিক্ত করছেন তথ্যমন্ত্রী নিজেই।
রিজভী বলেন, পুলিশী তান্ডব, মাস্তানদের তান্ডবের মাধ্যমে বিরোধী দলের সভা পন্ড করার ইতিহাস ঐতিহ্য আপনাদেরই। বিশৃংখলা সৃষ্টি করেন আপনারা। আমাদের সব কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ ছিল, আছে এবং থাকবে। কোন উস্কানিমূলক কথা বলে আমাদের নিবৃত্ত করতে পারবেন না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দম বন্ধ করা বাকশালী শাসনের বহমান অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জনগণকে সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে ইনশাআল্লাহ।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দা্বেিত আগামী ১৮ জুলাই বরিশাল, ২০ জুলাই চট্টগ্রাম ও ২৫ জুলাই খুলনায় সমাবেশ হবে। এই কর্মসূচির ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রিজভী বলেন, জেলা-উপজেলায় প্রস্তুতি সভা চলছে। এই শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে যোগ দিতে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। মহাসমাবেশকে ঘিরে সাধারণ জনগণের অভাবনীয় সাড়া দেখে সরকারের চিত্তচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের শেয়ার বাজার আবারো দৈন্য-দশাগ্রস্ত। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা মানে শেয়ারবাজার কেলেংকারী, লুটপাটের মহোৎসব। আওয়ামী সরকার আর শেয়ার বাজার এক সাথে চলতে পারে না। দেশের অর্থনীতি দুর্নীতির বেড়াজাল দিয়ে ঘেরা বলেই বারবার শেয়ার বাজারে ধ্বস নামছে। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজার থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটের অনুন্নয়ন খাতের সমপরিমাণ এক লাখ কোটি টাকার বাজার মূলধন লুট হয়। এ টাকা ইউরোপ, আমেরিকা, মালেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। কয়েক বছর বিরতি দিয়ে আবারো শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। টানা সাত কার্যদিবস দরপতনের পরে অসহায় বিনিয়োগকারীরা রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করছেন। একটু একটু করে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। গত সোমবার দুপুরে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক প্রায় একশ’ পয়েন্টে পড়ে গেলে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা ডিএসই থেকে বের হয়ে মতিঝিলের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ করছেন। পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারী বলছেন, ২০১০ সালে যে শক্তিশালী চক্র শেয়ারবাজার থেকে পরিকল্পিতভাবে প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারির মূলধন হাতিয়ে নিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছিল, সেই চক্রই আবার বাজারে সক্রিয় হয়েছে। তারা পরিকল্পিতভাবেই এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে। লুটপাটের জন্য পাতানো খেলার মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম প্রভাব ফেলা হচ্ছে। ২০১১ সালে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্তে যাদের নাম উঠে এসেছিল, ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা সেই ‘রাঘব বোয়ালরা’ আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ক্ষমতাসীন দলের রথি-মহারথিরা এই লুটপাটের নায়ক। শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দেয়ার সাত বছর পরও লুটেরা খলনায়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। উল্টো শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সেই সময় শেয়ার কেলেঙ্কারীতে জড়িতদের যে তালিকা করা হয়েছিল সেই তালিকার একজন ব্যবসায়ী এখন মন্ত্রী, আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। শেয়ার কেলেংকারি মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান সারিতে রয়েছেন দেশের তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানরা। তারা শাস্তির বদলে আরো প্রতাপশালী হয়েছেন। সেই প্রতারকরা শেয়ারবাজারে প্রতারণা করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শেয়ারবাজারের টাকা দিয়ে ব্যাংক কিনছেন, জমি কিনছেন,টিভি চ্যানেল দিচ্ছেন। বিদেশে বেগমপল্লী গড়ছেন। এদের প্রতারণা ধরা পড়লেও বিএসইসি এদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারণ তারা এই অবৈধ সরকারের হর্তাকর্তাদের অবৈধ অর্থের যোগানদাতা। তাদের টাকা দিয়ে প্রশাসনকে কিনে নিয়ে রাতে ভোট ডাকাতি করা হয়েছে। এই অন্ধকারের সরকার জনগণের মুখোমুখি হতে চায় না। তারা তেলাপোকার মতো অন্ধকারে বাঁচতে চায়।
 দেশের পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, আপনারা লক্ষ্য করছেন, দেশে আইন শৃঙ্খলার কি ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। সোমবার কুমিল্লা আদালতে বিচারকের খাস কামরায় কি ভয়াবহ নজিরবিহীন নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটেছে। আদালতের বিচারক, কর্মকর্তা, পুলিশ, আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের সামনে একজন আসামী আরেকজন আসামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এই হত্যার শিকার আমিও হতাম কিম্বা এটির শিকার আমার কোনও সহযোগী বা কোনও আইনজীবীও হতে পারতেন। আমাদের নিরাপত্তা কোথায় ? আমাদের আসলে কোনও নিরাপত্তাই নেই।’
রিজভী বলেন, সন্ত্রাস উইপোকার মতো রাষ্ট্র-সমাজকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে। দেশে কি ভয়ংকর পরিস্থিতি হলে একজন বিচারক এজলাসে তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এমন আতঙ্কবোধ করছেন। আর সন্ত্রাসের নিরবচ্ছিন্নতা ও প্রসারে দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছে। দেশজুড়ে কেবল গুম, খুন, ধর্ষণ, হামলা-মামলা, নারী-শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে লোমহর্ষক কায়দায় হত্যাসহ দেশ ভরে উঠেছে অনাচার অবিচারের মহামারিতে। আর অবৈধ সরকার ব্যস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে। প্রশাসন, বিচার ও আইনী ব্যবস্থায় গণবিরোধী প্রতারণামূলক নীতি কার্যকর আছে বলেই এই সকল সরকারী যন্ত্র ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করে আসছে। তাই এই যন্ত্রই ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ভোট বাক্স ভর্তিতে সহযোগিতা করে এবং জনগণকে ভোট কেন্দ্রের ত্রিসীমানায় ঢুকতে না দিয়ে অবৈধভাবে গদি দখলে সরকারকে সহযোগিতা করে কৃপাধন্য হয়েছে। ফলে তারা আর সরকারের আদেশ নির্দেশ তোয়াক্কা করছে না। তারাও এই অবৈধ সরকারকে রক্ষার ব্রত নিয়ে ভোট বঞ্চিত জনগণের প্রতিপক্ষ হিসাবে কাজ করছে। এই রাষ্ট্র কার্যত: অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি দেখে মনে হয় দেশে কোন সরকারই নেই। তাই আমি এই ব্যর্থ সরকারের প্রতি আহবান জানাবো-ক্ষমতা জোর করে বেশী দিন ধরে রাখা যায় না, জোর জবরদস্তির পরিণতি বড় করুণ এবং ভয়ংকর, তাই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ