সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

বন্যার সয়লাব মোকাবিলার জন্য নদী-খালের উদ্ধার ও সংস্কার প্রয়োজন

ড. মোঃ নূরুল আমিন : অব্যাহত বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সারাদেশে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এর ফলে উত্তর ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়ি-ঘর ও ফসলের মাঠ পানির নিচে চলে গেছে এবং মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গৃহহীন মানুষ আশ্রয়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। শুধু আশ্রয় নয় তাদের অন্ন, বস্ত্র এবং গৃহপালিত জন্তু বিশেষ করে গরু ছাগল হাঁসমুরগীর নিরাপত্তা নিয়েও তারা মহাসংকটে পড়েছেন। তাদের চুলা ও রান্নাঘর পানির নিচে থাকায় তারা রান্না-বান্নাও করতে পারছেন না, উপোষ থাকতে হচ্ছে। অনেকের আবার ধান চাল, গৃহস্থালীর দ্রব্য সামগ্রী প্রভৃতিও বন্যায় তলিয়ে গেছে। অঝোর ধারায় বৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল, নদী ভাঙন, পাহাড় ধস প্রভৃতি বহুমাত্রিক প্রভাবে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
বলাবাহুল্য- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াইসহ দেশের প্রধান প্রধান সব কটি নদী, শাখা নদী ও খাল বিলের পানি এখন বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং এর ফলে দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পানির নিচে চলে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোলভীবাজার, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নিলফামারী, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ অনেকগুলো জেলার। সিলেট, বান্দরবান প্রভৃতি জেলার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। লক্ষ লক্ষ লোক পানিবন্দী হয়ে বর্তমানে অমানবিক জীবনযাপন করছে। অনেক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বাঁধের উপর আশ্রয় নেয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তারা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গবাদিপশু, বিশেষ করে যারা আসন্ন কোরবানির জন্য গরু-ছাগল, ভেড়া মোটাতাজা করার সাথে জড়িত ছিলেন তাদের সংকট চরমে উঠেছে। তাদের পশু রাখার স্থান নেই। খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই। বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও, ব্যবসায়ী ও আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার কর্জ নিয়ে তারা পশু মোটাতাজা করছিলেন। বন্যা তাদের সকল স্বপ্ন ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। এই অবস্থায় তাদের আশু ত্রাণ, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের জন্যে সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল কিন্তু কার্যতঃ তা খুবই অপ্রতুল। জেলা প্রশাসন এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বন্যার্তদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তা একান্তই নগণ্য, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তরফ থেকে যে ত্রাণ তৎপরতার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে তার বেশিরভাগই অপ্রাসঙ্গিক। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ, সড়ক ও রেললাইনের ভাঙন দেখা দেয়ায় আন্তঃজেলা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং পড়ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, সারা বাংলাদেশ এখন বন্যাকবলিত। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। সামান্য বৃষ্টি হলে এখন পানিতে প্লাবিত হচ্ছে সড়ক, মহাসড়ক এবং পার্শ্ববর্তী অলিগলি ও জনপথ। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা, এমনকি এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। জলাবদ্ধতা শুধু নয়, পানিতে পায়খানা ও ড্রেনের মল ও ময়লা একাকার হয়ে এক অস্বাস্থ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করছে। পয়ঃনিষ্কাশনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যার তীব্রতা বাড়ছে, এর সাথে বাড়ছে মানুষের ভোগান্তিও। দুর্ভাগ্যবশতঃ মানুষের এই ভোগান্তি ও তার নিরসনের গুরুত্ব যেভাবে মিডিয়ায় কাভারেজ পাবার কথা ছিল তা পাচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় তার সব প্রস্তুতি রয়েছে বলে ঘোষণা করলেও কার্যতঃ তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ত্রাণ তৎপরতা নেই বললেই চলে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো এগিয়ে না আসলে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা খুবই কঠিন হবে।
বন্যা উপদ্রুত এলাকা, নদী ভাঙন এলাকা, পাহাড় ধস এলাকা অর্থাৎ সবরকমের উপদ্রুত এলাকার লোকজনকে উদ্ধার ও তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কম্যুনিটি সেন্টার প্রভৃতিতে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা অপরিহার্য। অনেকে দিনের পর দিন না খেয়ে আছেন। চুলাতে রান্নার সুযোগ নেই। তাদের শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের রান্না করার সুযোগ আছে তাদের রান্নার সামগ্রী দিতে হবে অথবা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করা খাবার ও খিচুড়ি পরিবেশন করতে হবে। আগে বন্যার পানি শুকিয়ে যাবার সাথে সাথে পানিবাহিত রোগের সংক্রমণ দেখা দিতো। বর্তমানে শুরু থেকে মল-ময়লার মিশ্রণে বন্যার ও জলাবদ্ধ পানির যে অবস্থা তাতে পানিবাহিত রোগ শুরু থেকেই দেখা দিচ্ছে। এর হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণের ট্যাবলেট, ওরস্যালাইন, কলেরা, ডাইরিয়ার ওষুধ, নিউমোনিয়া প্রতিরোধ প্রভৃতি জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করা আবশ্যক। মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমগুলোরও ভূমিকা পালন করা দরকার। ফেসবুক, ইউটিউব, সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেল মিলিয়ে আমাদের দেশে অসংখ্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া রয়েছে। এ কাজে তাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারিভাবে এনিজওগুলোর সহযোগিতা আহ্বান করা যেতে পারে। কোরবানির ঈদ সমাগত। সারা দেশে কোরবানির পশু পালনে দেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা বিরাট ভূমিকা পালন করছেন। এই বন্যা তাদের সর্বনাশ করতে বসেছে। বন্যার হাত থেকে পশু রক্ষা করা এবং পশু খাদ্যের ব্যবস্থা করা না হলে কোরবানিতে বিরাট সংকট দেখা দিতে পারে। বাঁধ ভেঙে যাতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত না হয় তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের মেরামতের ব্যবস্থাও করতে হবে। এখন সারা দেশেই আমনের চারা লাগানোর সময়। বন্যার পানিতে লক্ষ লক্ষ একর জমির আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার অথবা বন্যামুক্ত এলাকার স্কুল কলেজ মাদরাসা বা উন্মুক্ত স্থানে চারা উৎপাদন করে বন্যার পানি সরে যাবার সাথে সাথে উপদ্রুত এলাকার চাষিদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে আগামী মওসুমে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীদের বাড়িঘর নির্মাণ, কৃষি পুনর্বাসন প্রভৃতির জন্য কর্জে হাসানা ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
দেশবাসীকে পুনঃপোনিক বন্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নদী ও নিষ্কাশন খালসমূহের সংস্কার ও পুনঃখননের ব্যবস্থা করতে হবে। দেখা গেছে যে, নদী ও খালসমূহে চর পড়ে পানি ধারণ ক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে বৃষ্টি ও উজানে পানি প্রবাহিত হতে শুরু করলে দু’কূল প্লাবিত হয়ে আশপাশের গ্রামে পানি ছড়িয়ে পড়ে এবং বন্যার সৃষ্টি হয়। নিয়মিত খনন কাজ হলে এই সমস্যার সৃষ্টি হতো না। নদী ভাঙনেরও একই কারণ। আবার নদীর উপকূলে বালি তোলার ফলেও নদীর ভাঙন দেখা দেয়। এই আত্মঘাতি তৎপরতা বন্ধ করা দরকার।
শহর নগরসহ গ্রামাঞ্চলের বহু নিষ্কাশন নদী, নালা-খাল প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভরাট করে জমি হিসেবে অথবা তার ওপর ভবন তৈরি করে ভোগ দখল করছে। এর ফলে পানি নিষ্কাশন সমস্যার সৃষ্টি হয়ে, পানিবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। এর অবসান হলে স্বাভাবিক ও কৃত্রিম উভয় বন্যাই নিয়ন্ত্রণ হবে। সরকার যদি তাৎক্ষণিক ত্রাণ, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বন্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন তাহলে দেশবাসী উপকৃত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ