বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খুমেক হাসপাতালে সংস্কার কাজ চলছে ॥ চিকিৎসা ব্যাহত

 

খুলনা অফিস : জরুরি বিভাগ সংলগ্ন প্রধান সিঁড়িটি বন্ধ করে চলছে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের পিলার জোড়া দেয়ার কাজ। ইনডোরে টাইলসও লাগানো হয়েছে কোন কোন জায়গায়। তবে টয়লেটগুলোর অধিকাংশই ভুতুড়ে পরিবেশ। বাতি নেই অনেক টয়লেটেই। দুর্গন্ধে ভাল মানুষও যেন রোগী হওয়ার উপক্রম। বাথরুমের উপর দিয়ে পানি চুষে পড়ছে। পাশ দিয়ে বা উপর দিয়ে কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে। নিচতলার টয়লেটের প্যানগুলো থেকে ভেসে উঠছে ময়লা। সে যেন এক বিশ্রী পরিবেশ। ঠিক এমন পরিবেশেই দেয়া হচ্ছে রোগী সেবা। এ চিত্র খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। সেই প্রবাদটি যেন এখানে যথাযথাই কার্যকর ‘উপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদপ্তর অর্থ বছরের শেষে এসে কাজ শুরু করায় তড়িঘড়ি করে কাজগুলো শেষ করতে পারছে না। যার দায়ভার নিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। একদিকে রোগীর চাপ অন্যদিকে যথাসময়ে ঠিকাদারী কাজ শেষ করতে না পারায় খুমেক হাসপাতালের ওপর একটি বাড়তি বোঝা যেন চেপে বসেছে।

খুমেক হাসপাতালটি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, নিচতলার অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের একপাশের বাথরুমে দরজা লাগানোর কাজ চলছে। অপর পাশে নেই কোন বাতি। দিনের বেলায়ও দেখা গেছে ভুতুড়ে পরিবেশ। উপর থেকে পানি চুইয়ে পড়ছে মানুষের গায়ে। নিচতলার লেবার/গাইনী ওয়ার্ডে মুজাইকের ওপর টাইলস বসানো হচ্ছে। ভিতরের এক পাশের রোগীদের বারান্দায় রাখা হয়েছে। টয়লেটের দরজা লাগানোর কাজ চলছে। একটি টয়লেট বন্ধ রয়েছে ময়লার স্তুপ পড়ে। অন্যগুলোর প্যান দিয়ে পানি ভেসে উঠছে ময়লাসহ। সেখানেও নেই প্রয়োজনীয় লাইট।

তুলনামূলক পরিষ্কার পাওয়া গেছে গাইনী ৩-এ নম্বর ওয়ার্ডটির বাথরুম। তবে সেখানের প্যানেও ময়লা ভাসতে দেখা গেছে। অথচ ওই জায়গা থেকেই হাসপাতালের রান্নাঘরে যাতায়াত ও খাবার আনা-নেয়ার কাজটি করতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো হাসপাতালের নিচতলা পানিতে সয়লাব হয়ে যায়।

দ্বিতীয় তলার ৫/৬ নম্বর ওয়ার্ড অর্থাৎ মেডিসিন ইউনিট-১এর পুরুষ টয়লেটের কোনটায় সিটকানী আছে আবার কোনটায় নেই। টয়লেটের মধ্যের দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় রয়েছে। মহিলা টয়লেটেরও প্রায় একই অবস্থা। সিটকানী না থাকায় বাইরে থেকে অন্য একজনকে পাহারা দিয়ে টয়লেটের মত একটি প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হচ্ছে রোগী ও ভিজিটরদের।

দ্বিতীয় তলার মেডিসিন ইউনিট-২এর টয়লেটেও দরজা নেই। উপরের কার্নিস ভাঙ্গা। লাইটও নেই। মঙ্গলবার বাথরুমে গিয়ে উপরের পলেস্তরা খসে পড়ে আহত হয়েছেন এক রোগী। শাহাজাহান (৫০) নামের ওই রোগীটি মেডিসিনের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হন ২৭ জুন সকালে। সরেজমিনে গিয়ে তার মাথায় ব্যান্ডেজ করা দেখা গেছে।

তৃতীয় তলার ৯/১০ নম্বর সার্জারী ইউনিট-১এর টয়লেটেও লাইট নেই। নেই সিটকানীও। যথারীতি উপর থেকে পানি পড়ে সেখানেও। মহিলা টয়লেটে একটিমাত্র কমন লাইট আছে। তবে রাতে কেউ টয়লেটে গেলে মোবাইলের আলোই তার জন্য একমাত্র সম্বল। ওই তলার ১১/১২ নম্বর সার্জারী ইউনিট-২এর পুরুষ টয়লেটের সংস্কার কাজ চলছে। নেই লাইট, দরজা কিছুই। সেখানের ছাদ দিয়েও পানি পড়ছে। মহিলা টয়লেটেও নেই প্রয়োজনীয় বাতি। দেয়ালের পলেস্তরা খড়ে পড়ছে। নেই দরজায় সিটকানীও।

৪র্থ তলার শিশু ওয়ার্ডের খেলাঘরের খেলনা নষ্ট। সামনে আলাদাভাবে রুম বানিয়ে বসছেন ডাক্তার। খেলাঘরে যেতে হয় ওয়ার্ডের ভেতরের দরজা দিয়। তবে রাউন্ডের সময় খেলা ঘরটি বন্ধ থাকে। ওই তলার মেডিসিন ইউনিট-৫এর পুরুষ টয়লেট মাত্র একটা। নিচে টাইলস দেয়া হলেও দরজায় সিটকানী নেই। মহিলা টয়লেট দু’টি থাকলেও দরজা লাগানোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। এজন্য একটি পুরুষ টয়লেট সবাই ব্যবহার করেন। ওই ওয়ার্ডে রোগী ছিল ৪৯ জন। কর্তব্যরত নার্সরা জানান, অনেক সময় রোগী ৭০ জন ছাড়িয়ে যায়। তখনও ওই একটি টয়লেট ব্যবহার করতে হয় লাইনে দাঁড়িয়ে। ৫ম তলার নাক, কান ও গলা বিভাগের টয়লেটেও লাইট, সিটকানী নেই। পুরুষ ও মহিলাদের টয়লেটের ব্যবস্থা একসাথেই। ওই তলার চক্ষু বিভাগের এক পাশের টয়লেট বন্ধ। অপরপাশে টয়লেট থাকলেও দরজায় সিটকানী নেই। এজন্য সিরিয়াল দিয়ে সেখানে টয়লেট করতে হয় বলেও রোগীরা জানান। কেবিন ব্লকের এক রোগী বলেন, কেবিনের আর যাই হোক টয়লেটের দুর্গন্ধে বসবাস করা কঠিন। যারা টয়লেট পরিষ্কারের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা ফ্রি সার্ভিস বলে ঠিকমত আসে না। একবার আসলেও টাকা না দিলে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে। প্যাথলজী বিভাগের টয়লেট খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত স্যাম্পল কালেকশন করা হয় ততক্ষণ। কিন্তু সেখানেও টয়লেটের অভাব রয়েছে। মাত্র একটি পুরুষ ও একটি মহিলা টয়লেট থাকায় অনেক সময় দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। এই যখন হাসপাতালের অবস্থা তখন সদ্য বিদায়ী অর্থ বছরে এ হাসপাতালে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে চার কোটি টাকার। আবার ভেতরের সংস্কার ও মেইনটেনেন্সের কাজ হয়েছে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার। এমনটি জানিয়েছেন গণপূর্ত বিভাগ-১, খুলনা’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. লতিফুল ইসলাম। হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম এম মোর্শেদ বলেন, রোগীদের কাছে হাসপাতালের কোন সমস্যা হলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দুর্নাম হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এর মেইনটেন্যান্স ও রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের না। এজন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরই সবকিছু করে থাকে। হাসপাতালটি এমনিতেই জনবল সংকটে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্য বাইরে থেকে লোক এনে এমনকি আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারী দিয়ে চালানো হলেও চিকিৎসক সংকট রয়েছে অনেক। সেগুলো পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা দেয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। 

এর মধ্যে আবার গণপূর্ত অধিদপ্তরের টাকা এসেছে অর্থ বছরের শেষের দিকে। এতে এতো কম সময়ে তারা কাজ শেষ করতে পারছে না। সব মিলিয়ে একটি জটিলতাই চলছে। হাসপাতালের সংস্কার কাজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আটটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মেইনটেন্যান্স কাজ করছে। তবে এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের খুলে রাখা দরজা অন্য ঠিকাদার অন্য টয়লেটে লাগিয়ে দিচ্ছে এমন নজিরও মিলেছে। অথচ বিল করা হবে নতুন দরজার। যেসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজগুলো করছে সেগুলো হচ্ছে মেসার্স রোকেয়া এন্টারপ্রাইজ, গাজী অটো, তানিম এন্টারপ্রাইজ, হালিমা এন্টারপ্রাইজ, সামিট কনষ্ট্রাকশন, সানফ্লাওয়ার এন্টারপ্রাইজ, শিকদার এন্টারপ্রাইজ এবং মো. শাহিদুর রহমান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ