বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শহীদ ড. মুরসি প্রেরণা যোগাবে

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম : [দুই]
জেলখানায় তাকে প্রতিদিন ২২-২৩ ঘণ্টাই নির্জন কক্ষে বন্দী করে রাখা হতো। তাকে যে খাবার দেয়া হতো, তার বেশির ভাগ থাকত পচা আর বাসি খাবার। খালি মেঝেতে মাদুর বা বিছানা ছাড়াই ঘুমাতে দেয়া হতো। গত কয়েক বছরে ড. মুরসিকে অল্প কয়েকবার তার পরিজনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাষ্ট্রপ্রধান ও নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। সাবেক এ প্রেসিডেন্টের মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শোক প্রকাশ করতে দেখা গেছে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। মুসরির মৃত্যুর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত করতে জাতিসংঘের কাছে দাবি জানিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ,তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। কাতারের আমির, তিউনিশিয়ার এনাহাদা আন্দোলন, জর্ডান, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস মুরসির মৃত্যুতে ফিলিস্তিনি জনগণের নিকটতম বন্ধু হারানোর সঙ্গে তুলনা করেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ,সংগঠন,সংস্থা, বিশিষ্ট ব্যাক্তি এই পরিকল্পিত হত্যাকেিন্ডর নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
শেষ বিদায়--
মিসরের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে মঙ্গলবার ভোরে কঠোর গোপনীয়তায় রাজধানী কায়রোতে দাফন করা হয়েছে। এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে তার দাফনের আবেদন জানালে তা দেয়নি সরকার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ও মুসলিম ব্রাদারহুড তাকে শহীদ আখ্যা দিয়ে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেছের। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, কাতারের আমির এবং হামাসপ্রধানের পাশাপাশি শোক জানিয়েছেন জর্ডানের সাবেক রানি নূর আল হুসাইন।
মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতার শাহাদাতের পর তাঁর সম্মানিতা স্ত্রীর বক্তব্য এক টুইট বার্তায় লিখেছেন--“গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি (র.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর জিম্মায় চলে গেছেন! তিনি এমন অবস্থায় আল্লাহর নিকট চলে গেলেন, যখন তিনি ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের একজন সাহায্যকারী, শাহাদাতের প্রত্যাশী এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন তাঁর জাতির জন্য একজন সাহায্যকারী। অথচ তাঁর জাতির অনেকেই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন একজন সত্যের পতাকাবাহী, সত্যের ব্যাপারে অগ্রগামি কিন্তু কখনোই পশ্চাদগামী ছিলেন না। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি কোন ধরনের অসত্যের পদলেহন না করে ক্লান্তিহীন নিরলসভাবে ছয়টি বছর সত্যের ঝাণ্ডা উড্ডীন করে রেখেছিলেন। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন একজন মহান মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিত্ব।”
আল্লাহ তাঁকে ভালোবেসে যুগের এই নিফাকী খিয়ানত এবং হীনতা থেকে মুক্ত করে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে এমনভাবে উঠিয়ে নিয়েছেন, যেন তিনি আমাদের নবী সাইয়্যেদিনা ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ.) এর দৃষ্টান্তের ন্যায় এ যুগের দৃষ্টান্ত হতে পারেন। যেমন দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন আসহাবুল উখদুদ ও হাবিবে নাজ্জার। দাওয়াতী কর্ম ও আমানতের দায়িত্ব পালনের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাঁর সর্বোত্তম সাথীর (আল্লাহর) নিকট সুমহান জান্নাতুল ফিরদৌসে উঠিয়ে নিয়েছেন।
হে বিশ্বাস ঘাতকের সহচররা, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো ! অচিরেই তোমাদেরকে এমন এক বিভীষিকা গ্রাস করবে যা থেকে তোমরা মুক্ত হতে পারবেনা। অচিরেই আপতিত হবে তোমাদের উপর ভয়ংকর এক আযাব। তোমরা আরও সুসংবাদ (!) গ্রহণ করো যে, কিয়ামত পর্যন্ত যত প্রজন্ম পৃথিবীতে আসবে তাদের মধ্যে যারা শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় এমন প্রত্যেকের জন্য তোমরা এক শিক্ষা (নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত) হয়ে থাকবে। হে শহীদ! আপনি আজ জান্নাত পানে... (আপনার রবের সাথে) কত উত্তম ব্যবসা-ই না আপনি করেছেন, হে শহীদ...
রাসূল (স:) বলেন- আল্লাহ তায়ালা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, “তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুম রত জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য”। [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]
জালিমদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর নিদর্শন পর্যায়ক্রমিক রূপে এসেছে এবং অত্যাচারীদের উপর তাঁর শাস্তি বিরতিহীন রূপে এসে পড়েছে। প্রত্যেক শুরুরই শেষ আছে এবং প্রত্যেক শাসনকালের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। মহান আল্লাহ জালিমদের শেষ পরিণতির জন্য কারণ তৈরি করেছেন এবং তাদের জুলুমের বিনিময়ে মর্মন্তুদ শাস্তির বিধানও রেখেছেন। আর তাঁর ফয়সালা আসতে খুব বেশি দিন বাকি নেই ইনশাআল্লাহ।
তাছাড়া শাহাদাতের রক্ত জমিনকে করে উর্বর। আন্দোলনকে এগিয়ে দেয় অনেক দূর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে সে ঐসব লোকদের সঙ্গী হবে যাদের নিয়ামত দান করা হয়েছে, তারা হলো- নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সালেহ, আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।” 
আল্লাহর পথে লড়াই করা কর্তব্য সেই সব লোকেরাই যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে দেয়, আল্লাহর পথে যে লড়াই করে ও নিহত হয়, কিংবা বিজয়ী হয়, তাকে আমরা অবশ্যই বিরাট সফলতা দান করব। ইহলৌকিক এ জীবন থেকে শহীদরা বিদায় নিয়েও পৃথিবীতে তারা অমরত্ব লাভ করেন। আর পরজগতে যাওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবিত করে পরজগতে যাওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবিত করে নিজের মেহমান হিসেবে জান্নাতে থাকতে দেন। আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের মৃত মনে করো না, প্রকৃতপক্ষে তারা জীবন্ত, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমরা অনুভব করতে পারো না” (আল-বাকারা: ১৫৪)। সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে সর্বাধিক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখিন হবে কারা? জবাবে তিনি বলেন- ‘নবীগণ অতঃপর তাদের অনুরূপগণ। অতঃপর তাদের অনুরূপগণ (অর্থাৎ সম্মানিতগণ, অতঃপর সম্মানিতগণ এবং পর্যায়ক্রমে উচ্চপদ মর্যাদায় অধিষ্ঠিতগণ), বান্দা তার দ্বীনের পরিধি অনুযায়ী পরীক্ষিত হবে। অতএব যদি তার দ্বীনের ব্যাপারে কঠিন মজবুত হয় তাহলে তার পরীক্ষাও কঠিন হবে, আর যদি সে দ্বীনের ব্যাপারে নরম হয় তাহলে তার দ্বীনের পরিধি অনুযায়ী তাকে পরীক্ষা করা হবে, এভাবে বান্দার নিকট বালা-মুছিবত আসতেই থাকবে (এবং ক্ষমা হতেও থাকবে) যেন সে পাপমুক্ত হয়ে পৃথিবীতে চলতে থাকে। শায়েখ সা’আদী (রহ) বলেন, ‘আল্লাাহ তায়ালা অবশ্যই স্বীয় বান্দাদের বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করবেন এ জন্য যে, যেন সত্যবাদী, মিথ্যাবাদী এবং ধৈর্যশীল ও ধৈর্যহারা ব্যক্তির মধ্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়।’ (ইমাম তিরমিযী ও ইমাম ইবনে মাজাহ)
সুতরাং মুমীনের জন্য পরকালীন জীবনে মাবুদের পক্ষ থেকে রয়েছে মহাপুরস্কার। সাইয়্যেদ হাসান আল বান্না, শহীদ কুতুব, শহীদ মাওলানা নিজামী, গোলাম আযম, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, মীর কাশেম আলী, আবদুল কাদের মোল্লা, তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জন্মালেও তাদের পরিনতি যেন একই। তাঁরা মহান পরওয়ারদেগারের দেয়া জীবন ব্যাবস্থা আল ইসলাম কে জীবনাদর্শ হিসাবে গ্রহন করে মাবূদের সন্তুষ্টিকে একমাত্র লক্ষ্য বানিয়েছেন। তাই তারা প্রত্যেকেই ছুটছেন সেই চিরচেনা মঞ্জিলের দিকে দুর্বার গতিতে--মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সকল নেক আমল কবুল করুণ। হে! পরওয়ারদেগার হাফেজ ড. মুরসী সহ সকলকে শাহাদাতের সর্বচ্চো মর্যাদা দান করুন। আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদদেও এই ত্যাগ-কুরবানি বিজয়ের সূচনা করবে, ইনশাআল্লাহ। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ