বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অর্থের বর্ণবিন্যাস

ইবনে নূরুল হুদা : দেশে কালো টাকা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও কৌতূহলের অন্ত নেই। প্রতি বছর অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এই কদর্য অর্থ নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা থাকে। এবারের বাজেটেও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকাকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সরকারের পক্ষে। এর ফলে অর্থের বর্ণবিন্যাসের একটা মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে কালো টাকা বিনিয়োগ করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নামমাত্র তথা ১০ শতাংশ আয়কর দিলে অর্থের উৎস সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রশ্ন করবে না বলে কালো টাকার মালিকদের অভয় বাণীও শোনানো হয়েছে। যা প্রকারান্তরে অর্থনীতির কালোবাজারীদের পৃষ্ঠপোষকতা হিসাবেই গণ্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার পক্ষে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত কালো টাকা বর্ণবিন্যাসের সুযোগ বহাল থাকবে। বিষয়টিকে আইনী ভিত্তি দেয়ার জন্য অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে কালো টাকা বিনিয়োগেরও সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। নির্ধারিত হারে ট্যাক্স পরিশোধ করলে, সে টাকার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে না সরকার। বিষয়টি বিয়ের আগেই প্রেম-রোমাঞ্চ-অভিসার-সন্তান ধারণ; অতঃপর নিকাহ-এমন ঘটনার সাথে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, উভয় ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষে বৈধতার দেয়ার কারণে তা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না।
কালো টাকা সাদাকরণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার মধ্যেই সে আগুনেই ঘি ঢেলে দিয়েছে  বহুজাতিক পরামর্শক সেবা প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে কালো টাকা সাদাকরণের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। যা মোটেই সঙ্গত মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য তার যোগ্য জবাব দিয়ে  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ( টিআইবি)র পক্ষে এই দাবিকে ‘অযৌক্তিক ও অযাচিত’ বলে নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সাথে সংস্থাটি প্রস্তাবিত বাজেট পর্যবেক্ষণে পিডব্লিউসির বক্তব্য- ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনও বিকল্প নেই’-এর কঠোর সমালোচনা করেছে।
অর্থশাস্ত্রে কালো টাকার কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। মূলত এটি একটি প্রচলিত ও ঐতিহ্যগত পরিভাষা। অর্থনীতিবিদেরা একে অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল), গোপন (আন্ডারগ্রাউন্ড), অপ্রদর্শিত (আনডিসক্লোজড), লুকানো (হিডেন) বা ছায়া (শ্যাডো) অর্থনীতি বলে থাকেন। আয়কর বিবরণীতে যে আয় প্রদর্শন করা হয়নি, সেটাই অপ্রদর্শিত। এই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ বা অবৈধ দুভাবেই অর্জিত হতে পারে। বৈধ আয় হয়েও আয়কর বিবরণীতে না দেখালে সেটি যেমন অপ্রদর্শিত আয়, তেমনি অবৈধ উপায়ে অর্জিত আয়ও অপ্রদর্শিত আয়। অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক অথবা অপ্রদর্শিত যা-ই বলা হোক না কেন, এটি আসলে কালো বা অবৈধ টাকা। এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।
সাধারণভাবে কালো টাকা বলতে এমন টাকাকে বুঝানো হয় যার উৎস বৈধ বা আইনসম্মত নয়। ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাকারবার, মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ হচ্ছে কালো টাকা। তবে আয়কর আইন অনুসারে বৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থও কালো হতে পারে। যদি টাকার মালিক তার আয়কর বিবরণীতে তার উল্লেখ না করেন; ওই টাকা করযোগ্য হলেও কর না দেন। অবশ্য আয়কর আইনে  কালো টাকা বলতে কিছু নেই। আইনের কোথাও এ শব্দটির উল্লেখ নেই। সেখানে অপ্রদর্শিত অর্থের উল্লেখ আছে। আয়ের যে অংশ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করা হয় না, তা-ই অপ্রদর্শিত অর্থ  (Un-disclosed Money); সাধারণভাবে যা কালো টাকা নামে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে কেউ কেউ কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থের মধ্যে একটা স্পষ্ট সীমারেখা টানার চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, অপ্রদর্শিত অর্থের উৎস বৈধ হতে পারে, আবার অবৈধও হতে পারে। কিন্তু কালো টাকার উৎস নিশ্চিতভাবেই অবৈধ। তাই বৈধ অপ্রদর্শিত অর্থের সঙ্গে কালো টাকাকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। তবে নৈতিক মানদন্ডে অসৎ উদ্দেশ্যে অপ্রদর্শিত বৈধ অর্থ অবৈধ হতে বাধ্য। কারণ, কর ফাঁকিকে আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর যেকাজ শাস্তিযোগ্য তা কোন ভাবেই বৈধ মনে করার কোন সুযোগ নেই। তাই প্রচলিত অর্থে কালো টাকার উৎস যা-ই হোক তা কোনভাবেই বৈধ হতে পারে না। এটিই বাস্তবতা।
নানাবিধ কারণে কালো টাকা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায় বলে সমাজ ও রাষ্ট্র বিরোধী কাজ ও অপরাধে ব্যবহারের অনেক বেশি আশঙ্কা থাকে। এ অর্থ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শনীতে করা হয় বলে রাষ্ট্র তা থেকে কোনো কর পায় না। অন্যদিকে এ ধরনের অর্থ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে না বরং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও দেয়।
অতীত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের কালো টাকা ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। আর এই হার বেড়ে সর্বশেষ ২০০৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশ এবং সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিসর আরও বৃদ্ধি পেয়ে তা ৪০ এর কোটা অতিক্রম করেছে। মূলত কালো টাকা সম্পর্কে রাষ্ট্রের ইতিবাচক অবস্থান ও পৃষ্ঠপোষকতা এর পরিসর বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।  জানা গেছে, বিশ্বের ১৫১টি দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থ, অর্থাৎ কালো টাকার পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা জর্জিয়ায়, সাড়ে ৭২ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম সুইজারল্যান্ডে, ৯ দশমিক ১ শতাংশ। সার্বিকভাবে সারাবিশ্বে গড়ে কালো টাকার হার ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
গোটা বিশ্বে কী পরিমাণ কালো টাকার আছে তার কোন সঠিক হিসেব পাওয়া বেশ দুষ্কর। তবে অস্ট্রিয়ায় জোহানস কেপলার ইউনিভার্সিটি অব লিনজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নেইডার ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কালো টাকা নিয়ে কাজ করছেন। ফ্রেডারিক স্নেইডারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে কালো টাকার এই হিসাব পাওয়া যায়।
২০ বছর ধরে অস্ট্রীয় এই অধ্যাপক কালো টাকা নিয়ে কাজ করলেও বিশ্বের সব দেশকে নিয়ে এ সংক্রান্ত কাজটি শুরু হয়েছিল বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহায়তায়। ‘সাইজ অ্যান্ড মেজারমেন্ট অব দি ইনফরমাল ইকোনমি ইন ১১০ কান্ট্রিজ অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি ছিল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর ভালো ও নির্ভরযোগ্য সমীক্ষা। সমীক্ষাটি করা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকেরই ‘ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার ব্যয়’ নামের প্রকল্পের অংশ হিসেবে। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনপি) একটি দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির হার এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
তবে অনানুষ্ঠানিক বা কালো টাকার হিসাবটি প্রতিনিয়ত বদল হচ্ছে। এ কারণেই অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নেইডার বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কালো টাকা-সংক্রান্তসমীক্ষাটি হালনাগাদ করছেন। সমীক্ষা প্রতিবেদনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘শ্যাডো ইকোনমিজ অল ওভার দ্য ওয়ার্ল্ড: নিউ এস্টিমেটস ফর ১৬২ কান্ট্রিজ ফ্রম ১৯৯৯-২০০৭।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছায়া বা কালো অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে মূলত সরকারি কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কর-কাঠামোর অব্যবস্থার কারণে।
মূলত কালো টাকার পরিমাণ বের করার কাজটি শুরু হয়েছিল ১১২টি দেশ নিয়ে। সেবার তথ্য দেওয়া হয়েছিল ১৬২টি দেশের। তবে ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সব ধরনের তথ্য সমন্বয় করে ১৫১টি দেশের ছায়া অর্থনীতির তলিকা তৈরি হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, গড়ে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা আছে লাতিন ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে, ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই হার ৪১ দশমিক ৩ এবং ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় সাড়ে ৪০ শতাংশ। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা আছে দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৪ শতাংশ এবং পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিকে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আবার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় এই হার সাড়ে ২৮ শতাংশ। তবে ধনী দেশগুলোতে কালো টাকার হার তুলনামূলকভাবে কম। ৩২টি ধনী দেশের সমন্বয়ে তৈরি ওইসিডির কালো টাকা ১৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং এর বাইরের উচ্চ আয়ের দেশের কালো টাকা ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি অনানুষ্ঠানিক অর্থের মালিক জর্জিয়া। এর পরের অবস্থান বলিভিয়ার, ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ। শীর্ষ ১০-এর বাকি দেশগুলো যথাক্রমে আজারবাইজান (৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ), পেরু (৬৬ দশমিক ৩), তানজানিয়া (৬৩), জিম্বাবুয়ে (৫৬ দশমিক ১), ইউক্রেইন (৫৭ দশমিক ৫) ও গুয়াতেমালা (৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ)। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ডের পরই আছে যুক্তরাষ্ট্র, দেশটির ছায়া অর্থনীতির হার ৯ শতাংশ। এর পরের আটটি দেশ হলো যথাক্রমে অস্ট্রিয়া (১০ দশমিক ১ শতাংশ), লুক্সেমবার্গ (১০ দশমিক ২), জাপান (১২ দশমিক ১), যুক্তরাজ্য (১৩ দশমিক ২), নেদারল্যান্ড (১৩ দশমিক ২), নিউজিল্যান্ড (১৩ দশমিক ৬), সিঙ্গাপুর (১৪) ও চীন (১৪ দশমিক ৩ শতাংশ)। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের কালো টাকা ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০০০ সালে কালো টাকার হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০১ সালে ৩৫ দশমিক ৭, ২০০২ সালে ৩৫ দশমিক ৫, ২০০৩ সালে ৩৫ দশমিক ৬, ২০০৪ সালে ৩৫ দশমিক ৭, ২০০৫ সালে ৩৬, ২০০৬ সালে ৩৬ দশমিক ৭ এবং ২০০৭ সালে আরও বেড়ে হয় ৩৭ শতাংশ। আর এই ক্রমবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশে কালো টাকার পরিমাণ জিডিপি ৪০ শতাংশেরও উর্ধ্বে বলে মনে করেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।
মূলত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। মানুষ নানাভাবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রতি ঝুঁকছে। মূলত কর ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণেই এমনটি ঘটছে। আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে, ধনী দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক অর্থের পরিমাণ কম, দরিদ্র্য দেশগুলোতে বেশি।
ফ্রেডরিক স্নেইডার ২০ বছর ধরে ছায়া বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ নিয়ে কাজ করছেন। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, এখনো ছায়া অর্থনীতি, এর পরিমাণ, কারণ এবং এর প্রভাব সম্বন্ধে নির্ভুল তথ্য পাওয়া সহজ নয় এবং এখনো এসব নিয়ে বিতর্ক আছে। এ জন্য প্রয়োজন আরও বেশি গবেষণা। আর তাতেই বিশ্বব্যাপী কালো টাকা নিয়ে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে বলেই তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশেও কালো টাকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও এর পরিমাণ ও কারণ নিয়ে দেশের মধ্যে ভালো কোনো গবেষণা নেই। আশির দশকে ভারতে এ নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা হয়েছিল। বাংলাদেশে একদমই হয়নি। ফলে বাংলাদেশে আসলে কালো টাকার পরিমাণ কত, তা জানার এখন পর্যন্ত একমাত্র উপায় অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নেইডারের গবেষণা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দেশের মধ্যেই কালো টাকার পরিমাণ, উৎস এবং প্রভাব নিয়ে বড় আকারের সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দাবি করেছে, দেশে কালো টাকার পরিমান মোট জিডিপির শতকরা ২৪.১ ভাগ। কালো টাকা নিয়ে টিআইবির জরিপে দুইটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একটিতে কালো টাকার পরিমান জিডিপির ১০.১ এবং আরেকটিতে ৩৮.১ ভাগ দেখান হয়েছে। দুটির গড় করে জিডিপির ২৪.১ ভাগ কালো টাকা নিরূপণ করা হয়। যদিও অর্থনীতিবিদরা এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন এই হার ৪০ শতাংশের উপরে।
একথা অনস্বীকার্য যে, কালো টাকার প্রধান উৎস দুর্নীতি। কালো টাকা যেমন আয় বৈষম্য বাড়ায় তেমনি কালো টাকা প্রশ্নহীন থেকে গেলে দুর্নীতিও বাড়ে। মূলত আমাদের দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। সঙ্গত কারণেই দেশ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বরগুনায় রিফাত শরীফের হত্যার রেশ কাটতে না থাকতেই ঢাকার ওয়ারীর ৭ বছরের শিশু সায়মা ধর্ষণ ও হত্যার খবরও আমাদেরকে হজম করতে হচ্ছে। সরকার যদি কালো টাকার মালিক সহ অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনে তাহলে আগামী দিনে যেমন কালো টাকার পরিসর বাড়বে, ঠিক তেমনিভাবে দেশে অপরাধ প্রবণতাও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
একথা ঠিক যে, ট্যাক্স ফাঁকিসহ নানা কারণে বৈধ আয়ও অনেক সময় কালো টাকায় পরিণত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশে ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি কালো টাকা আছে। যা সরকারের দুটি অর্থবছরের বাজেটের সমান। কিন্তু সরকার এসব কালো টাকার মালিকদের লাগাম টেনে ধরার পরিবর্তে তা সাদা করণের সুযোগ দিয়ে প্রকারান্তরে অপরাধীদেরই পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যা রীতিমত উদ্বেগজনকই বলতে। কালো টাকা নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন বা তা বৈধ বা অবৈধ যেকোন খাত থেকেই আসুক না কেন তা কোন ভাবেই বৈধ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সঙ্গত কারণেই সরকারের পক্ষে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের গ্রহণযোগ্যতাও বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। মূলত সরকারের উদাসীনতা, শ্রেণি তোষণ, সময়োপযোগী আর্থিক নীতিমালার  অভাব এবং সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতাও এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিরা। অর্থের বর্ণবিন্যাস কখনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাহীন নৈরাজ্যই সৃষ্টি করবে। তাই এই অশুভ বৃত্ত থেকে যত তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে আসা যায় ততই মঙ্গল।
inhuda71@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ