বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

সরকার তথা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশে গত ৭ জুলাই থেকে রাজধানী ঢাকার প্রধান কয়েকটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। এই নির্দেশের প্রতিবাদে রিকশা চালক ও মালিকরা সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে শুরু করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসাবে গতকাল ৯ জুলাই থেকে ৭২ ঘণ্টার অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে তারা। দুই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় বাস ও প্রাইভেট কারসহ গাড়ি চলাচল প্রতিরোধ করার কর্মকাণ্ডও শুরু হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে রাজধানীতে যানবাহন সংকট যেমন মারাত্মক হচ্ছে তেমনি বাড়ছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও। কোনো কোনো এলাকায় কোনো ধরনের যানবাহনই পাওয়া যাচ্ছে না। একযোগে নতুন পর্যায়ে শুরু হয়েছে পুলিশের ঘুষের বাণিজ্য। এমন অবস্থায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানোর এবং গণপরিবহনের জন্য পৃথক লেন চালু করার দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, নাহলে রাজধানীর সকল সড়কই প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত গাড়ি দখল করে নেবে, যার ফলে রিকশার চলাচল বন্ধের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা সম্পূর্ণ বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করি। কারণ, সরকারের নজরদারি না থাকার পাশাপাশি পুলিশের ঘুষ বাণিজ্যের পরিণতিতে রাজধানীর সকল এলাকায় রিকশাচালকদের অঘোষিত রাজত্ব এবং চরম স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠিত হলেও এতদিন সাধারণ মানুষের প্রধান বাহন ছিল রিকশা। অফিস এবং স্কুল ও হাসপাতালে যাতায়াতসহ সব কাজেই মানুষ রিকশা ব্যবহার করে এসেছে। সরকার এবং দুই সিটি কর্পোরেশন হঠাৎ করে রিকশা চলাচল বন্ধ করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তার ফলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষই।
আমাদের আপত্তির কারণ হলো, রাজধানীতে রিকশার সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হলেও বিভিন্ন সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সবকিছুর পেছনে রয়েছে ঘুষের বাণিজ্য। কারণ, দুই সিটি কর্পোরশেনের হিসাবে বৈধভাবে নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা ৮৭ হাজারের মতো হলেও বাস্তবে রিকশা চলাচল করছে দশ লাখের বেশি। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক অবৈধ রিকশার ব্যাপারে এতদিন কোনো ব্যবস্থাই নেননি সরকার এবং দুই সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ৮৭ হাজারের মতো রিকশার জন্য লাইসেন্স ইস্যু করেই দিব্যি বসে থেকেছেন কর্মকর্তারা, যেন তাদের আর কোনো দায়িত্ব বা কর্তব্য নেই! রাজধানীতে এত বেশি সংখ্যক রিকশার প্রয়োজন আদৌ রয়েছে কি না সে কথা যেমন ভেবে দেখা হয়নি, তেমনি দশ লাখের বেশি রিকশা চলাচলের খবরেও কর্মকর্তাদের সামান্য মাথাব্যথা দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স ইস্যু করার সময় তো বটেই, লাখ লাখ রিকশাকে অবৈধভাবে চলাচল করতে দেয়ার ব্যাপারেও দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুলিশ ও ট্রাফিকদের মতোই ঘুষের বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। আর সে কারণেই অবৈধ রিকশার সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে বেড়ে গেছে। ভাড়া নির্ধারণসহ রিকশাচালকদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও দুই সিটি কর্পোরেশনের কোনো তৎপরতা কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। তথ্যাভিজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, এভাবে চলতে পেরেছে বলেই রাজধানীতে শুধু রিকশার সংখ্যাই বাড়েনি, একই সঙ্গে রিকশাচালকদের স্বেচ্ছাচারিতাও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল। তারা কোনো আইনকেই তোয়াক্কা করেনি। এমন অবস্থার অজুহাত দেখিয়েই কয়েকটি সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সরকার। 
আমরা মনে করি, এ সংক্রান্ত অন্য একটি দিককেও বিবেচনায় নেয়া দরকার। সেটা হলো, প্রায় দশ লাখ রিকশার মাধ্যমে প্রায় বিশ লাখ চালক ও পাঁচ-সাত লাখ মালিক অর্থ আয় করার এবং পরিবার সদস্যদের নিয়ে খেয়ে-পরে জীবন কাটানোর সুযোগ পাচ্ছে। এজন্যই হঠাৎ করে ও ঢালাওভাবে রিকশা উঠিয়ে দেয়ার এবং কয়েক লাখ মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। দরকার আসলে রিকশাচালকদের স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটানো। একই সাথে এমন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করাÑ তারা যাতে আইন মেনে চলে এবং যখন-তখন ও যেখানে-সেখানে যানজটের সৃষ্টি না করতে পারে। দুই সিটি কর্পোরেশনের উচিত এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া। কারণ, কোনো বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না করে হঠাৎ রিকশা চলাচল বন্ধ করা হলে কমবেশি বিশ লাখ চালক ও তাদের পরিবার সদস্যরা বেকার ও বিপন্ন হয়ে পড়বে। তেমন অবস্থায় চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়বে। রিকশার ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ সাধারণ মানুষের সহজে যাতায়াতের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, রিকশা বন্ধ করা হলেও এখনো বাসসহ গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের। শিশুদের স্কুলে আনা-নেয়া করার পাশাপাশি রাগীদের হাসপাতালে নেয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সড়কে রিকশার সকল স্থান প্রাইভেট গাড়ি দখল করে নেবে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি যে আশংকা প্রকাশ করেছে তাকেও বিবেচনায় রাখা দরকার। উল্লেখ্য, কয়েকটি সড়কে নিষিদ্ধ হওয়ায় দশ লাখের বেশি রিকশা এরই মধ্যে রাজধানীর অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পাড়া-মহল্লায় পর্যন্ত ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হতে শুরু করেছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ছে সমগ্র রাজধানীতেই। সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই রিকশা ও যানবাহনের ব্যাপারে সব মিলিয়ে সুচিন্তিতভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া দরকার বলে আমরা মনে করি। একথা বুঝতে হবে যে, কেবলই কয়েকটি প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করলে যানজট সমস্যার সমাধান হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ