মঙ্গলবার ১৩ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে গেলো কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ

স্টাফ রিপোর্টার: আট মাসের গাঁটছাড়া ছেড়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে গেলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। তার ভাষায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে যে জোট তারা গড়েছিলেন, নির্বাচরের পর গত সাত মাসে তার কোনো অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় কোনো সমস্যা তারা তুলে ধরতে পারছে না। এরকম একটি জোট যে আছে তা দেশের মানুষ জানেই না। তাতে মনে হয়, কোনকালে কখনো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে দেশে কোনো রাজনৈতিক জোট বা ফ্রন্ট বা ঐক্য গঠনই হয়নি। গতকাল সোমবার দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের এই সাবেক সংসদ সদস্য।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অস্তিত্ব বা ঠিকানা খোঁজার চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে জনগনের সকল সমস্যায় তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করছে। কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা সব সময় দেশবাসীর কাছে বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছি, ভবিষ্যতে সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্ট ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের সব সমস্যা সমাধানে তাদের পাশে থেকে সম্পূর্ণ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করব। একই সঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনে সব দলের সঙ্গে কাজ করব।
তিনি বলেন, ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা, সম্প্রতি রিফাত হত্যাসহ কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি কোনো কথা বলেনি। আমরা ছোট দল হলেও এসব জাতীয় ইস্যু নিয়ে বসে থাকতে পারি না। তাই জনগণের দাবি, সমস্যা সমাধানে ও ঐক্যফ্রন্টের অস্তিত্ব এবং ঠিকানা খোঁজার কথা মাথায় থেকে ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে আমরা কাজ করতে চাই।
আপনার দল কি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে দিলেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,  আপনার প্রশ্নটা যখাযর্থ। লিখিত বক্তব্যেও্ আছে দেখুন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অস্তিত্ব বা ঠিকানা খোঁিজার চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে জনগনের সকল সমস্যায় তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করছে।
আমার মনে হয় না যে, এখানে কোনো অস্পষ্টতা আছে। সত্য কথা বলতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। তার কোনো কর্মকান্ড নেই। সেজন্যে সেখান থেকে আমরা চলে আসছি, যেখানে থেকে যাচ্ছি, আমাদের প্রত্যাহার করছি-এই শব্দটা ব্যবহার করা আমাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয় নাই। সেজন্য তাদের খোঁজার কথাটা বলেছি আমাদের মাথা থেকে ঝেরে ফেলেছি। আপনি যেটা বলেছেন সেটাকেই বুঝায়।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এরকম অকার্যকর অবস্থার জন্য কে দায়ী প্রশ্ন করা হলে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমিসহ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ যারা ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলেন কমবেশি সকলেই দায়ী।
আপনি আপনার নতুন চলার পথে কাদেরকে চাচ্ছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রাজনীতি একটা প্রবাহমান নদীর মতো, এটা স্রোতধারার মতো। গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের সাথে আমাদের কাজ করা উচিত। সেক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টে যারা ছিলেন তাদের সাথে ভবিষ্যতে কোনো কাজ করবো না- এমন কোনো শর্ত নেই। আমরা নিভের্জাল প্রতিষ্ঠায় আমরা কাজ করবো।
তিনি বলেন, নর্বাচনে পরেপরে আমি বলেছিলাম, আর কিছু হোক বা না হোক, বর্তমান সরকারি দল ভবিষ্যতে কোনো দিন একটি সুষ্ঠু নির্ব্চানে জয়লাভ করতে পারবে না সেই রাস্তাটা তারা িিন্শ্চত করেছে। আমরা সমমনা গণতন্ত্রপ্রেমী এই দেশের প্রতিটি দলের সাথে আমরা কাজ করার চেষ্টা করবো।
একাদশ নির্বাচন উপলক্ষ্যে ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হলেও এর ফ্রন্টের ব্যানারে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পরপরই সঠিকভাবে চলতে পারেনি। যেমন ফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে, সেই নির্বাচন হয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ফ্রন্টের ব্যানারে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে দেয়া হয়নি এবং ফ্রন্টের যে অফিস ছিলো সেখান থেকেও দেয়া হয়নি। এটা দেয়া হয়েছে মাননীয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয় থেকে। মূলত নেতৃত্ব করেছে বিএনপি। এই জিনিসটা খুবই গুরুতর অন্যায় হয়েছে এবং ঐক্য গঠনের নীতিমালার পরিপন্থি হয়েছে।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, এতো কিছুর পরও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হাজার বছরের সাফল্য ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন সরকার কর্তৃক একটা প্রহসনে পরিণত করতে পেরেছে। পৃথিবীতে এমন প্রহসন আগে-পরে কেউ দেখেনি। এই নির্বাচন না হলে সরকার যে এমন উলঙ্গভাবে দুষ্কর্ম করতে পারে-এটা কেউ জানতো না, বিশ্বাসও করতো না। ছোট্ট বাচ্চারাও এভাবে চুরি করতে পারে না। ফ্রন্টের একটা সাফল্যের মাত্রা বা চিহ্ন ইতিহাসে থেকে যাবে।
নির্বাচনের পর গণফোরামের বিজয়ী প্রার্থী সুলতান মো. মনসুর শপথ গ্রহনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে। এটা জাতির পেছনে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, মানুষের আশা-আকাংখাকে পদদলিত করা হয়েছে। সুলতান মো. মনুসর ভাবীকালে কখনো এতোটা নিবৃত্ত হবে, শুধু মনুসর নয় যারাই শপথ নিয়েছেন যেটাকে মীরজাফরের চাইতেও খারাপভাবে দেখা যেতে পারে।
গণফোরামের পর বিএনপির একজন শপথ নিলে তাকে বহিস্কার ও অপর ৪জনকে শপথ গ্রহণ করতে বলার বিষয়টি দলের ‘দ্বৈতনীতি’ উল্লেখ করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, একজনকে বহিস্কার ও চারজনকে দলীয় অভিনন্দন-এটা কী ব্যাপার আমরাও বুঝতে পারিনি। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-বগুড়া-৬) শপথ গ্রহণ না করায় তার আসন শূন্য হওয়ায় তার আসনে আবার বিএনপি নির্বাচন করে সংসদে গেলেন। যদি বিএনপিকে সংসদে যেতে হবে তাহলে ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেনো গেলেন না। জাতির কাছে স্পষ্ট হয়নি। নৈতিকভাবে এর কোনো জবাব নেই।
সাংবাদিক সম্মেলনের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সিদ্ধান্তের লিখিত বক্তব্য দলের যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী পাঠ করে শুনান। লিখিত বক্তব্যে ফ্রন্ট থেকে ছেড়ে দেয়ার কয়েকটি কারণও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়, সংসদে যোগদান, বিএনপি মহাসচিবের সংসদে যোগদান না দেয়া, অন্যদের সংসদে য্গোদান, নির্বাচনের পর ফ্রন্টের পক্ষ থেকে সোনাগাজীর নুসরাত জাহান হত্যাকান্ড, বরগুনার রিফাত শরীফের হত্যাকান্ড, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজেটের মধ্য দিয়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর করারোপসহ জাতীয় সমস্যার বিষয়ে ফ্রন্টের ‘নিশ্চুপ’ ভুমিকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর ফ্রন্টের ব্যানারে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, স্বনামে-বেনামে যেভাবেই হোক চিহ্নিত ২০/২৫ জন জামায়াত নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো। এটা হবার কথা ছিলো না।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের উদ্যোগে এই সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর গত বছরের ৫ নভেম্বর কাদের সিদ্দিকী যোগ দেন। একাদশ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখানের পর ফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত গণফোরাম ও বিএনপির সদস্য সংসদে যোগদান প্রশ্নে টানাপোড়নে গত ৯ মে সাংবাদিক সম্মেলন করে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন এক মাস সময়সীমা বেঁধে দিয়ে।
এরপর ১০ জুন ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে ঐক্যমতে পৌঁছায় যে, কাদের সিদ্দিকী আরো অপেক্ষা করবেন। এরও একমাস পর তিনি ফ্রন্ট থেকে ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা হলো। সাংবাদিক সম্মেলনে কাদের সিদ্দিকীর স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকী, মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী, দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ