রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাতে ব্যাপক পানিবদ্ধতা ॥ জনদুর্ভোগ চরমে

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে বহু এলাকায় পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ রেড়ে গেছে। গতকাল সোমবার ভোর রাত থেকে থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। সকালে পানিমগ্ন রাস্তায় যানবাহন কম থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন চাকরিজীবী,শিক্ষার্থী সহ সাধারণ মানুষ।
ভারী বর্ষণে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, শুলকবহর, কাপাশগোলা, কে.বি.আমান আলী রোড, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ সিডিএ, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বেপারি পাড়া,মোল্লা পাড়া,পোর্ট কনেকটিং রোড,মুহুরী পাড়া,হাজী পাড়া,  প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, হালিশহর বড়পুল, ছোটপুল, হালিশহর, চান্দগাঁও, জিইসি মোড়, কাতালগঞ্জ, ষোলশহর ২ নম্বর গেইট,চাক্তাই,মিঞাখান নগর,রাজাখালী,পাথরঘাটা মুরাদপুর,বায়েজীদ, মোহাম্মদপুর, চান্দগাও  খাজারোড, হামজারবাগ, মোহাম্মদপুর,   নয়াবাজার বিশ্বরোড, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিন পোলের মাথা, হেমসেন লেন, জামালখান বাই লেন,ফিরিংগীবাজার,এয়াকুবনগর,মেহেদীবাগ,ওয়াসার মোড়, কাট্রলি,পাহাড়তলী,খুলশী সহ প্রায় এলাকায়   কোথাও হাটু সমান ও কোথাও কোমর সমান ও কোথাও বুক সমান পানি হয়েছে। পানি জমে রাস্তাগুলো খালে পরিণত হয়েছে। পানির স্্েরাতে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে হাটা-চলা করেছে। নিচু এলাকায় বসবাসকারী খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে পানি উঠেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় রোগী ও স্বজনরা পড়েছেন ভোগান্তিতে ।
গতকাল সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সবর্এ পানি আর পানি।সাধারন মানুষ বুক সমান পানি ভেংগে রাস্তা পার হচেছ। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল কমে যায়। কোথাও কোথাও সড়কে জমে থাকা পানিতে বাস-অটোরিকশাসহ যানবাহন আটকে গিয়ে ভোগান্তি আরও চরম আকার ধারণ করে।
আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক ছাপিয়ে বৃষ্টির পানি দোকানপাট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে পড়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কেও পানি উঠেছে।
 অনেক দোকান ও বাসা-বাড়িতে ঢুকে গেছে পানি। পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকায় চাল-ডালের আড়ত, শুঁটকিপট্টি, তেলের দোকান, ভুষির আড়ত, মসলার বাজারের বেশ কিছু দোকানের মালামাল পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সড়কে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শেষ না হওয়ায় সৃষ্ট গর্তে জমে আছে পানি। এতে রিকশা ও যানবাহন উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। ভারি বৃষ্টিতে হেমসেন লেইন এলাকায় ১ নম্বর গলির একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের সীমানা প্রাচীর ধসের ঘটনা ঘটলেও এতে কেউ আহত হয়নি। ঘাটফরহাদ বেগ এলাকায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের একাংশও ধসে গেছে। টানা বৃষ্টিতে দামপাড়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ের নিচতলায় হাঁটু পানি উঠে গেছে। ফলে নিচতলায় অবস্থিত কার্যালয়গুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াসা ভবনে প্রবেশ ও বের হতে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ গ্রাহকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।ওয়াসার উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) গোলাম হোসেন বলেন, নিচতলায় পানি উঠে যাওয়ার ব্যাংকসহ সব অফিসে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতে বৃহওর চট্টগ্রামেরকর্ণফুলী,আনোয়ারা,বাশঁখালী,পটিয়া,চন্দনাইশ,সাতকানিয়া,লোহাগাড়া,হাটহাজারী,ফটিকছড়ি,রাউজান,রাংগুনিয়া,সীতাকুন্ড,মিরসরাই,সন্দ্বীপের বিভিন্ন নীচু এলাকা পানিমগ্ন হয়ে পড়েছে।এতে জনদুর্ভোগ বেড়ে যায়।  এদিকে বৃষ্টিতে ধসের শঙ্কায় পাহাড়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষজনকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো থেকে ইতিমধ্যে সাড়ে তিনশ পরিবার আটটি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এসব পাহাড়ে থাকা অবশিষ্ট লোকজনকে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।বৈরি আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য তোলা বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন জানিয়েছেন, পানিবদ্ধতা কমাতে সেনাবাহিনীর পাঁচটি রেসপন্স টিম মাঠে কাজ করছে।প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে বেশি পানি সেখানে এর কারণ বের করে তা সমাধানে তারা কাজ করছেন।
আবহাওয়া অধিদফতর সূএের খবর, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশ ভারতের রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় বিরাজমান। সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এ টানা ভারি বৃষ্টিপাত। ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো কোনো পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধ্বসের আশঙ্কা রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমূদ্র বন্দরকে  তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সোমবার  সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং খুলনা বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে।আবহাওয়া অধিদফতর সূএের খবর,   সোমবার সকাল ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ সীতাকুণ্ডে ১০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়াও এ সময়ে চট্টগ্রামে ৭২ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ৯৪ মিলিমিটার, রাঙামাটিতে ৫৮ মিলিমিটার, মাইজদীকোর্টে ৩০ মিলিমিটার, সিলেটে ২৯ মিলিমিটার, খেপুপাড়ায় ৪২ মিলিমিটারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
এদিকে রাঙামাটির কাপ্তাইতে পাহাড় ধসে মাটি চাপায় উজ্জ্বল মলিক নামে তিন বছরের এক শিশু ও তাহমিনা বেগম (২৫) নামে এক মহিলা মারা গেছে। সোমবার  সকালে উপজেলার কলাবাগান মালি কলোনি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।এলাকাবাসী জানায়, রোববার রাত থেকে প্রবল বর্ষণ শুরু হলে সোমবার সকাল ১২টার দিকে কাপ্তাই উপজেলার কলাবাগানের মালি কলোনির পাহাড়ের পাদদেশে থাকা দুটি ঘর পাহাড়ধসে ভেঙে যায়। এসময় ঘরের ভেতরে থাকা সুনীল মল্লিকের পরিবারের মধ্যে উজ্জ্বল মল্লিক(৩) ও গফুর মিয়ার পরিবারের মধ্যে তাহমিনা বেগম ছাড়া বাকি সবাই বের হতে সক্ষম হয়। এলাকাবাসী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার কাজে অংশ নিয়ে উজ্জ্বল মল্লিককে লাশ উদ্ধার করে। পরে তাহমিনা বেগমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বেবী জানান, পাহাড়ধসে এক শিশু ও মহিলা মারা গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ