সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রাজশাহীর প্রাচীনতম স্থাপত্য ‘বড়কুঠি’

পদ্মাপাড়ে অবস্থিত রাজশাহী নগরীর প্রাচীনতম স্থাপত্য বড়কুঠি ভবন -সংগ্রাম

সরদার আবদুর রহমান : রাজশাহী মহানগরীর প্রাচীনতম স্থাপত্য বড়কুঠি ভবন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব থেকে ফিরলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হাতে। ফলে এটি এখন প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের হেফাজতে অর্পিত হবে। তবে পর্যায়ক্রমে এটি ‘রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম’ হিসেবে গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই বড়কুঠি ভবন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার বিষয়ে এর আগে প্রজ্ঞাপন জারি করে। গত ২৯ জুন শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯১তম সিন্ডিকেট সভায় এই বড়কুঠির দায়িত্ব সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে তাঁর বাসভবনে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সিন্ডিকেটের একাধিক সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। এর আগেও ২০১১ ও ২০১৬ সালে বড়কুঠির দায়িত্ব চেয়েছিল রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। তবে শিক্ষকদের প্রতিবাদের মুখে তা হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ অধিদপ্তর আইন-১৯৭৬ অনুযায়ী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ভবনটিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ভবনটি সংস্কার করে সংরক্ষণ করার জন্য ২০১৮ সালের জুনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি গেজেট প্রকাশ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি তোলা হয়। সভায় আলোচনার পর ভবনটির দায়িত্ব সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। তবে সিন্ডিকেটের তিনজন সদস্য বিষয়টির প্রতিবাদ করেন। তাঁরা এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত দেন। রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক এম.এ বারী বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সরকারের বিরোধিতা করতে পারি না। এছাড়া সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ভবনটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
বড়কুঠির ইতিহাস : রাজশাহী শহরে বিদ্যমান লোকায়ত ইমারত সমূহের মধ্যে সর্বপ্রাচীন বড়কুঠি নামক প্রত্ন ইমারতটি রাজশাহী কলেজের দক্ষিণে পদ্মা নদীর শহর সংলগ্ন তীরে অবস্থিত। বলতে গেলে রাজশাহী শহরকেন্দ্রিক প্রাচীন ও উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্বিক নিদর্শণের পরিচিতি লাভ করে এটি। একে কেন্দ্র করেই কার্যত রাজশাহী শহরের গড়ে উঠা ও বিস্তৃতি লাভ ঘটে। ইতিহাস গবেষকরা উল্লেখ করেন,  রাজশাহী শহরে রেশম ও নীল ব্যবসার সুবাদে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় ডাচ, ফরাসি ও ব্রিটিশ ইস্ট-ই-িয়া কোম্পানির আগমন ঘটে এবং তারা রাজশাহী শহর ও এর আশেপাশে কুঠি নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরপর ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে (১৮২৫) রাজশাহী জেলার সদর দপ্তর নাটোর থেকে রামপুর-বোয়ালিয়া তথা রাজশাহী শহরে স্থানান্তরিত হলে এখানে বিভিন্ন অফিস-আদালত নির্মাণের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, গ্রন্থাগার, যাদুঘর, হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মিত হয়। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ হতে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের আদলে যে অনেক ইমারত গড়ে উঠেছিল- ইটের নির্মিত ও সমতল ছাদ বিশিষ্ট এ ইমারতটি অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ওলোন্দাজ (ডাচ্) রেশম ব্যবসায়ী কর্তৃক নির্মিত এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি। প্রতœ ইমারত বিশেষজ্ঞরা জানান, দ্বিতল আকৃতির এ ইমারতটি বিভিন্ন আয়তনের মোট ১২টি কক্ষে বিভক্ত। দ্বিতলে একটি সভাকক্ষসহ ৬টি কক্ষ রয়েছে। কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আয়তাকার সভাকক্ষের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে বারান্দা সন্নিবেশিত। আবার কক্ষের পশ্চিম দিকে দু’টি ও পূর্বদিকে এক সারিতে তিনটি কক্ষ বিদ্যমান। সভাকক্ষের দু’দিকে বারান্দামুখী সমান্তরালভাবে তিনটি করে এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাশের কক্ষের সাথে একটি করে দরজা আছে। অন্যদিকে উত্তর ও দক্ষিণের বারান্দা দু’টির সম্মুখস্থ প্রান্ত দেশের দুটি অর্ধগোলায়িত পোস্তা এবং তার মধ্যস্থলে স্থাপিত দু’টি করে গোলায়িত স্তম্ভে উন্মুক্ত। দক্ষিণের বারান্দাটির সম্মুখভাগ গ্রীলবেষ্টিত হলেও উত্তরের বারান্দাটি বর্তমানে বন্ধ করে কক্ষে রূপান্তরিত করা হয়েছে। দক্ষিণ দিকের বারান্দার পশ্চিমাংশে একটি কাঠের প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। এছাড়া সভাকক্ষের পূর্ব ও পশ্চিমের কক্ষগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে উভয় কক্ষের মধ্যবর্তী দেয়ালে একটি করে দরজা রয়েছে। পূর্বাংশের তিনটি কক্ষের উত্তর দিক হতে প্রথমটির উত্তর দেয়ালে দু’টি ও পূর্ব দেয়ালে একটি, মধ্যবর্তী কক্ষের পূর্ব দেয়ালে দু’টি এবং সর্ব দক্ষিণের তৃতীয় কক্ষের পূর্ব দেয়ালে একটি ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে দু’টি করে জানালা। অবশ্য পশ্চিমাংশের উত্তর দিক হতে প্রথম কক্ষটির উত্তর দেয়ালে দু’টি জানালা ও পশ্চিম দেয়ালে একটি দরজা এবং দ্বিতীয় কক্ষটির পশ্চিম দেয়ালে দু’টি জানালা ও দক্ষিণ দেয়ালে কাঠের সিঁড়িঘরের সাথে সংযুক্ত দু’টি দরজা রয়েছে। এছাড়া ইমারতটির দ্বিতলে ওঠার জন্য পশ্চিম পাশের বহির্ভাগে নির্মিত একটি প্রশস্ত সিঁড়ি (বর্তমানে পুনঃর্নির্মিত) উত্তর দিকের কক্ষের দরজার সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। ভবনটির প্রতিটি দরজা-জানালা ভেনিসীয় খড়খড়ি (Venetian blind) সংবলিত উল্লম্ব আকৃতির। ইমারতটির নিচের কক্ষগুলোও অনুরূপ পরিকল্পনায় বিন্যাসিত। তবে বায়ুরন্ধ্র পথ (ventilator) ও দরজা-জানালার স্বল্পতার কারণে নীচের কক্ষগুলো অপেক্ষাকৃত অন্ধকার। খুবসম্ভব নীচতলা এক সময় রেশম দ্রব্যাদি সংরক্ষণের পাশাপাশি বন্দিশালা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ইমারতের দক্ষিণাংশে দু’দিকে (পূর্ব ও পশ্চিম) অষ্টভুজাকৃতির কোণস্থিত ফাঁপা বুরুজের ন্যায় অনুরূপ দু’টি বুরুজ (bastion) বিদ্যমান। পশ্চিম দিকের বুরুজটির অভ্যন্তরে একটি পেঁচানো সিঁড়ি রয়েছে যা বেয়ে ছাদে উঠা যায়। বলাবাহুল্য এ ধরনের সিঁড়িসোপান পূর্বাংশের বুরুজেও ছিলো বলে জানা যায়। সমগ্র ভবনটি লোহার তীর-বর্গার সমন্বয়ে নির্মিত সমতল ছাদে আচ্ছাদিত। ইমারতের প্রতিটি কক্ষের অভ্যন্তর ও বহির্দেয়ালগাত্র পলেস্তারায় আচ্ছাদিত। কেবল দ্বিতলে অবস্থিত সভাকক্ষের চারদিকের দেয়ালে উপরিভাগে পেঁচানো লতাপাতা সংবলিত একটি টানা পাড় নকশা এবং তার উপর চিরুনির দাঁতের ন্যায় নকশা সংবলিত অপর একটি পাড় নকশা বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে ইংরেজগণ কর্তৃক সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এ ইমারতে আটকে রেখে নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধ সংঘঠিত হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া জনশ্রুতি আছে, ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহকালে এই ভবনটি কিছুদিন বিদ্রোহীদের কব্জায় ছিলো। তবে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে এটি আটককৃত বিদ্রোহীদের নির্যাতন গৃহ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে বড়কুঠি : ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশবিভাগের ফলে বড়কুঠি ভবন ব্রিটিশ সরকারের মালিকানা থেকে তৎকালিন পাকিস্তান সরকারের মালিকানায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে এর বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং বিভাগের ক্লাসগুলো সাময়িকভাবে প্রথম শুরু হয় রাজশাহী শহরের বিভিন্ন ভবনে। এর মধ্যে বড়কুঠি ভবনে নেয়া হয় ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস ও বাসভবন। ক্লাশ অনুষ্ঠিত হতে থাকে রাজশাহী কলেজ চত্বরে অবস্থিত পুকুরের পশ্চিমদিকের মাদ্রাসা ব্লক নামে পরিচিত লালবর্ণের ভবনটিতে। এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসীনের আর্থিক অনুদানে রাজশাহী মাদ্রাসার প্রথম ভবন হিসেবে ১৮৮৮ সালে এটি নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে রাজশাহী মাদ্রাসা বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হলে ভবনটি রাজশাহী কলেজের ১৭ নম্বর গ্যালারি ভবন হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি ‘হাজী মুহম্মদ মহসীন ভবন’ নামেও পরিচিত। শহরের ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রথম চিকিৎসাকেন্দ্র এবং পাঠাগার চালু হয়। এখানকার কয়েকটি কক্ষ ক্লাসরুম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে। বড়কুঠি পাড়ায় ‘মাত্রীধাম’ নামক একটি গৃহে কলেজ পরিদর্শক-এর দপ্তর চালু হয়। ঘোড়ামারা মহল্লা সন্নিহিত খানসামার চক নামক মহল্লায় রাজশাহীর খ্যাতিমান জামিদার রায়বাহাদুর কুঞ্জমোহন মৈত্রের প্রাসাদোপম বাড়ির কয়েকটি কক্ষ বরাদ্দ হয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের জন্য। রাজশাহী সার্কিট হাউসের দক্ষিণ সংলগ্ন একটি বাড়িতে (বর্তমানে রিভারভিউ স্কুল) মনোবিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। রাজশাহী কলেজ চত্ত্বরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ফুলার মোহামেডান হোস্টেলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হোস্টেল হিসেবে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ হয়। এছাড়াও শহরের নানা স্থানে বাসা ভাড়া করেও ছাত্রদের হোস্টেলের চাহিদা পূরণ করা হয়। বড়কুঠি পাড়ায় লালকুঠি নামে একটি প্রাচীন দ্বিতল ভবনসহ আরেকটি ভাড়া করা ভবনে ছাত্রীনিবাস স্থাপিত হয়।
১৯৫৪ সালের পরপরই রাজশাহী শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ছয় বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিশাল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য চুড়ান্তভাবে স্থান নির্দিষ্ট করা হয় এবং এখানে পরিকল্পনামাফিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ এবং দপ্তরসমূহ মূল ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়। শুধুমাত্র বড়কুঠি নামক ঐতিহাসিক ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাতছাড়া না করে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ক্লাবে পরিণত করেন। এর দ্বিতীয় তলায় চালু করা হয় শিক্ষকদের ক্লাব। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাসে জুবেরী ভবনটি শিক্ষক ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সিটি মিউজিয়ামের সম্ভাবনা : কেবল একটি প্রত্ননিদর্শণ হিসেবেই নয়- বড়কুঠি ভবনকে রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংরক্ষণাগার হিসেবেও গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা বহুদিনের। আর সে কাজ যথাযথভাবে সম্পাদন করার মতো সঙ্গতি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলের ২৬.৭(গ) ধারা অনুযায়ী ‘কোন সিটি কর্পোরেশন জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি স্থাপন ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।’ রাসিক এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাও করেছে এবং প্রাথমিক কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাসিকের এসংক্রান্ত একটি স্থায়ী কমিটিও রয়েছে। জানা যায়, এই স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন সভায় আলোচনার প্রেক্ষিতে ৩০ অক্টোবর ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত কমিটির ৯ম সভায় মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নির্দেশনায় ২টি সাব-কমিটি গঠন করা হয়: ১. পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও বড়কুঠিকে পর্যটন কেন্দ্রে উন্নয়ন এবং ২. মহানগর মিউজিয়াম সাব-কমিটি। এবিষয়ে পরপর কয়েকটি সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, জাদুঘরের উপকরণ সংগ্রহের জন্য মেয়রের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে সম্ভ্রান্ত পরিবার ও সচেতন ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন এবং সংগৃহীত নিদর্শন সংরক্ষণের স্থান নির্ধারণ করা হবে। ৮ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটি একাদশ সভায় জাদুঘরের জন্য সংগৃহীত দলিলপত্র ও ক্ষুদ্র উপকরণ আপাতত নগর ভবনের ২১১নং কক্ষে এবং বৃহদাকার নিদর্শণ নগর ভবনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত আরবান প্রাইমার হেলথ কেয়ার প্রকল্পের টিন শেডের কক্ষটি ব্যবহৃত হবে। স্থায়ী কমিটির ৪ মার্চ ২০১২ তারিখের চতুর্দশ সভায় রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৯ সদস্য বিশিষ্ট ‘জাদুঘর নীতিমালা প্রণয়ন ও সাইট সিলেকশন উপ-কমিটি গঠন করা হয়। এর সভাপতি মনোনীত হন স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আনসার আলী।
বিদেশিদের আগ্রহ : চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নেদারল্যান্ডের একটি প্রতিনিধিদল রাজশাহীর ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। দেশটির রিজিওনাল আর্কাইভস ডাইরেক্টর সিক ফ্রিড জ্যাংজিংয়ের নেতৃত্বে রাজশাহী নগর ভবনে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তারা পদ্মাপাড়ের ঐতিহ্যবাহী বড়কুঠি সংরক্ষণ ও সিটি কর্পোরেশনে আর্কাইভস স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহের কথা জানান এবং এ নিয়ে আলোচনা করেন। তারা রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা উন্নীত করণের উদ্দেশ্যে মেয়রকে মিউজিয়াম ও আর্কাইভস স্থাপনের পরামর্শ দেন। তারা বড়কুঠিকে রাজশাহী সিটি মিউজিয়াম স্থাপনের জন্য গৃহীত উদ্যোগের প্রশংসা করে বড়কুঠি সংস্কার ও সংরক্ষণের অনুরোধ জানান। বড়কুঠিকে সংস্কার ও সংরক্ষণ সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন তারা। এসময় মেয়র তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন মহানগরীর শিক্ষাব্যবস্থাপনা এবং ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে আন্তরিক। নগর ভবনে ইতোমধ্যে সিটি মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। আগামীতে তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা উন্নীতকরণে আর্কাইভস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞ মন্তব্য : এবিষয়ে হেরিটেজ রাজশাহী’র সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার সময় যেহেতু এর কোন নিজস্ব স্থাপনা ছিলো না, সেকারণে ভিসি’র অফিস ও বাসভবন হিসেবে বড়কুঠিকে সাময়িকভাবে ব্যবহারের জন্য রাবিকে প্রদান করা হয। এছাড়া মেয়েদের হোস্টেল হিসেবে পাশের লালকুঠি এবং রেজিস্ট্রারের অফিস, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, মেডিকেল সেন্টার, লাইব্রেরিসহ শহরের বিভিন্ন ভবন ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থাপনা গড়ে উঠায় শহরের এসব ভবন একে একে সংশ্লিষ্টদের ফেরৎ দেয়া হয়। কিন্তু বড়কুঠি অজ্ঞাত কোন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে থেকে যায়। এটি কোন সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ছিল না, এখনো নেই। রাজশাহী শহরের সর্বপ্রাচীন স্থাপনা বড়কুঠি। এটি সন্দেহাতীতভাবেই জনগণের সম্পদ। যেটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখাই জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠানের ক্লাব ঘর হিসেবে ব্যবহার মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এটি সংরক্ষণের দায়িত্বও তাই সরকারি কর্তৃপক্ষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ