শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

অবসরের পরও তিনি প্রধান শিক্ষক!

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামের নগরের আগ্রাবাদ ফরেস্ট কলোনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাসের জন্ম ১৯৫৯ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তাকে আবারো দুই বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছে স্কুল পরিচালনা কমিটি। পাচ্ছেন বিদ্যালয় থেকে বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিদা। এমন তুঘলকি কান্ডে হতবাক স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারি ও অভিভাবকরা।
সরকারি বিধিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরিতে প্রথম প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর। তবে সমপদে বা উচ্চতর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইনডেক্সধারীদের জন্য বয়সসীমা শিথিলযোগ্য। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ ৬০ (ষাট) বছর বয়স পর্যন্ত প্রদেয় হবে। বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হবার পর কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান প্রধান/সহকারী প্রধান/শিক্ষক কর্মচারীকে কোনো অবস্থাতেই পুন:নিয়োগ কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
সরকারি বিধি অনুয়ায়ি প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাস এখন অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু  ওই পদে প্রায় ৫ মাস ধরে বহাল রয়েছেন।  প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে বেতন তুলছেন তিনি। গত ঈদুল ফিতরের সময় দুই মাসের বেতন ও বোনাসসহ ৯০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে তিনি। ওই পদে বহাল থেকে তিনি দাপ্তরিক যাবতীয় কাজ করছেন এবং নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন তিনি। যা সরকারি বিধির সুস্পষ্ট লংঘন।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের নবেম্বরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্যের মাধ্যমে নগরের আগ্রাবাদ ফরেস্ট কলোনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন উত্তম কুমার দাস। যোগদান করার পরপর ক্রয় কমিটি বিলুপ্ত করেন দেন তিনি। এরআগে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সেখানে ক্রয় কমিটি ছিল। তিনি ওই ক্রয় কমিটি বিলুপ্ত করে দেন। শুধু ক্রয় কমিটি বিলুপ্ত করে তিনি ক্রান্ত হননি। তিনি বিলুপ্ত করেছেন অর্থ উপ কমিটিও। বিদ্যালয়ে বছরে আয় হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। সেখানে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৯লাখ টাকা। ১১ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থাকার কথা থাকলেও ওই টাকার কোনো হিসেব নেই। কাগজে-কলমে ব্যয় দেখিয়ে ওই টাকা আত্মসাত করেন তিনি। বিদ্যালয়ে প্রতি বছর সরকারি অডিট হওয়ার নিয়ম রয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনে অডিট না হওয়ার সুযোগে প্রতি বছর তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয় পরিচালানা কমিটির তৎকালিন সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবিএম আজাদ এর স্বাক্ষর জাল করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, অবসরে যাওয়ার পর আবার নিয়োগ পাওয়া প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাশ শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণের ফান্ডের প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকা বকেয়া রেখেছেন। অথচ তিনি প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে  তুলে নিচ্ছেন।
অভিযোগ আছে, প্রধান শিক্ষক যথা সময়ে তিনি বিদ্যালয়ে আসেন না। আবার কোনো কোনো সময় কয়েকদিন না এসেও পরে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে  রুঢ় ও অশালিন আচরণ করেন। বিধি বহির্ভূতভাবে তিনি পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষা বোর্ডের খাতা মূল্যায়নে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের পরীক্ষক নিয়োগে সুপারিশ করেন এবং তা কার্যকর করেন।
সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে পরিচালনা কমিটির সদস্য থাকে ১১জন। এরমধ্যে অভিভাবক সদস্য  ৪জন, শিক্ষক ৩জন, দাতা সদস্য ১জন, শিক্ষা অনুরাগী ১ জন, পদাধিকার বলে প্রধাম শিক্ষক সম্পদক ও একজন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাস পরিচালনা কমিটি গঠন সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে পরিচালনা কমিটি গঠন করেছেন। এতে তিনি সম্পুর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গোপনে নিজের অনুগত কিছু লোকের স্বাক্ষর সংগ্রহের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।  এভাবে  তিন দফা কমিটি গঠন করেন তিনি। তার এহেন কান্ডে বেশ কিছু অযোগ্য লোক পরিচালনা কমিটির সদস্য হয়েছেন। যা সরকারি বিধি পরিপন্থী।
বর্তমানে  বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে  স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি আজিজ মোল্লাকে চেয়ারম্যান করা হয়। তার আনুমানিক বয়স ৭৫ বছর। শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধেক্যের কারণে তিনি সার্বিক বিষয়াদি তদারকি করতে পারেন না। যার ফলে যা ইচ্ছে তাই করেন প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাস। শুধু মাত্র পরিচালনা কমিটি থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তার কাজের বৈধতা আদায় করে নেন।

উল্লেখিত অভিযোগ সমুহের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাস জানান, আমি ওই বিদ্যলয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলাম, বর্তমানে অবসরে রয়েছি। আমাকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি দুই বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বৈধ-অবৈধ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ভালো জানেন।
পরিচালনা কমিাটর সভাপতি আজিজ মোল্লা জানান, অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার দাশকে দাপ্তরিক কোন কাজ করবেন না এ শর্তে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগ বিধি সম্মত হয়েছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব বিধি তার জানা আছে!
চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিধান অনুযায়ী তাকে রাখা যায় না। আমি পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি। বিধি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হলে বা দুর্নীতি করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এক বিদ্যালয় পরিদর্শক জানান, ২০১৮ সালের ১২ জুন প্রকাশিত পরিপত্র অনুযায়ী ৬০ বছর পূর্ণ হলে তিনি সেখানে বহাল থাকতে পারবেন না। এর আগে তিন দফায় পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতো।
প্রসঙ্গত, বান্দরবান রেইছা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন উত্তম কুমার দাস। দুনীতির কারণে তাকে ওই বিদ্যালয় ছাড়তে হয়। এরপর পটিয়া উপজেলার বারৈকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দেন তিনি। সেখান থেকে অনুরূপ দুর্নীতির কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তারপর বোয়ালখালী উপজেলার উত্তর ভূর্ষি অন্নদা জীবন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন উত্তম কুমার দাস। ওই বিদ্যালয়ে আর্থিক দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করায় ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক ও পরিচালনা কমিটি সম্মিলিতভাবে তাকে বহিষ্কার করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ