বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভারতীয় দলকে ক্রিকেট বিশ্বের ধিক্কার

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রোববারের ম্যাচে ভারতের স্পোর্টসম্যানশিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ক্রিকেট দুনিয়া। বিশ্বকাপের ন্যায় এমন প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও মর্যাদার খেলায় তারা যেভাবে ব্যাটিং করেছে তাতে অনেকেই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ এনেছে। ম্যাচে ভারতের ব্যাটিং অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে জয়ের তাড়না ছিলো না সেটি বলছেন সমর্থকরা। অনেকেই ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, ৫ উইকেট হাতে নিয়ে ভারত চাইলে ফাইট দিতে পারতো অবশ্যই। ধরা যাক বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ৩০ বলে ৬০ করতে হবে। হাতে রয়েছে বেশ কয়েকটি উইকেট। কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এসময় ক্রিজে মহেন্দ্র সিং ধোনি। যাকে ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ‘ফিনিশার’ বলা হয়। সঙ্গী কেদার যাদব। ভারত জিতবে? অনেকেই বলছেন, এটি সম্ভব। কিন্তু যা হলো তা রীতি মতো অবিশ্বাস্য। এই দুইজনকে রান নেয়ার কোনো মানসিকতাই দেখা গেলনা।  রোববার এজবাস্টনে যা দেখা গেল, এই অন্তিম প্রশ্নেরও আগে একটা প্রশ্ন এসে গেছে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি ধোনি ও কেদার জেতার চেষ্টা করবেন তো? একেক সময় এমনই উদ্ভট দেখাচ্ছিল ধোনি ও কেদারের ব্যাটিং যে, নিজের গায়েই চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করছিল, সত্যিই লাইভ ম্যাচ হচ্ছে তো? নাকি কোনো ম্যাচের শুটিং? প্রত্যেক ওভারে যখন দরকার ১২ বা ১৩ রান করে, তখন তারা খুচরো রান নিয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। বড় হিট হবে কি, চেষ্টাই তো নেই। শেষের আধ ঘণ্টা রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের মতো হওয়ার কথা ছিল। হয়ে দাঁড়াল ফ্লপ ছবি। হয়তো বলা হবে, নেট রানরেট ঠিক রাখতে সাবধানি ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ধোনিরা। কিন্তু পাঁচ উইকেট হাতে নিয়েও এমন ব্যাটিংয়ের যে ব্যাখ্যাই দেয়া হোক, ক্রিকেট ভক্তদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া কঠিন। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিস ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে তেমনই কথা বলেছেন। রান তাড়া করতে নেমে ভারতীয়দের মন্থর ব্যাটিং মেনে নিতে পারেননি কিংবদন্তী এই বোলার। টুইট করে ওয়াকার বলেন, তুমি কে সেটা বড় ব্যাপার নয়। তোমার কাজই তোমার পরিচয়। পাকিস্তান সেমিফাইনালে গেল কি না তা নিয়ে আমি চিন্তিত নই, কিন্তু একটা ব্যাপার পরিস্কার, অনেক চ্যাম্পিয়নই স্পোর্টসম্যানশিপের পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। কারও নাম না করলেও ওয়াকারের নিশানায় যে বিরাট কোহলির ভারত, তা বোঝাই যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যেভাবে রান তাড়া করেছে ভারত, তাতে বিস্মিত ক্রিকেটবিশ্ব।
ভারতের রান তাড়া করার ধরন দেখে দেশটির সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিও অবাক। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেটার নাসের হুসেনও বিস্মিত। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, দলের সিনিয়র সদস্য হিসেবে ধোনির উচিত ছিল হার্দিক পান্ডিয়া, কেদার যাদবকে পরিচালনা করা। ভারতের হারের ধরনে সন্দিহান সবাই। প্রবল সমালোচনার মুখে বিরাট কোহালির টিম ইন্ডিয়া।
এজবাস্টনের ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচের দিকে তাকিয়েছিল উপমহাদেশের তিনটি দেশ। ভারত হেরে যাওয়ায় সমস্যায় পড়ে গেল পাকিস্তান, বাংলাদেশ। ভারত হারাবে ইংল্যান্ডকে, এই আশা নিয়ে গ্যালারি ভরিয়েছিলেন পাকিস্তানের সমর্থকরাও। রোববার খেলা চলাকালীন রামিজ রাজা চলে যান সমর্থকদের কাছে। তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। পাকিস্তানের প্রাক্তন পেসার শোয়েব আখতার ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে বলেছিলেন, এবার ভারতের সাহায্য খুব দরকার পাকিস্তানের। কী ভাবে? ভারত যদি ইংল্যান্ডকে হারায়, তা হলে ইংল্যান্ড ছিটকে যাবে টুর্নামেন্ট থেকে। পাকিস্তান তা হলে বাকি দুই ম্যাচ জিতে ১১ পয়েন্ট নিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছবে। ধোনি ও কেদার দু’জনে মিলে ৩১ বল খেললেন। তার মধ্যে সাতটা বলে কোনো রান নেই, কুড়িটা এক রান, তিনটা চার এবং একটা ছয়। ভারত শুধু বিস্ময়কর ব্যাটিং করে ম্যাচই হারল না এজবাস্টনে, লাখ লাখ ভক্তের হৃদয় থেকেও দূরে সরে গেল।
ধোনির ব্যাটিং সব চেয়ে অবাক করার মতো। তিনি দলের সিনিয়র ব্যাটসম্যান। কেদারকে তারই পরিচালনা করার কথা। কিন্তু সাউদাম্পটনের ম্যাচের মতোই নিজে খোলসের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সঙ্গীকেও হাত খুলতে উদ্বুদ্ধ করলেন না। শেষ ওভারে গিয়ে যখন জেতার জন্য ভারতের ৪৬ রান দরকার, প্রথম বলে ছয় মারলেন ধোনি। কিন্তু ততক্ষণে দর্শকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। বিদ্রƒপাত্মক ধ্বনি ভেসে আসছে ভারতের দুই ব্যাটসম্যানের দিকে। দ্বিতীয় বলে ধোনি আবার এক রান নিতে অস্বীকার করলেন। এবার দর্শকরা ক্ষোভে আরো ফেটে পড়ল।
মঙ্গলবার যখন এ রিপোর্ট লিখা হচ্ছিল তখন ভারত এখনো টেবিলের দু’নম্বরে। কিন্তু হার্দিক পা-্য এবং ঋষভ পান্থ আউট হওয়ার পরে যে রকম বিনা লড়াইয়ে ধোনি-কেদার আত্মসমর্পণ করলেন, তাতে প্রবল প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। একে তো ইংল্যান্ডের প্রত্যেকটি মাঠে যে প্রবল জনসমর্থন তারা পাচ্ছেন, তা জোরালো ধাক্কা খাবে। দ্বিতীয়ত, বড় রান তাড়া করার ব্যাপারে যে সংশয় ভারতীয় ব্যাটিংকে ঘিরে ছিল, তা থেকেই গেল। সব চেয়ে চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে, ছক্কা মারার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।  সকালের দিকে মাইকেল ভন টুইট করলেন, ‘আমরা গুনে দেখেছি। এজবাস্টনে সব মিলিয়ে ৮৬ জন ইংরেজ ক্রিকেট সমর্থক উপস্থিত হয়েছেন। আর এই সংখ্যাটা ইংল্যান্ডের টিম এবং ম্যানেজমেন্টকে ধরে। গ্যালারির নিরানব্বই শতাংশ ছিল ভারতীয় সমর্থকদের দখলে। কে জানত সেই প্রবল জনস্রোতই মাঠ ছাড়বে ভারতীয় দলকে ধিক্কার দিতে দিতে! একটা দুর্দান্ত দ্বৈরথের রুদ্ধশ্বাস শেষ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সকলে।
মাঠে উপস্থিত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় ভক্তরা তো বটেই, এমনকি, ক্রিকেট বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ভক্তরাও ধরে নিয়েছিলেন বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ মঞ্চস্থ হতে চলেছে এজবাস্টনে। তার বদলে শেষের ওভারগুলোতে যা দেখা গেল, তাকে প্রহসন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। ধোনি ক্রিজে এসে প্রথম বল যেটা পেলেন, সেটা ব্যাট তুলে ছেড়ে দিলেন। যেন বলতে চাইছে, “অনেক দিন টেস্ট ম্যাচ খেলিনি। আজ এজবাস্টনে খেলব।” ৪৭তম ওভারেও ধোনিরা নিলেন পাঁচটা সিঙ্গলস। অবিশ্বাস্য!
তুলনায় ইংল্যান্ডের ইনিংস দারুণভাবে শুরু করার পরেও মোহাম্মদ শামি যখন ম্যাচে ফেরালেন, তার পরও মরগানের দল ছাড়ল না। বেন স্টোকস ৫৪ বলে ৭৯ করে ইংল্যান্ডকে সাত উইকেটে ৩৩৭-এর স্কোরে পৌঁছে দিলেন। স্টোকস এমন একটা শট খেললেন, যা ক্রিকেটে বিপ্লব এনে দিতে বাধ্য। ধোনিদের মতো সিটবেল্ট বেঁধে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকলেন না। বেয়ারস্টো দুরন্ত খেলে গিয়েছেন আইপিএলে। সানরাইজার্স হায়দরাবাদে পাশে পেয়েছেন ভিভিএস লক্ষ্মণকে। স্পিন খেলায় মাস্টার লক্ষ্মণ। তার থেকে পাঠ নিয়ে লক্ষ্মণের দেশের স্পিনারদের তুলোধনা করে গেলেন। একটা সময়ে কুল-চা জুটি তাদের প্রথম দশ ওভারে দিয়ে দিয়েছিল ৯০-এর উপর। ১০৯ বলে ১১১ করলেন বেয়ারস্টো। একাই মারলেন ছ’টা ছক্কা। ভারতীয় ইনিংসে সেখানে সব মিলিয়ে হলো মাত্র একটা ছক্কা।  তিনটি অসাধারণ ক্যাচ দেখা গেল এই ম্যাচে। রবীন্দ্র জাদেজার অসাধারণ ক্যাচ তবু ভারতকে ম্যাচে ফিরিয়েছিল। লং অনে সামনে ঝাঁপিয়ে বদলি ফিল্ডার হিসেবে যে ক্যাচ নিলেন জাদেজা, তাতে ইংল্যান্ডের ওপেনিং জুটির ঝড় থামাল। এর পর শামি ও বুমরা মিলে চাপ বাড়ালেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের উপর। কুল-চা কিছুটা হলেও ছন্দ ফিরে পেলেন। ইংল্যান্ড যখন ইনিংস শেষ করল, দর্শকদের মধ্যেও দেখা গেল ব্যস্ততা। দ্রুত খাবারের প্যাক নিয়ে ফিরে গিয়ে বসতে হবে সিটে। একটাও বল মিস করা যাবে না এই ম্যাচের।
 চেজমাস্টার কোহালি আর ফিনিশার ধোনি যে টিমে আছেন, তারা এক-আধবার ৩৩৭ তাড়া করতে পারবে না? রোহিত আর কোহালি যতক্ষণ ছিলেন, ততক্ষণ গাড়ি ঠিকঠাক হাইওয়ে ধরে যাচ্ছিল। রোহিত ১০২ করলেন ১০৯ বলে। কোহালি ফের হাফসেঞ্চুরি পেলেন, আবার বলা যেতে পারে ফের সেঞ্চুরি হারালেন। এ সব দিনে পঞ্চাশ নয়, তিনি বড় সেঞ্চুরি করে পথ না দেখালে এখনও দিকভ্রষ্ট দেখায় ভারতীয় ব্যাটিংকে। ভারতের এমন ব্যাটিং মানতে পারেন নি খোদ সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিও। সৌরভ বলেন, এমন মন্থর ব্যাটিংয়ের কোন মানে খুঁজে পাচ্ছি না। ওরা কেন সিঙ্গেলস নিচ্ছিল তার উত্তর সত্যিই আমার জানা নেই। ৩৩৭ রান তাড়া করতে নেমে ৫ উইকেট থেকে যাওয়ার কোন যুক্তি দেখি না। বার্তাটা খুব পরিস্কার হওয়া উচিত, কীভাবে বল মারছ বা কোথায় মারছ সেটা বড় কথা নয়। যেভাবেই হোক ওই পরিস্থিতিতে বাউন্ডারিই মারতে হবে। ম্যাচের এমন পরিস্থিতিতে এসে সিঙ্গেলস ভাবাই যায় না। তাও ক্রিজে প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যান।’  পাকিস্তান তারকা পেসার শোয়েব আখতার বলেন, ভারত অবশ্যই আরও ভাল ক্রিকেট খেলতে পারত।
প্রথম ১০ ওভারের আগ্রাসী ব্যাটিং এবং ৫ উইকেট হাতে রেখে ওরা চাইলে অসাধ্য সাধারণ করতে পারত। কিন্তু এটা ওদের ম্যাচ তাই পাকিস্তানের হয়ে ব্যাটিং করেনি। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইনও অবাক, আমি সত্যি অবাক। ভারতের প্রয়োজন ছিল রান। কী করল ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা? মঞ্চ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। গ্যালারি ভর্তি দর্শক ধোনির বড় শট দেখতে চেয়েছিল। ওরা ভীষণ রকমের হতাশ করেছে।’ ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলে বলেছেন, অত্যন্ত নিরাশার সমাপ্তি। পান্ডিয়া (৩৩ বলে ৪৫) যতক্ষণ ক্রিজে ছিল উত্তেজনা ছিল। এত বড় ম্যাচ, মাঠে এত দর্শক। সেটাই তো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ৫ উইকেট হাতে রেখে বাকিরা এমন মন্থর ব্যাটিং করল যেটা সত্যি হতাশার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ