রবিবার ১৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

সংসদে বিএনপির বক্তব্যের জবাব দিলো জাতীয় পার্টি

সংসদ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেটের উপর ৪টি মঞ্জুরি দাবির উপর আনীত ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। আলোচনাকালে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যদের অভিযোগের জবাব দিতে সরকারি দলের ভূমিকায় দেখা যায় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের। এনিয়ে সংসদের অধিবেশন কক্ষে কিছুটা উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিসহ কয়েকটি ইস্যুতে দুই দলের সদস্যরাই সরকারের সমালোচনা করেন।
গতকাল রোববার সকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে বাজেট পাস হওয়ার আগে চারটি ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদ বলেন, ডাক্তাররা এত বেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মানুষ এখন মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না। তার বক্তব্যের জবাবে জাতীয় পার্টির মো. রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, সব দোষ খালি ডাক্তারদের দিলে চলবে না। একটা-দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমস্ত ডাক্তার, সমস্ত হাসপাতাল খারাপ বলবেন এটা তো ঠিক না। এরপর জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য বলেছেন চিকিৎসা হয় না, এটা ঠিক না। আসলে আপনাদের (বিএনপি) দেশের উপর আস্থা নাই। আপনারা সমস্ত ডাক্তারদের দলীয়করণ করেছেন। এরজন্য কে দায়ী? বি চৌধুরী প্রথম ড্যাপ করেন জিয়ার আমলে। আপনারাই ডাক্তারদের দলীয়করণ করেছেন।
একের পর এক জাতীয় পার্টির এমপিদের এধরণের বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপি’র এমপিরা। এক পর্যায়ে বিএনপি’র রুমিন ফারহানা বলেন, এমন সংসদে বসেছি, কোনটা সরকারি দল, কোনটা বিরোধী দল কিছুই বুঝি না। জবাবে জাতীয় পার্টির সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্ন বলেন, বিরোধী দল কি করবে? সরকার যদি ভাল কাজ করে সেটার প্রশংসা করে। কিন্তু সংসদে ৪০০ কার্য দিবসে মাত্র ১০ দিন উপস্থিত হওয়া বিরোধী দলের কাজ না। জাতীয় পার্টি সেই বিরোধী দল হতে চায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষিকে বহুমুখীকরণ করতে হবে ঃ কৃষিখাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ হলেও কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের দাম পাচ্ছেন না। ধানের দাম না পেয়ে আগুণ দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও কোথাও কোথাও ঘটেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপীরা নিয়ে গেলেও সামান্য ঋণ নেওয়ার কারণে ৪৫ হাজার কৃষকের বিরদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। কৃষকদের ঋণ কখনো মওকুফ করা হয় না। অথচ ঋণ খেলাপীদের বিরদ্ধে মামলা হয় না। সরকারকে কৃষকবান্ধব হতে হবে, মিলার বান্ধব নয়। কৃষকদের ঋণের সুদ মওকুফ ও পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে হবে।
জবাবে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব এবং নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। এখনও ৪০ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে রফতানিকে বহুমুখী করতে না পারলে অর্থনীতি বিকশিত হবে না। আমরা রফতানিকে বহুমুখী করতে পারবো। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে সারের দাবী করায় ১৮ জন কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্যুত চাইলে ২০ জন কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্বের সকল দাতা সংস্থার বিরোধীতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কৃষিতে ভর্তুকি দিয়েছেন। দৃঢ় কন্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা ভর্তুকি নয়, কৃষিতে বিনিয়োগ করছি। যে কারণে দেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, উদ্বৃত্তের দেশ। সকল কৃষিপণ্য উৎপাদনে সারাবিশ্বে ঈর্ষণীয় স্থান অর্জন করে নিয়েছে বাংলাদেশ। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণে প্রয়োজনে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শিক্ষার মান অবশ্যই বাড়াতে হবে ঃ শিক্ষাখাতে বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা বলেছেন, যখন একটি সরকার এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পরেও বিদেশ থেকে শিক্ষক আনতে চায়, সেই সরকরের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। দেশে শিক্ষার মান ক্রমেই কমে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে সরকার-বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি শিক্ষা উন্নয়ন কমিটি গঠনের দাবী জানান তারা।
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, যারা (জিয়াউর রহমান) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্র করে, শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক তুলে দেয়, হিজবুর বাহারে মেধাবী ছাত্রদের বিপদগামী করে। যারা এসব অনৈতিক কাজগুলো করে তাদের কাছে নৈতিকতার ছবক নেওয়া একটু হাস্যকরই মনে হয়।
বিএনপি-জামায়াতের আমলে অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অভিযোগ উত্থাপন করে শিক্ষা মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান একমাত্র জাতীয়করণ বঙ্গবন্ধু সরকার ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার করেছেন। বিএনপি-জামায়াতের আমলে কোথায় এমপিওভুক্ত করা হয়েছে? আমরা দেখেছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত ব্যাপারে তারা বৈষম্য করেছে। কোন কোন প্রভাশালী মন্ত্রী তাঁর নিজ এলাকায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছেন। যেগুলোর মান ঠিক নেই, শিক্ষক নেই। তারা নিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছে। কাজেই অতীতের সকল এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার মান বাড়াতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নঃ  স্বাস্থ্যখাতের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বিএনপি আমলে ডাক্তাদের দলীয়করণের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই অবস্থা। চিকিৎসা নিতে মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। কিন্তু দেশেও ভাল চিকিৎসা হচ্ছে। তবে দেশের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। সবাই ঢাকায় কোন না, কোন হাসপাতালে এ্যাটাসমেন্ট থাকে। এই এ্যাটাচমেন্ট বন্ধ করুন। মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ করুন।
জবাবে  স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন তুলে ধরে মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্য সেবা মানুষের দোড়গোড়ায় নিয়ে গেছে। বিএনপি কম্যুনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছিল। সেখানে গুরু পালিয়েছে। আমরা ফের সেটা চালু করেছি। বাংলাদেশে রাতকানা রোগ নেই। টিকাদান শতভাগ অর্জিত হয়েছে। আমেরিকায় বর্তমানে গড় আয়ু ৭৮ বছর। আমরা দ্রুতই সেই পর্যায়ে উন্নীত হব। সরকারিখাতে ৩৫টি মিলে প্রায় ১০০টি মেডিকেল কলেজ। বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৫টিও ছিল না। বিএনপি-জামায়াত শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ণ ইউনিট গঠন করে পোড়া মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়েছেন। সকল রোগের চিকিৎসায় এখন বাংলাদেশে হচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষই বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। একমাত্র ধণাঢ্য ব্যক্তি ছাড়া কেউ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায় না। ক্ষমতায় থাকতে খালেদা জিয়া-তারেক রহমানরা কখনও দেশে চিকিৎসা নেননি বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্র ঃ এই ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সদস্যরা বলেন, বরাদ্দ প্রদানে নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। এই বৈষম্য দূর করতে হবে।  বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন আছে। বরাদ্দ প্রদানে দুর্নীতি হচ্ছে। সোলার প্রদানে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। একটি বিশেষ কোম্পানি থেকে সোলার নিতে বাধ্য করায় বেশি দাম নেওয়া হয়। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে। শহরে সোলার কমিয়ে গ্রামে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ সদস্যরা বলেন, মন্ত্রণালয়ের সমস্যা অনেক। ডিসিদের কাছ থেকে তালিকা নিতে হয়। এতে সংসদ সদস্যদের অবমূল্যায়ন করা হয়। ঈদের সময় ত্রাণ দেওয়া হয়। কিন্তু তালিকা অনুয়ায়ী দেওয়া হয় না। দেওয়া হয় স্লিপ অনুযায়ী। এতে অনিয়ম হয়। টিআর কাবিখার বরাদ্দ এমপিদের পরিবর্তে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে দেওয়া ভালো। এই খাতে বরাদ্দ যাতে সঠিকভাবে হয় তার নজরদারি করার দাবি জানান তারা।
জবাবে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ সহনীয় রাষ্ট্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমরা আর ভয় পাই না। বড় বড় দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা আমরা নগণ্য পরিমাণে নামিয়ে আনতে পেরেছি। বিএনপি-জামায়াত সরকার ঘুমিয়ে ছিলেন বলে তাদের আমলে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ভয়াল প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় ও সাহায্য দিয়ে সারাবিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার আরো তিনশটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করবে। মানুষের সঙ্গে প্রাণী সম্পদ রক্ষায় আরো ৫শ’টি মুজিব কেল্লা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহহীনদের জন্য ৩ হাজার দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। জাপানের মতে বাংলাদেশকেও দুর্যোগ সহনীয় দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ