রবিবার ১৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

স্বজন হারানোরা শোক সাগরে ॥ চলতি বছরেই রায়!

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকা গুলশানের লেক পাড়ে গড়ে ওঠে হোলি আর্টিজান বেকারি। অভিজাত এই রেস্তোরাঁটির ট্যাগলাইন-স্লো, বিউটিফুল অ্যান্ড প্রিসাইজ। দেশী-বিদেশী ক্রেতাদের সরব আনাগোনায় ভালভাবেই চলছিল। আচমকা ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের এই শান্ত-সুন্দর বেকারি পরিকল্পিত জঙ্গী হামলায় তছনছ হয়ে যায়। গুলী করে, কুপিয়ে, ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে জঙ্গীরা হত্যা করে গর্ভবতী নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উন্নয়ন সহযোগী বিদেশি নাগরিক, শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষককে। সরব রেস্তোরাঁটি শোকে নীরব হয়ে পড়ে।
জঙ্গীদের অনুপ্রবেশের পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ হাজির হয়েছিল। প্রথম দফায় নিহত হন সেই বাহিনীর দুই সদস্য। হামলার ব্যাপকতা দেখে একে একে যুক্ত হয় র‌্যাব, বিজিবি, নেভি কমান্ডো ও সেনাবাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মিদশার। পরিষ্কার হতে শুরু করে রাতভর জঙ্গীদের তান্ডবলীলার চিত্র।
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদের আগে এত মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু গোটা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করে। সে রাতে ঘটনার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। কালো পোশাকে আবৃত হামলাকারী পাঁচ জঙ্গী তরুণের তিনজনই ঢাকার উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। ওই ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমগুলোয় ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে নিখোঁজ থাকা আরও অনেক তরুণের নাম।
জঙ্গীরা সে রাতে রেস্তোরাঁর ভেতরে গলা কেটে হত্যা করেছিল ৯ জনকে, মাথার পেছনে গুলী ছিল ৯ জনের, ভারী বস্তুর আঘাতে নিহত হয়েছিলেন আরও ২ জন। শুধু একজনের শরীরেই ছিল ৪০টি কোপের আঘাত। কোনো উত্তেজকের প্রভাব ছাড়াই ঠান্ডা মাথায় ১৮-২৪ বছরের এই তরুণেরা হত্যা করে ও মৃতদেহের প্রতি চরম অসম্মান দেখায়। দেশবিদেশের স্বজন হারানোরা আজও ভাসছে শোকের সাগরে।
সবমিলে ওই হামলায় দুই পুলিশসহ দেশি-বিদেশি ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ডে’ পাঁচ জঙ্গী নিহত হয়। অভিযানে এক জাপানি ও দু’জন শ্রীলংকানসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই হামলায় অন্তত ৩০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের ধারাবাহিক অভিযানে এই হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীসহ ১২ জন এবং র‌্যাবের অভিযানে একজন নিহত হন।
জানতে চাইলে হলি আর্টিজান হামলার তিনবছর পূর্তিতে মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে গতকাল রোববার বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে আমরা ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিলাম। হামলায় জড়িত বাকি ১৩ জন বিভিন্ন সময় অভিযানে নিহত হয়েছেন। অভিযুক্ত ৮ জনের মধ্যে দু’জন পলাতক ছিলেন, যারা পরবর্তীতে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। এখন সবাই জেলে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলমান।

নবেম্বরের মধ্যে রায়ের প্রত্যাশা
হলি আর্টিজান বেকারীতে জঙ্গী হামলা মামলার বিচার কার্যক্রম বিচারাধীন অন্যান্য মামলার তুলনায় ত্বরিত গতিতে এগোচ্ছে। যেভাবে মামলার বিচার কার্যক্রম অগ্রসর হচ্ছে এতে করে আগামী নবেম্বরের মধ্যেই এ মামলার রায় প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। আসামীদের সর্বোচ্চ সাজার লক্ষ্যে তৎপরও রয়েছে তারা।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মোট ২৯ কার্যদিবস দিন ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে সাক্ষী অনুপস্থিতিসহ নানা কারণে আট কার্যদিবস সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। ২১ কার্যদিবসে মোট ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে মামলার বাদীসহ ৬০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারাধীন আছে। কাল মঙ্গলবার (২ জুলাই) সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সব সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে এ মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশা করছি। সারা বিশ্ব এ মামলার রায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আগামী ৪ থেকে ৫ মাসের মধ্যে (অক্টোবর-নভেম্বর) এ মামলার রায় হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, হত্যাকারী ও হত্যায় সহায়তাকারীর মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। এ মামলায় ৬ আসামী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আর যেসব সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ পরবর্তী সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণে সহায়তা করবে। এখনও পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ হলে পরিপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। সব আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তির লক্ষ্যে আমরা অগ্রসর হচ্ছি।
হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলার ঘটনায় ২০১৬ সালের ৪ জুলাই এসআই রিপন কুমার দাস বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ১ জুলাই পুলিশ পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির ৮ আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে ২১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। চার্জশিট দাখিলের পর মামলাটির বিচারের জন্য সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আসে। পলাতক দু’জন আসামীর বিরুদ্ধে পত্রিকায় গ্যাজেট প্রকাশ হয়। এরপর আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেন। চার্জ গঠনের পর থেকে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়। ২০ থেকে ২২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়ার পর পলাতক দু’জন আসামীকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পলাতক দু’জনের পক্ষে সরকার থেকে লিগ্যাল এইডের আইনজীবীও নিয়োগ করা হয়। গ্রেফতারের পর তারা তাদের নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ দেন। সর্বশেষ ২৫ জুন পাঁচ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এ পাঁচজনসহ আদালতে মোট ৬০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রতিটি সাক্ষীকে আসামীপক্ষ জেরা করেছেন। হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনাটি বিশ্ব নিন্দিত ঘটনার মধ্যে একটি। এ মামলায় এডিসি মো. আবদুল আহাদ আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। চিকিৎসার পরও তার শরীরে অগণিত গ্রেনেড রয়ে গেছে।
আসামীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, এ মামলায় ৬০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এদের মধ্যে কেউই আসামীদের নাম বলেননি। আসামীদের কাছ থেকে কোনো কিছু উদ্ধার হয়েছে মর্মেও আদালতের নথিপত্রে নেই। এ ছাড়া মূল আসামীদের আমরা (চার্জশিটভুক্ত আসামীরা) সহায়তা করেছি, এমন কথাও কোনো সাক্ষী আদালতে বলেননি। এমতাবস্থায় আশা করছি, আসামীরা এ মামলা থেকে খালাস পাবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলাটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছে। এভাবে চললে দ্রুত বিচার কার্যক্রম দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে রায় হয়ে গেলে বিষয়টি অবশ্যই স্বাগত জানাব। আসামীপক্ষ থেকে আদালতকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে।
জানা গেছে, সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য প্রতিমাসেই তিন-চারটি তারিখ রাখা হচ্ছে। সাক্ষীদের উপস্থিতির হারও বেশ ভালো। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে যুক্তিতর্ক ও এরপরই রায় ঘোষণার দিন ধার্য করবেন বিচারক। ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালত মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ তিন ঘণ্টা খোলা থাকবে
জঙ্গী হামলার তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তিন ঘণ্টা খুলে দেওয়া হবে গুলশানের সাবেক হলি আর্টিজান বেকারি ভবন। আজ সোমবার (১ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত এটি খোলা থাকবে। দেশি-বিদেশি নাগরিকরা হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলায় নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। হলি আর্টিজান বেকারির মালিক সাদাত মেহেদী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, আজ হলি আর্টিজান বেকারি এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আগতদের তল্লাশি করে সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জঙ্গী হামলার পর দীর্ঘদিন হলি আর্টিজান ভবনটি পুলিশ তালাবন্ধ করে রেখেছিল। পরে সেটি খুলে দেওয়া হলে মালিক সেটি সংস্কার করেন। তবে সেখানে মালিকদের কেউ এখন থাকেন না। হলি আর্টিজানে কর্মরত কয়েকজন কর্মী থাকেন সেখানে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনের পাশের লেকভিউ ক্লিনিকে অবাধ যাতায়াত থাকলেও হলি আর্টিজান ভবনটির সামনের অংশে টিন দিয়ে উঁচু দেয়াল করা হয়েছে। এখনও মাঝে-মধ্যে উৎসুক মানুষ ভবনটি দেখার জন্য সেখানে ভিড় করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ