বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে বাজেটের যাত্রা আজ শুরু

ঘাটতি পূরণ
বিদেশ নির্ভরতা- ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা
ব্যাংক থেকে ঋণ- ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা
সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ- ২৭ হাজার কোটি টাকা
অন্যান্য খাত থেকে ঋণ- ৩ হাজার কোটি টাকা
সংসদ রিপোর্টার : নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বিশাল ঘাটতি রেখে প্রায় সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এবারের বাজেটে ঘাটতি এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বাজেট আজ সোমবার অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হবে। এর আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০১৯’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে কন্ঠভোটে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়।
গতকাল রোববার সকাল ১০টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ১৩ জুন ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ: সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার এই বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৮ জুন শুরু হয়ে ৩০ জুন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রায় ৫২ ঘণ্টার এ আলোচনায় মোট ৩৪৯ জন অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে বিরোধী দলের ৩৮ জন সদস্য অংশ নেন।
সরকারি ও বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে রোববার বাজেটের ওপর ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে ৪৮৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। সরকার ও বিরোধী দলের হুইপের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী ৪টি মঞ্জুরি দাবি আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। আলোচনা শেষে মঞ্জুরি দাবিগুলো কণ্ঠভোটে সংসদে গৃহীত হয়। এরপর অর্থমন্ত্রী সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন নিতে ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০১৯’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় উপনেতা রওশন এরশাদসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট বাস্তবায়নের যাত্রাকে স্বাগত জানান। এ সময় অর্থমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের বাজেটোত্তর নৈশভোজে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
বাজেটের ব্যয় মেটাতে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ আয় হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ফারাক ঘাটতি থাকবে (অনুদানসহ) এক লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া এ ঘাটতির পরিমাণ হবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে এনবিআর কর রাজস্ব ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত কর রাজস্ব হচ্ছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কর ব্যতীত আয় হবে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ আগামী বছরে দাঁড়াবে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।
সামগ্রিক ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নেওয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নেওয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, নির্দিষ্টকরণ বিলটি মূলত গ্রস বাজেট। বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও অন্যান্য খাতে বাজেটে সরকারের অর্থ বরাদ্দের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই অর্থ কখনো ব্যয় হয় না, যা বাজেটের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব মেলানো হয়। এ বাধ্যবাধকতার কারণে এবারের বাজেটেও এক লাখ ১৯ হাজার ২৮৮ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ব্যয় হবে না। অর্থমন্ত্রী গত ১৩ জুন ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার যে বাজেট উত্থাপন করেছেন, সেটাই ব্যয় হবে। সেটাই আগামী অর্থবছরের নিট বাজেট।
বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দ ॥ খাতওয়ারি বরাদ্দের মধ্যে অর্থ বিভাগের ব্যয় ২ লাখ ২৬ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে কম রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে, ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ ৩২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে ৩৪ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদ খাতে ৩২৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খাতে ৩ হাজার ৫২৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ২৪১ কোটি টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এক হাজার ৯২০ কোটি টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ৯৪১ কোটি, সরকারি কর্মকমিশন খাতে ১০২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় খাতে ২৩৮ কোটি ২২ লাখ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ২ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪৭ লাখ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ৩ হাজার ৪১ কোটি ৫৬ লাখ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ খাতে ১৬ হাজার ৩২ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
পাশাপাশি পরিকল্পনা বিভাগে এক হাজার ২৩১ কোটি লাখ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে ১৪৯ কোটি ১০ লাখ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৬৩২ কোটি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৬২০ কোটি ৫৩ লাখ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে ৩৮ কোটি ৩২ লাখ, আইন ও বিচার বিভাগে এক হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ধরা হয়।
জননিরাপত্তা বিভাগে বরাদ্দ ২১ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে ৩৫ কোটি ৩৮ লাখ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৪ হাজার ৪১ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২৯ হাজার ৬২৪ কোটি ৯০ লাখ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খাতে ১৬ হাজার ৪৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ১৯ হাজার ৯৪৪ কোটি ৩০ লাখ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৯৩০ কোটি ৩৯ লাখ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৬ হাজার ৮৮১ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৭৮৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ৩১৩ কোটি ৪৮ লাখ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ৬ হাজার ৬০৩ কোটি ৮৪ লাখ, তথ্য মন্ত্রণালয়ে ৯৮৯ কোটি ১৫ লাখ এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৫৭৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৩৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৪৮৯ কোটি ১২, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে ২ হাজার ৪৪৯ কোটি ৪৭ লাখ, শিল্প মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৫৫৫ কোটি ৯১ লাখ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ৮০০ কোটি ১৬ লাখ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে এক হাজার ৯৮৫ কোটি ৭৯ লাখ, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ১৪ হাজার ৫৩ কোটি ৪০ লাখ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে ২ হাজার ৯৩২ কোটি ৩৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৪৯৬ কোটি ৩১ লাখ, ভূমি মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৯৪৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৮ হাজার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৭ হাজার ৯৩২ কোটি ৪৫ লাখ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ১৭ হাজার ১৫২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৭ হাজার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯ হাজার ৮৭১ কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি ৮ লাখ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৬ হাজার ৩৫৭ কোটি ৯০ লাখ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৮৩২ কোটি ৭৭ লাখ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৪২৬ কোটি ৩৪ লাখ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ১৯৪ কোটি ৪৮ লাখ ৩২ হাজার, বিদ্যুৎ বিভাগে ২৬ হাজার ৬৪ কোটি ৬৯ লাখ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৪ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪৮ লাখ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ৫৯০ কোটি ৯৪ লাখ, দুর্নীতি দমন কমিশনে ১৪০ কোটি ১৭ লাখ এবং সেতু বিভাগে ৮ হাজার ৫৬৩ কোটি ৫৩ লাখ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ৭ হাজার ৪৫৩ কোটি ৬০ লাখ, সুরক্ষা সেবা খাতে ৩ হাজার ৬৯৪ কোটি ৯২ লাখ ২৪ হাজার এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ৫ হাজার ৭৮৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ