রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

সুন্দর বনের কেবড়া ফল : ফসল ও খাদ্য হিসেবে

এইচ এম আব্দুর রহিম : [দুই]
লীয় এলাকার কৃষি প্রধানত শস্য ও অনন্য(নন ক্রপ) এ দুভাগে বিভক্ত। প্রথমত বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত হওয়ার কারনে খাদ্যশষ্য উৎপাদন তুলনামুলবভাবে বৃদ্ধি পায়নি । একটি পরিশীলিত সমীক্ষা গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৩ বছরে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে দ্বিগুণ পরিমাণ শষ্য (খাদ্য অর্থকরী ফসল ) উৎপাদিত হয়েছে। সেখানে লীয় এলাকায় শষ্য উৎপাদন বাড়েনি বরং কমেছে । ফারাক্কার বিরুপ উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষাবাদ যোগ্য জমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলে ও চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় নানান পরীক্ষা চালিয়ে কাংক্ষিত ফল ততটা আসেনি; দেশের অন্যতম দুটি সামুদ্রিক বন্দর,প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গভুমি সুন্দরবন এবং পর্যটনসমৃদ্ধ কক্সবাজারকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কতটা জরুরী তা বলার অপেক্ষা রাখে না । সাম্প্রতিকালে সিডর আইলায় সুন্দর বন এবং অন্যান্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ অন্যান্য প্রাণির সম্পদের উপর দুর্বিষহ ও নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় । তাতে লীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ দেখা দিয়েছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রতিত্রিয়ায় সুন্দর বন ধ্বংসের মুখে । সুন্দর বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। চোরা শিকারি হাতে বিশ্বের এ বিরল প্রাণি রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রতি নিয়ত হত্যা করা হচ্ছে। সুন্দর বনের গন্ডার বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগে। শুকর কুমির কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। অজগর হাঙ্গর বন মোরগ বহু রকমের পাখি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উজাড় হচ্ছে বন। আগের মত বড় বড় গাছপালা এখন আর দেখা যায় না। সাগরের উচ্চতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে লবণাক্ততা। ফারাক্কার বিরুপ প্রতিক্রিযায় লবণাক্ত পানি বৃৃৃদ্ধি পেয়েছে । ফলে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ গাছ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । এদিকে সুন্দববন সংলগ্ন বহুনদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে । বিশেষ করে মাইকেল মধুসুদনের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদ ভরে আগা নদী একেবারে মরে গেছে । ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে এ অবস্থার সুষ্টি হয়েছে । মাঝে মাঝে সাতক্ষীরা সংলগ্ন পাটকেলঘাটায় এ নদী খননের কাজ করা হয়। কোনভাবে নদীটি রক্ষা করা সম্ভব হলো না। এ নদীতে সব ধরনের নৌযান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে । এ দিকে জোয়ারের পানি উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সুন্দর বনের গাছপালা মরে যাচ্ছে । এ বনের ভূপৃষ্ঠ থেকে সমুদ্রতল বেশী নিচুতে নয় । জোয়ারের সময় ৪৫ সেন্টিমিটার পানি বাড়লে সুন্দর বন পৃষ্ঠ ৭৫ শতাংশ ডুবে যাচ্ছে । এ বন অভ্যন্তরে বালি খুঁড়লে মিষ্টি পানির সন্ধ্যান পাওয়া যায়। লবণাক্ত পানির কারণে এখন আর তেমন মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বের বিরল এ বন রক্ষার জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের ১৮ কোটি জন জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ দেশের নদী বেষ্টিত লীয় এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু লীয় এলাকা এখন অরক্ষিত। বিশেষ করে টেকসই বাঁধ না থাকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর লীয় বাঁধ ভেঙ্গে নদীর পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিনাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারন করেছে। লীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালি, কক্সবাজার, ভোলা অন্যতম। প্রায় ডজন খানেক জেলার ভৌগোলিক অবস্থান লীয় এলাকায়। এসব লীয় এলাকা জেলে, কৃষক, বাওয়ালী কামার, কুমারসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোক বসবাস করে । জাতীয় অর্থনীতিতে লীয় অধিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে । বিশেষ করে মৎস্য সম্পদ আহরন করে দেশের মৎস্য সম্পদের দুইয়ের তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ করে উপকূলীয় জেলেরা। সাগরসহ স্থানীয় নদ নদী থেকে মৎস্য সম্পদ আহরন করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছে দীর্ঘ দিন থেকে । বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে । এ পেশার সাথে লীয় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত। মৎস্য সম্পদ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন প্রজাতির ফসল উৎপাদন হয় । যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে । কিন্তু লীয় বাঁধগুলো এত জরাজীর্ণ যে এসব এলাকার কোটি কোটি মানুষ চরম আতংক উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে । শুধু সাতক্ষীরা, খুলনা লীয় এলাকায় সাড়ে ৮শত কিলোমিটার ওয়াপদা বাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে । যে কোন মুহূর্তে এসব বঁাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে । জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে । ১৯৬৯ সালে বঙ্গোসাগরের তরঙ্গমালা হতে রক্ষা করার জন্য মূলত এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয় । এসব বাঁধের স্থায়িত্ব ধরা হয় বিশ বছর। কিন্তু ৪০ বছর উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও যথাযতভাবে এসব বাঁধ সংস্কার করা হয়নি । ফলে বিশাল বিস্তৃত এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে । ১৯৮৮ সালের ২৯ শে নভেন্বর হারিকেন ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেন্বর সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় লীয় এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। প্রায় ৩ শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে, হাজার হাজার বসতবাড়ী নদীর সাথে বিলীন হয়ে যায়। এর পর থেকে লীয় বাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে । এসব বাঁধ সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে। এদিকে বঙ্গোপসাগরে চর পড়ায় জোয়ারের পানিতে উচ্চতা আগের তুলনায় অনেকে বেড়েছে। আগেকার দিনে ৫/৬ ফুট উচুঁ রাস্তা দিয়ে জোয়ারের পানি থেকে লোকালয় রক্ষা করা যেত। তবে লীয় অধিবাসীদের আগলে রেখেছে সুন্দর বন। মংলা বন্দরের চলাচলকারী নৌযানের পোড়া তেল মবিলের কালো কালো দাগ সুন্দর বনের গাছপালার দিকে তাকালে নজরে পড়ে। সুন্দর বনের ভীতরের জাহাজসহ নানা রকম নৌযানের মেশিনের শব্দ রাতের বেলা সেগুলোর আলো এবং এর সার্জলাইট বণ্য প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘ্ন ঘটায়। সিমেন্ট কারখানাসহ বড় ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে মংলায়। সেগুলো পরিবেশ দূষণ ঘটিয়ে চলেছে নীরবে। মোটকথা, গোটা পরিবেশটা হুমকির মুখে পড়েছে । এ গেল বন্দরের স্বাভাবিক অবস্থার কথা , র্দুঘটনার বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি । বনের ভিতর চলাচলকারী রাসায়নিকবাহী জাহাজ বা বন্দরের আশপাশ এলাকার কারখানার দুর্ঘটনা ঘটলে তা বনের জন্য কতটা বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে সে হিসেব কারো জানা নেই । ২০০ বা ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ চাঁদ সওদাগার এই এলাকায় একটি নগর গড়ে তোলেন। বাগমারা ফরেস্ট অফিসে তার সন্ধ্যান মিলেছে । সুন্দর বনের জরিপটি হয় মহামতি আকবরের সময়ে চৌতক মলের নেতৃত্বে। মনে রাখা দরকার যে, সুন্দর বনের বিশাল গভীর নদ নদীআকীর্ণ জঙ্গলে জরিপ সে আমলে প্রায় অসম্ভব ছিল । অবশ্য সম্রাট আকবর নিজেই এ বন দেখতে এসেছিলেন।  এর রুপ তাকে মুগ্ধ করেছিল । নবাব সিরাজুদ্দৌলা পরাজয়ের পর নবাবের আসনে আসীন হয়ে মীর জাফর বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে ছিলেন। তার ভীতর সুন্দর বনের একটি বড় অংশ ছিল । সুন্দর বনের অফুরন্ত সম্পদ কোম্পানিদের বড় কর্তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে । এই কোম্পানির পক্ষ থেকে ১৮১১সালে শুরু হয় এ বনের জরিপ । কোম্পানির আমলে সুন্দর বনের জমি কৃষকদের মঝে বিলি-বন্টন করে এই বন সাফ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে । সে থেকে সুন্দর বনের অস্তিত্ব সংকট শুরু হয়। গোটা সুন্দর বন এখন বন্য দস্যুদের কবলে। বনের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ পেশাজীবী জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। জেলে বাওয়ালী, মৌয়ালী তাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা ভিত্তিক টাকা আদায় করা হচ্ছে। নিয়মিত চাঁদা না দিলে নির্বিঘ্নে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। এদের হাতে একযুগে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে । এ ব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ