সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

টাকার পাচার এবং সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট

আশিকুল হামিদ : দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া নিয়ে মাঝে-মধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়ে থাকে। এসব আলোচনায় প্রধানত ঋণখেলাপিসহ বড় ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতাদের দিকে আঙুল ওঠানো হয়। সম্প্রতি আবারও টাকার পাচার নিয়ে কথা উঠেছে। ক’দিন আগে, গত ২৮ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ২০১৮ সালে সাইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধির হার ২৯ শতাংশ। টাকার অংকে এর পরিমাণ এক হাজার দুইশ’ কোটি টাকা।
হিসাবটি প্রকাশ করেছে সাইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস নাশনাল ব্যাংক। ‘ব্যাংকস ইন সাইজারল্যান্ডÑ২০১৮’ শিরোনামে প্রকাশিত বার্ষিক রিপোর্টে ব্যাংকটি জানিয়েছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ যেখানে ছিল চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা সেখানে  ২০১৮ সালে অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। দেশটির মুদ্রার হিসেবে প্রায় ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। রিপোর্টে প্রতি ফ্রাঁ’র বিনিময় মূল্য ধরা হয়েছে ৮৬ টাকা ৪৩ পয়সা।
সুইস নাশনাল ব্যাংকের ওই রিপোর্টে তাৎপর্যপূর্ণ অন্য কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ রয়েছে। যেমন ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। ওদিকে আবার জাতীয় নির্বাচনের বছরে অর্থাৎ ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালে বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিরা তিন হাজার ২১৪ কোটি টাকা জমা রাখেলেও ২০১৪ সালে তার পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল চার হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। একইভাবে আরেক তথা একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ২০১৮ সালে এসে আবারও বেড়ে গেছে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ। এ ধরনের তথ্যগুলো মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় সুইস ব্যাংক আসলে জানিয়েছে, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনসহ রাজনৈতিক সংকটের সময় বাংলাদেশিরা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বেশি পরিমাণে অর্থ জমিয়ে থাকেন। এর কারণ, দেশটির ব্যাংকগুলো সাধারণত অর্থ জমাকারীদের তথ্য গোপন রাখে। বিশেষ করে সরকার বা কোনো তদন্ত সংস্থার কাছে প্রকাশ করে না। এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে শুধু ভারত। দেশটি সুইজারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের চুক্তি করেছে। এর ফলে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে অতীতের তুলনায় ভারতীয়দের জমানো টাকার পরিমাণ অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের তেমন কোনো চুক্তি না থাকায় বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। 
উল্লেখ্য, এবারই প্রথম নয়, এর আগেও বিদেশি ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমানো বা পাচার করা অর্থ সম্পর্কে রিপোর্ট ও তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রথমে চমকের সৃষ্টি করেছিল ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ছয় লক্ষ ছয় হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০১৪ সালেই পাচারের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আলোচ্য ১০ বছরে পাচার করা অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দুটি অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা সম্ভব হতো বলেও ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছিল। 
সেবার অর্থ পাচারের খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা একে অন্যের ওপর দোষারোপের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা জমে ওঠার আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল আরো একটি চাঞ্চল্যকর খবর। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএনবি’র বার্ষিক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত ওই খবরে জানা গিয়েছিল, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে পাঁচ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা (৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ) জমা পড়েছে। খবরে আরো বলা হয়েছিল, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নাকি বৈধভাবে জমা পড়েনি। কারা এইসব অ্যাকাউন্টের মালিক সে সম্পর্কেও জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, দেশের ব্যাংকিং আইনে নিষেধ থাকায় সুইজারল্যান্ডের কোনো ব্যাংকই গ্রাহকদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করে না বরং গোপন রাখে। আর সে কারণেই বিশ্বের চোরাচালানী ও সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা পর্যন্ত সকলে তাদের অবৈধ অর্থ বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে জমিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি।
খবরটি ফাঁস হওয়ার পরপর আবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে পরস্পরকে আক্রমণের পালা শুরু হয়েছিল। বিএনপিসহ কয়েকটি বিরোধী দল বলেছিল, আওয়ামী লীগের নেতারাই গোপনে টাকা জমা করেছেন, যাতে ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটলে তারা বিদেশে পালিয়ে যেতে এবং ওই টাকা দিয়ে আয়েশে জীবন কাটাতে পারেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা বলেছিলেন, টাকা পাচারের রেকর্ড নাকি একমাত্র বিএনপির রয়েছে! অর্থাৎ বিএনপির নেতারাই টাকা জমিয়েছেন সুইস ব্যাংকে!
এভাবে আক্রমণ এবং পাল্টা-আক্রমণ চালিয়ে দোষারোপের রাজনীতি করা হলেও ঘটনাপ্রবাহে পরিষ্কার হয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের ভেতরে যেমন কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে তেমনি কোটিপতিরা ছড়িয়ে পড়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। শুধু সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকেই নয়, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা ও জার্মানিসহ আরো কিছু দেশেও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন! এই অর্থের বেশিরভাগই যে অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে সে কথাটাও আলোচিত হয়েছিল বিশেষ গুরত্বের সঙ্গে।
এমন এক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই সকলের নজর পড়েছিল সরকারের দিকে। সরকার পাচারকারীদের চিহ্নিত করে কি না এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না তা দেখার জন্য সাধারণ মানুষও উন্মুখ হয়ে পড়েছিল। তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও এ বিষয়ে বড় ধরনের ভ’মিকা পালন করেছিলেন। সিলেটের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, টাকা পাচারের সঙ্গে ‘আমরাও’ অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরাও জড়িত!
শুনতে ব্যঙ্গাত্মক মনে হলেও অর্থমন্ত্রী মিস্টার মুহিতের ওই স্বীকারেক্তিমূলক বক্তব্য শুনে স্তম্ভিত হয়েছিল জনগণ। কিন্তু মাত্র দিন কয়েকের মধ্যেই সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নিয়েছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০১৭ সালের ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া বক্তব্যে কথিত ‘অতিশয়োক্তির’ অভিযোগে গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, সাংবাদিকরা যাকে অর্থ পাচার হিসেবে প্রচার করেছেন সেটা নাকি মোটেও পাচার নয়। আসলে বাংলাদেশ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একে কোনোভাবেই ‘পাচার’ বলা যায় না। অর্থমন্ত্রী অবশ্য ‘তবে’ যুক্ত করে স্বীকার করেছিলেন, অর্থ যে একেবারে পাচার হয়নি বা হয় নাÑ তা নয়। তবে এই পাচারের পরিমাণ ‘অতি যৎসামান্য’। অন্যদিকে সেটাকেই সাংবাদিকরা ‘অত্যন্ত অন্যায়ভাবে’ বাড়িয়ে বলেছেন!
লক্ষ্যণীয় যে, ঘটনাপ্রবাহে একাধিকবার চমকের সৃষ্টির পাশাপাশি সংশয় ও জিজ্ঞাসারও কারণ সৃষ্টির করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সিলেটের এক অনুষ্ঠানে ‘আমরাও’ অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত বলার পর এমন কি ঘটেছিলÑ যার কারণে ‘রাবিশ’ ধরনের বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠা অর্থমন্ত্রী রাতারাতি তার বক্তব্য পাল্টে ফেলেছিলেন এবং ‘যৎসামান্য’র সঙ্গে আবার ‘অতি’ যোগ না করে পারেননিÑ তা নিয়ে শুরু হয়েছিল কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনা। কারণ, অর্থমন্ত্রী যা বোঝাতে চেয়েছিলেন তার জন্য ‘যৎসামান্য’ই যথেষ্ট, ‘অতি’র দরকার পড়ে না। কথাটা বরং ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অন্দরমহলে অর্থমন্ত্রীকে সম্ভবত এতটাই নাজেহাল হতে হয়েছিল যে, তিনি ভুল বা অশুদ্ধ বাক্য দিয়েই নিজের সত্য বলার ‘অপরাধ’ সংশোধন না করে পারেননি!
এমন ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশ্ন উঠেছিল, অর্থমন্ত্রীর কোন কথাটিকে মানুষ সত্য বলে গ্রহণ করবেÑ তিনি সিলেটে যা বলেছিলেন সেটাকে, নাকি জাতীয় সংসদে যা বলেছিলেন সেটাকে? রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হয়েছিল, সত্য যেটাই হোক না কেন, মিস্টার মুহিত কিন্তু নিজেই সেবার ‘রাবিশ’ শোনার মতো উপলক্ষ সৃষ্টি করেছিলেন! কারণ তার দুটি কথার মধ্যে একটি সত্য হলে অন্যটিকে কেউ ‘রাবিশ’ বললে তাকে দোষ দেয়ার সুযোগ ছিল না!
বলা দরকার, যেহেতু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিসহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সেহেতু অর্থপাচারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে হাল্কাভাবে নেয়া কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, কোনো দেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে ভীতিকর। এমন অবস্থায় কর্তব্য যেখানে ছিল পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সরকার সেখানে উল্টো বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকাশিত গণমাধ্যমের খবরগুলোকে ‘অতিশয়োক্তি’ বা মিথ্যাচার বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল। এর ফলে পাচারকারীরা যে উৎসাহিত হয়েছে এবং অর্থের পাচার আরো বেড়ে গেছে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টই তার প্রমাণ।
এজন্যই অসত্য বলার এবং সস্তা রাজনীতি করার পরিবর্তে সরকারের উচিত অর্থ পাচার বন্ধের জন্য সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়া। পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার জন্যও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, বাংলাদেশ এখনো এমন ‘উন্নত’ রাষ্ট্র হয়ে যায়নি, যার নাগরিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে ‘জমা’ রাখবেন এবং তাদের পরিচয়ও জানতে দেয়া হবে না!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ