রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

বাজারে বাজেটের আগুন

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিরাট অংকের তথা লক্ষ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করে চলেছে আওয়ামী লীগ সরকার। মাত্র কিছুদিন আগে পর্যন্ত এক দশকের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও বিরাট বপুর মানুষ ছিলেন বলে তাকে নিয়ে যেমন, তেমনি তার পেশ করা বাজেট নিয়েও রসাত্মক আলোচনা যথেষ্টই হতো। জনাব মুহিত সরে যাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, আকারে অর্থাৎ টাকার পরিমাণের দিক থেকে তেমন কমবেশি না হলেও নতুন অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেবেন। অন্যদিকে জনাব আ হ ম মোস্তফা কামালও জাতিকে নিরাশই করেছেন। তিনিও তার পূর্বসুরি জনাব মুহিতের মতো বিপুল ঘাটতি রেখেই বাজেট তৈরি করেছেন। পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ধার করতে হবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো, বাজেট বক্তৃতায় যথেষ্ট বাগাড়ম্বর করলেও অর্থমন্ত্রী কিন্তু মানুষের মনে মোটেও আস্থা সৃষ্টি করতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে এত অর্থ তিনি ঠিক কোন ধরনের খাত থেকে যোগাড় করবেন? পাশাপাশি এসেছে বিপুল ঘাটতির প্রসঙ্গ। বস্তুত বিরাট বপুর বাজেটের মধ্যে ঘাটতির পরিমাণও বিরাটই। প্রথম ধাক্কাটাও খেতে হয়েছে এখানেই। কারণ, টাকার খবর নেই তবু মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর কসরত করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ঘাটতি পূরণের জন্য কল্পিত এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা যদি যোগাড় না করা যায় তাহলে কিভাবে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবে সরকার?
টাকা যোগাড়ের সম্ভাব্য খাতগুলোও লক্ষ্য করার মতো। যেমন বৈদেশিক বিভিন্ন উৎস থেকে ধার করা হবে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। আর ব্যাংকিং খাতসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস থেকে ধার করা হবে বাকি ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক হলেও মুহিত সাহেবের আমলে সীমা তো ছাড়ানো হয়েছেই, রেকর্ডও করে ফেলেছে সরকার। তা সত্ত্বেও কোনো অর্থবছরেই প্রাক্কলন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল অবশ্য এই বলে আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি ঘাটতি পূরণ করতে পারবেন! যার অর্থ, এবারের বাজেট সম্পূর্ণরূপেই বাস্তবায়ন করা যাবে।
বাজেট প্রসঙ্গে প্রথমেই প্রাধান্যে এসেছে বাজারদর। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে বাজেট কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করারও আগেই পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। দাম শুধু বাড়ছেই না, বাড়ছেও লাফিয়ে লাফিয়ে। যেমন প্রতি কেজিতে চিনির দাম বেড়ে গেছে তিন টাকা। প্রতি লিটারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে আড়াই টাকা। দুধসহ শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে সিগারেটসহ সেই সব পণ্যের দামও লাফিয়ে বেড়ে চলেছে, বাজেটে যেগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম বাধা বা মনিটরিং না থাকার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা একদিকে বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত করেছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লুটে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সব জেনে-দেখেও কারো বিরুদ্ধেই সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যবস্থা নিচ্ছেও না। সরকারের এই নীরবতাকেও ব্যবসায়ীরা প্রশ্রয় হিসেবে কাজে লাগিয়ে তাদের লুণ্ঠনের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
কিছু কিছু বিষয়ে সরকার নিজেও জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের কারণ ঘটিয়েছে। একটি উদাহরণ হিসেবে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে টেলিযোগাযোগ খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন মোবাইল ফোনের সেবার ওপর বাজেটে পাঁচ শতাংশ হারে সম্পুরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এর ফলে মোবাইল ফোনে কথা বলতে হলে মানুষকে মোট ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। অর্থাৎ ১০০ টাকা রিচার্জ করলে সরকারের কোষাগারে চলে যাবে ২৭ টাকা। গ্রাহক পাবেন ৭৩ টাকার সুবিধা। স্মার্ট ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়ে যাবে। আপত্তির কারণ হলো, বাজেট পাস হওয়ার আগেই অপারেটর কোম্পানিগুলো প্রস্তাবিত হারে টাকা কেটে রাখতে শুরু করেছে। অথচ  চূড়ান্ত পর্যায়ে করের পরিমাণ কমানোও হতে পারে। তখন কিন্তু গ্রাহকরা তাদের কাছ থেকে কেটে নেয়া বাড়তি অর্থ ফেরৎ পাবেন না।
দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে কয়েকটি মাত্র পণ্যের উল্লেখ করা হলেও সব মিলিয়ে এভাবেই বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়েছে। বড় কথা, প্রতিটি বিষয়ে সরাসরি ক্ষতির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আমরা মনে করি, প্রতি বছরই যেহেতু বাজেট পেশ করার আগে থেকেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় সে কারণে সরকারের উচিত ছিল এ বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং মনিটরিংসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া। তাছাড়া অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছিলেন, এবারের বাজেটে কোনো পণ্যেরই দাম বাড়ানো হবে না। অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। আমরা আশা করতে চাই, অর্থমন্ত্রী তার আশ্বাস পূরণ করবেন এবং বিশেষ করে শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমূহের দাম না বাড়ানোর ব্যবস্থা নেবেন। ব্যবসায়ী নামের চিহ্নিত যে গোষ্ঠীর লোকজন হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও আমরা দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ